চীনের সং রাজবংশের (৯৬০–১১২৭) সময়কার পাথরের ভাস্কর্যশিল্পের দুটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন ফিরিয়ে দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। দীর্ঘদিন আগে চীনের প্রাচীন রাজকীয় সমাধি থেকে চুরি করে বিদেশে পাচার করা হয়েছিল ভাস্কর্য দুটির মাথা। বুধবার অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরায় আনুষ্ঠানিকভাবে এগুলো চীনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। চীনের জাতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রশাসন এ দুটি প্রত্নবস্তু গ্রহণ করে।
চীনের জাতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই প্রত্যর্পণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে চীন ও অস্ট্রেলিয়ার সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক কাঠামোর আওতায় প্রত্নসম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার সর্বশেষ উদাহরণ।
ফেরত দেওয়া নিদর্শন দুটি উত্তর সং রাজবংশের আমলের। এর একটি ইয়ংচাং সমাধির একজন বেসামরিক কর্মকর্তার ভাস্কর্যের মাথা, অন্যটি ইয়ংইউ সমাধির একজন সামরিক কর্মকর্তার ভাস্কর্যের মাথা। চীনের মধ্যাঞ্চলীয় হেনান প্রদেশের গংই শহরে অবস্থিত এই সমাধিগুলো উত্তর সং রাজবংশের রাজকীয় সমাধিগুলোর অংশ।
গংই শহরে উত্তর সং রাজবংশের রাজকীয় সমাধির পাথরের ভাস্কর্যের একটি বড় সংগ্রহ রয়েছে। এসব ভাস্কর্যের মধ্যে রয়েছে মানুষের অবয়ব ও শুভ লক্ষণের প্রতীক বিভিন্ন প্রাণীর মূর্তি। সমৃদ্ধ আকৃতি, সূক্ষ্ম খোদাই এবং শৈল্পিক বৈশিষ্ট্যের জন্য এগুলো বিশেষভাবে পরিচিত।
১৯৯০-এর দশকে চীন থেকে পাচার
চীনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, পাথরের ভাস্কর্য দুটির মাথা মূল সমাধি থেকে চুরি করে আলাদা করা হয়েছিল। পরে ১৯৯০-এর দশকে এগুলো চীনের বাইরে পাচার করা হয়। পরবর্তী সময়ে অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় চিত্রশালার সংগ্রহে স্থান পায় নিদর্শন দুটি।
অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় চিত্রশালার নথি অনুযায়ী, ভাস্কর্য দুটির মাথা চুনাপাথরে তৈরি। সামরিক কর্মকর্তার ভাস্কর্যের মাথাটির উচ্চতা ৬৮ সেন্টিমিটার এবং ওজন ১৩২ কেজি। অন্যদিকে, বেসামরিক কর্মকর্তার ভাস্কর্যের মাথাটির উচ্চতা ৭০ সেন্টিমিটার এবং ওজন ২২৩ কেজি।
চীনের জাতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রশাসন জানিয়েছে, নিদর্শন দুটি সং রাজবংশের পাথরের ভাস্কর্যশিল্পের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। এগুলো ফিরিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে চীনের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
বুধবার ক্যানবেরায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দুই দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে নিদর্শন দুটি হস্তান্তর করা হয়।
চীনের জাতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রশাসনের উপপরিচালক তাং ওয়েই বলেন, হারিয়ে যাওয়া সাংস্কৃতিক নিদর্শনকে তার উৎস দেশে ফিরিয়ে দেওয়া ন্যায়সংগত উদ্যোগ। এর মাধ্যমে সাংস্কৃতিক সম্পদ সুরক্ষিত হয়, বিভিন্ন দেশের মানুষের সাংস্কৃতিক অধিকার ও জাতীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান জানানো হয় এবং মানবসভ্যতার অর্জন সংরক্ষিত থাকে।
তাং ওয়েইয়ের মতে, আন্তর্জাতিক সনদ বাস্তবায়ন এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় চীন ও অস্ট্রেলিয়ার যৌথ সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ফল এই প্রত্যর্পণ। এটি দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ও সাংস্কৃতিক বিনিময় আরও জোরদার করবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অস্ট্রেলিয়ার প্রতিনিধি বলেন, এই উদ্যোগ কেবল দুটি প্রত্নবস্তু এক দেশ থেকে অন্য দেশে হস্তান্তরের বিষয় নয়। এর মধ্য দিয়ে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের প্রতিফলন ঘটেছে। পাশাপাশি, এটি অস্ট্রেলিয়া ও চীনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও গভীর করতে এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে ভবিষ্যৎ সহযোগিতা বাড়াতে সহায়তা করবে।
যেভাবে ফেরত এলো প্রত্নসম্পদ
নিদর্শন দুটি ফেরত আনার প্রক্রিয়াটি শুরু হয় চীনের জাতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রশাসনের উদ্যোগে। এ বিষয়ে তদন্তে প্রশাসনটির সঙ্গে কাজ করে চীনের জননিরাপত্তা মন্ত্রণালয় এবং হেনান প্রদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও জননিরাপত্তা বিভাগ।
২০২৫ সালে চীনের জাতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রশাসন অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় চিত্রশালার কাছে একটি স্মারকলিপি পাঠিয়ে নিদর্শন দুটি ফেরত দেওয়ার আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানায়। এর মধ্য দিয়েই প্রত্নবস্তু দুটি পুনরুদ্ধারের দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।
প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়েছে ১৯৭০ সালের ইউনেসকো সনদ, সাংস্কৃতিক সম্পদ সুরক্ষায় চীন ও অস্ট্রেলিয়ার ২০০৯ সালের আন্তসরকার সমঝোতা স্মারক এবং অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় চিত্রশালার ২০২১ সালের যথাযথ যাচাই ও নিদর্শনের উৎস অনুসন্ধানবিষয়ক নীতিমালার আওতায়।
সাংস্কৃতিক নিদর্শন অবৈধভাবে পাচার ঠেকানো এবং ঐতিহাসিক সম্পদের প্রকৃত মালিকানা ও উৎস যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এসব আন্তর্জাতিক সনদ ও দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য থেকেও ফিরেছে চীনের নিদর্শন
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দেশ থেকে চীনের সাংস্কৃতিক নিদর্শন ফেরত দেওয়ার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্র দুটি পৃথক চালানে চীনের ৬৪টি সাংস্কৃতিক নিদর্শন ও জীবাশ্ম ফিরিয়ে দেয়। এর মধ্যে ছিল থিয়ানলংশান গুহার ১৭ নম্বর অংশের একটি বোধিসত্ত্ব মূর্তির ধড়, বিভিন্ন মূর্তি, পোড়ামাটির অবয়ব এবং ডাইনোসরের জীবাশ্ম।
একই মাসে যুক্তরাজ্যও চীনের ১২টি সাংস্কৃতিক নিদর্শন ফিরিয়ে দেয়। লন্ডন মহানগর পুলিশের তদন্তের সময় এসব নিদর্শন জব্দ করা হয়েছিল।
চায়না ইউনিভার্সিটি অব পলিটিক্যাল সায়েন্স অ্যান্ড ল-এর অধ্যাপক হুও ঝেংসিন বলেন, চীন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাংস্কৃতিক নিদর্শন সংরক্ষণ এবং বিদেশে হারিয়ে যাওয়া প্রত্নসম্পদ ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা জোরদার করেছে। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তিও করেছে দেশটি।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার পর থেকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সহযোগিতা, মামলা, আলোচনা ও অনুদানের মাধ্যমে তিন শতাধিক চালানে দেড় লাখেরও বেশি চীনা সাংস্কৃতিক নিদর্শন দেশে ফিরেছে। ২০১২ সালের পর থেকে ফেরত এসেছে ৫০০টিরও বেশি নিদর্শন।
হুও ঝেংসিনের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে চীনের দ্বিপক্ষীয় চুক্তি রয়েছে এবং এসব দেশ প্রায় প্রতিবছরই চীনের নিদর্শন ফেরত দিয়েছে। চলতি বছরে এ ধরনের হস্তান্তরের ঘটনা তুলনামূলকভাবে বেশি ঘটেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের সঙ্গে চীনের এ বিষয়ে একই ধরনের দ্বিপক্ষীয় চুক্তি নেই। দেশটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে জব্দ করা নিদর্শনগুলো ফিরিয়ে দিয়েছে।
অধ্যাপক হুও মনে করেন, উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সাংস্কৃতিক সম্পদ পুনরুদ্ধারের কার্যকর ব্যবস্থা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অস্ট্রেলিয়ার প্রায় প্রতিবছর নিদর্শন ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও এ সহযোগিতার ধারাবাহিকতা তুলে ধরে।
চীনের এই প্রত্যর্পণ উদ্যোগের মধ্য দিয়ে আবারও সামনে এসেছে অবৈধভাবে পাচার হওয়া সাংস্কৃতিক সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার গুরুত্ব। বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, উৎস যাচাই এবং দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা জোরদার করা গেলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর সুরক্ষা ও পুনরুদ্ধারের সুযোগ বাড়বে।












