ভারতের রাজধানী দিল্লির মজনু কা টিলা। বর্তমানে এলাকাটি তিব্বতি জনবসতি, সরু গলির ক্যাফে, বৈচিত্র্যময় খাবার এবং তরুণদের আড্ডার জন্য পরিচিত। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের নর্থ ক্যাম্পাসের কাছে যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত এই এলাকায় প্রতিদিন ভিড় করেন শিক্ষার্থী, পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দারা। কিন্তু জায়গাটির নাম কীভাবে হলো, তা জানেন না অনেকেই। এর পেছনে রয়েছে প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো এক আধ্যাত্মিক কাহিনি, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিখ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা গুরু নানকের নাম।
ব্রিজ কিষাণ চণ্ডিওয়ালার লেখা দিল্লি কি খোঁজ বইয়ে এই নামকরণের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। প্রচলিত ধারণার বিপরীতে, মজনু কা টিলার নামের সঙ্গে লায়লা-মজনুর বিখ্যাত প্রেমকাহিনির সরাসরি সম্পর্ক নেই। বরং এই নামের সূত্র পাওয়া যায় সুফি সাধক আবদুল্লাহ এবং গুরু নানকের সাক্ষাতের ঘটনায়।
কীভাবে হলো মজনু কা টিলা নাম?
কাহিনির সূত্রপাত ১৫০৫ সালের জুলাই মাসে, সিকান্দার লোদির শাসনামলে। তখন যমুনা নদীর তীরের একটি ছোট টিলায় নির্জনে বসবাস করতেন আবদুল্লাহ নামের এক সুফি সাধক। তাঁর আদি নিবাস ইরান অথবা ইরাকে ছিল বলে ধারণা করা হয়।
আবদুল্লাহ ছিলেন ধর্মপরায়ণ ও ধ্যানমগ্ন মানুষ। ঈশ্বরের প্রেমে গভীরভাবে নিমগ্ন থাকার কারণে স্থানীয় লোকজন তাঁকে ‘মজনু’ নামে ডাকতে শুরু করেন। শব্দটির অর্থ প্রেমে আত্মহারা কিংবা প্রেমে পাগল ব্যক্তি। তাঁর জীবনযাপনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল মানুষের সেবা। যমুনা নদী পারাপারে তিনি যাত্রীদের বিনা মূল্যে সাহায্য করতেন।
এমন সময় দিল্লিতে আসেন শিখ ধর্মের প্রথম গুরু গুরু নানক দেব। ধর্ম প্রচার ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধির উদ্দেশ্যে তিনি বিভিন্ন অঞ্চল ভ্রমণ করতেন। তাঁর এসব দীর্ঘ ভ্রমণ ‘উদাসী’ নামে পরিচিত।
দিল্লিতে এসে গুরু নানক আবদুল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ব্রিজ কিষাণ চণ্ডিওয়ালার বইয়ের বর্ণনা অনুযায়ী, গুরু নানক দিল্লিতে পৌঁছে আবদুল্লাহর আশ্রমেই অবস্থান করেছিলেন।
গুরু নানকের শিক্ষা আবদুল্লাহকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। আধ্যাত্মিক সাধনার পাশাপাশি সক্রিয় জীবনযাপন এবং মানুষের সেবার গুরুত্ব তাঁকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। পরে তিনি গুরু নানকের শিষ্য হন। তাঁর নির্জন সাধনাস্থলও ধীরে ধীরে ধর্মীয় গুরুত্ব অর্জন করে।
আবদুল্লাহর ভক্তি ও নিষ্ঠায় সন্তুষ্ট হয়ে গুরু নানক ওই টিলাকে তাঁর নামে পরিচিত করার ইচ্ছায় আশীর্বাদ দেন বলে প্রচলিত কাহিনিতে উল্লেখ রয়েছে। সেই থেকেই জায়গাটির নাম হয় ‘মজনু কা টিলা’। হিন্দিতে ‘টিলা’ বলতে ছোট পাহাড় বা উঁচু ঢিবিকে বোঝায়। অর্থাৎ, মজনুর টিলা থেকেই নামটির উৎপত্তি।
শিখ ধর্মের ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকা
মজনু কা টিলার আধ্যাত্মিক গুরুত্ব পরবর্তী শতাব্দীগুলোতেও বজায় ছিল। শিখ ধর্মের ষষ্ঠ গুরু হরগোবিন্দ জি মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন ঘটনার সময় এই স্থানে অবস্থান করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। গ্বালিয়র দুর্গে বন্দিত্বের আগে ও পরে তাঁর এই এলাকায় আসার কথা জানা যায়।
পরবর্তী সময়ে শিখ ধর্মের সপ্তম গুরু হর রাইয়ের জ্যেষ্ঠ পুত্র রাম রাইও এখানে অবস্থান করেন বলে প্রকাশিত ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। তাঁকে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের দরবারে পাঠানো হয়েছিল।
১৭৮৩ সালে শিখ সামরিক নেতা সর্দার বাঘেল সিং গুরু নানকের দিল্লি সফরকে স্মরণীয় করে রাখতে এখানে গুরুদ্বার মজনু টিলা সাহিব নির্মাণ করেন। পরবর্তী সময়ে ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে মহারাজা রণজিৎ সিং এই গুরুদ্বারের জন্য জমি দান করেন বলে প্রকাশিত বিবরণে বলা হয়েছে। বর্তমানে এটি দিল্লির প্রাচীন টিকে থাকা শিখ ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোর অন্যতম।
তিব্বতি জনবসতি থেকে জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র
মজনু কা টিলার বর্তমান পরিচয় অবশ্য তার ঐতিহাসিক গুরুত্বের পাশাপাশি আরও নানা কারণে গড়ে উঠেছে। এলাকাটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিউ অরুণা নগর কলোনি বা সামেলিং নামেও পরিচিত। ‘লিটল তিব্বত’ নামে পরিচিত এই জনপদ ১৯৫৯ সালে তিব্বতে বিদ্রোহ এবং দালাই লামার নির্বাসনের পর তিব্বতি শরণার্থীদের বসতি হিসেবে গড়ে ওঠে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এলাকাটি দিল্লির অন্যতম আকর্ষণীয় খাবার ও কেনাকাটার গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। সরু গলিতে সারি সারি ক্যাফে, ছবি তোলার উপযোগী সাজসজ্জা, তুলনামূলক সাশ্রয়ী পোশাকের দোকান এবং নানা দেশের খাবারের সমাহার দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে।
এখানে তিব্বতি খাবার মোমো, লাফিং ও থুকপার পাশাপাশি পাওয়া যায় কোরীয় ধাঁচের বারবিকিউ এবং নরম প্যানকেকসহ নানা ধরনের খাবার। বিশেষ করে তরুণদের কাছে এলাকাটি জনপ্রিয় আড্ডাস্থল।
তবে আধুনিক ক্যাফে, খাবার আর পর্যটকদের ভিড়ের আড়ালে মজনু কা টিলার পুরোনো ইতিহাস অনেকেরই অজানা থেকে যায়। প্রায় পাঁচ শতাব্দী আগে এক সুফি সাধকের মানবসেবা, গুরু নানকের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ এবং একটি টিলাকে ঘিরে গড়ে ওঠা আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যই এই এলাকার নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
আজকের মজনু কা টিলা তাই শুধু খাবার ও বিনোদনের জায়গা নয়; এটি দিল্লির বহুমাত্রিক ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যেরও একটি পরিচিত নিদর্শন।












