যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় গিয়েছিলেন ইংরেজি শেখানোর কাজ করতে। তখন তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা ছিল না। কিন্তু দেশটিতে চার বছর শিক্ষকতা করার পর এমন এক পেশার সঙ্গে পরিচয় হলো, যা বদলে দিল তাঁর জীবনের গতিপথ। এখন তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু দ্বীপের একজন প্রশিক্ষিত নারী ডুবুরি। সমুদ্রের গভীরে গিয়ে আধুনিক শ্বাসযন্ত্রের সাহায্য ছাড়াই সামুদ্রিক খাবার সংগ্রহ করেন তিনি। ঐতিহ্যবাহী এই পেশার নাম ‘হেনিয়ো’।
৩৬ বছর বয়সী কাইলি জেন্টারের জীবনের এই পরিবর্তন শুধু পেশা বদলের গল্প নয়। এটি নতুন পরিবেশে নিজেকে খুঁজে পাওয়া, ভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং নিজের ভালো লাগার কাজকে জীবনের অংশ করে নেওয়ার গল্প।
কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই দক্ষিণ কোরিয়ায় যাত্রা
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের একটি এলাকায় বেড়ে ওঠা কাইলি তিন ভাইবোনের মধ্যে মেজো। বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগাযোগবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা শেষ করেন ২০১২ সালে। এরপর স্নাতকোত্তর পড়াশোনা ও চাকরির জন্য চেষ্টা করলেও আশানুরূপ সুযোগ পাননি। ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছিল। একই সঙ্গে নিজের পরিচিত পরিবেশ থেকে বেরিয়ে নতুন কোথাও যাওয়ার ইচ্ছাও তৈরি হয়েছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছর জাপানি ভাষা শেখায় জাপানে ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে কাজ করার কথা প্রথমে ভেবেছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়ায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দেশটির কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরির পাশাপাশি আবাসনের ব্যবস্থাও ছিল। নতুন দেশে যাওয়ার আগে দক্ষিণ কোরিয়া সম্পর্কে তাঁর তেমন ধারণা ছিল না। এমনকি কোরিয়ান পপসংগীতের প্রতিও বিশেষ আগ্রহ ছিল না তাঁর।

বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করার মাত্র চার মাস পর দক্ষিণ কোরিয়ার জিনজু শহরে চলে যান কাইলি। সিউল থেকে দ্রুতগতির ট্রেনে শহরটিতে পৌঁছাতে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা লাগে। সেখানে ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে তাঁর নতুন জীবন শুরু হয়।
সকালে শিশুদের ২০ মিনিটের ছোট ছোট পাঠ দিতেন তিনি। বিকেলে নিতেন ইংরেজিতে কথা বলার অনুশীলনের ক্লাস। এভাবেই ধীরে ধীরে নতুন দেশের জীবনযাত্রার সঙ্গে পরিচিত হন কাইলি।
২০২০ সালের আগস্ট পর্যন্ত শিক্ষকতা চালিয়ে যান তিনি। ওই বছরই বিয়ে করেন এবং স্বামীর সঙ্গে একটি আবাসন ব্যবসা শুরু করেন। পাশাপাশি ইংরেজি শেখানোর কাজও চালিয়ে যান।
হেনিয়ো নারীদের জীবন দেখে নতুন আগ্রহ
দক্ষিণ কোরিয়ায় শিক্ষকতা করার চার বছর পর কাইলি প্রথম হেনিয়ো নারীদের সম্পর্কে জানতে পারেন। তাঁরা মূলত জেজু দ্বীপের ঐতিহ্যবাহী নারী ডুবুরি। বিশেষ কোনো আধুনিক শ্বাসযন্ত্র ছাড়াই সমুদ্রে ডুব দিয়ে শামুক, ঝিনুকসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক সম্পদ সংগ্রহ করেন তাঁরা।
এই পেশার প্রতি আগ্রহ তৈরি হওয়ার পর ২০১৮ সালের গ্রীষ্মে ডুব দেওয়ার প্রশিক্ষণ নেন কাইলি। তখন তাঁর আশা ছিল, কোনো একদিন হয়তো এই নারীদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাবেন।
কয়েক বছর পর তাঁর স্বামী, যিনি নিজেও স্কুবা ডাইভিং করেন, একটি ডুবুরি দলের অনলাইন আলোচনায় জানতে পারেন যে জেজু দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি ছোট গ্রামে নতুন ডুবুরি নেওয়া হচ্ছে। গ্রামটির সবচেয়ে কমবয়সী ডুবুরির বয়স ছিল ৬৮ বছর। বিষয়টি কাইলিকে আরও আগ্রহী করে তোলে। তিনি ভাবলেন, এই সুযোগে চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে।
প্রথমবার আবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হন কাইলি। তবে এক মাস পর তাঁকে আবার ডাকা হয়। কেন কর্তৃপক্ষের মনোভাব বদলেছিল, তা তিনি নিশ্চিতভাবে জানেন না। দ্বিতীয়বার সাক্ষাৎকার দেওয়ার সুযোগ পেয়ে তিনি আর পিছিয়ে যাননি।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ডুবুরি হিসেবে প্রশিক্ষণার্থী জীবন শুরু করেন কাইলি। দীর্ঘ দুই বছর প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা অর্জনের পর ২০২৬ সালের এপ্রিলে হেনিয়ো ডুবুরি হিসেবে লাইসেন্স পান তিনি।
লাইসেন্স পেতে কঠিন শর্ত পূরণ

হেনিয়ো হিসেবে স্বীকৃতি পেতে শুধু ডুব দেওয়া জানলেই চলে না। কাইলিকে এক বছরের মধ্যে অন্তত ৫০ দিন সমুদ্রে ডুব দেওয়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়েছে। পাশাপাশি তাঁকে ১২ লাখ দক্ষিণ কোরীয় ওন, অর্থাৎ প্রায় ৮৮৪ ডলার সমমূল্যের সামুদ্রিক খাবার সংগ্রহ করে বিক্রি করতে হয়েছে। সবশেষে সমবায়ের অন্য ডুবুরিদের প্রত্যেকের সম্মতিও পেতে হয়েছে।
এসব শর্ত পূরণ করতে তাঁর দুই বছর সময় লাগে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় বেশ কয়েক বছর কাটানোর পরও ভাষা তাঁর জন্য বড় বাধা হয়ে ছিল। অনেক সময় অন্য ডুবুরিরা কী বলছেন বা কী ঘটছে, তা পুরোপুরি বুঝতে পারতেন না। তবে শারীরিক সক্ষমতা তাঁকে এগিয়ে থাকতে সাহায্য করেছে। তাঁর সঙ্গে কাজ করা অনেক নারীই সত্তর বা আশির কোঠায়। তাঁদের তুলনায় কাইলি শারীরিকভাবে বেশি সক্ষম হওয়ায় জালভর্তি সামুদ্রিক খাবার বহন করা কিংবা বাসনপত্র ধোয়ার মতো কাজেও সহায়তা করেন।
তবে এই পেশায় শারীরিক শক্তির পাশাপাশি নিজের শরীরের প্রতি সচেতন থাকাও জরুরি। অসুস্থ বোধ করলে জোর করে কাজে নামার সুযোগ নেই। সর্দি হলে বা নাকের ভেতরের পথ বন্ধ থাকলে পানির নিচে কানের চাপ সামঞ্জস্য করতে সমস্যা হতে পারে। তাই এমন অবস্থায় ডুব দেওয়া থেকে বিরত থাকেন তিনি।
শরীর সুস্থ ও শক্তিশালী রাখতে নিয়মিত ব্যায়ামও করেন কাইলি। কারণ, সমুদ্রের নিচে কাজ করার জন্য শারীরিক সক্ষমতা ধরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সমুদ্রের কাজ, কুকুরের যত্ন আর নিজের মতো জীবন
ডুবুরি হিসেবে কাজ করলেও কাইলির দিন কাটে নানা কাজে। স্বামীর সঙ্গে তিনি একটি পোষা প্রাণীদের আবাসনকেন্দ্র পরিচালনা করেন। কখনো ইংরেজি পড়ান, কখনো বক্তৃতাও দেন। ফলে তাঁর কাজের সময় বেড়েছে ঠিকই, তবে নিজের সময় নিজের মতো করে ব্যবহারের স্বাধীনতাও বেড়েছে।
কাজ থেকে বিরতি নিতে বা ছুটি কাটাতে এখন আর কারও অনুমতির অপেক্ষায় থাকতে হয় না। আবহাওয়া ও সমুদ্রের পরিস্থিতি বুঝে দিনের কাজ ঠিক করেন তিনি।
সাধারণত সকালে ঘুম থেকে উঠে কুকুরদের হাঁটাতে নিয়ে যান। এরপর সমুদ্রে ডুব দিতে যান। আবহাওয়া খারাপ থাকলে দুই থেকে তিন ঘণ্টা কাজ করেন। অনুকূল পরিস্থিতিতে ডুব দেওয়ার কাজ চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত চলতে পারে। কাজ শেষে আবার কুকুরদের নিয়ে হাঁটতে বের হন।
তাঁর গ্রামের ডুবুরিরা সাধারণত সপ্তাহে পাঁচ দিন সমুদ্রে যান। নির্দিষ্ট সময় ধরে সংগ্রহ করা সামুদ্রিক খাবার একত্র করে স্থানীয় মৎস্য সমবায়ের কাছে বিক্রি করা হয়। সমবায় থেকে অর্থ পাওয়ার পর দলের প্রধান তা অন্য ডুবুরিদের মধ্যে ভাগ করে দেন।

তবে হেনিয়ো পেশা থেকে নিয়মিত বড় অঙ্কের আয় হয় না। কতটা সামুদ্রিক খাবার সংগ্রহ করা যাচ্ছে, তার ওপর আয় নির্ভর করে। কাইলির নিজের বার্ষিক আয় প্রায় দুই হাজার ডলার। আর্থিক নিরাপত্তার দিক থেকে ইংরেজি শিক্ষকতার কাজ অনেক বেশি স্থিতিশীল ছিল। তবু কয়েক প্রজন্ম ধরে এই ঐতিহ্য ধরে রাখা নারীদের কাছ থেকে শেখার সুযোগকে তিনি বিশেষভাবে মূল্য দেন।
পানির নিচে অন্য এক পৃথিবী
কাইলির কাছে ডুবুরি হিসেবে কাজ করার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ শুধু সামুদ্রিক খাবার সংগ্রহ করা নয়। সমুদ্রের গভীরে নামলে বাইরের পৃথিবীর ব্যস্ততা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেন তিনি।
তখন ফোনে কেউ যোগাযোগ করতে পারে না, বারবার বার্তা দেখতে হয় না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় নষ্ট করার সুযোগও থাকে না। মনোযোগ থাকে শুধু ডুব দেওয়া, নিজের নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং সমুদ্র থেকে খাবার সংগ্রহ করার কাজে।
সমুদ্র শান্ত থাকলে এবং প্রচুর সামুদ্রিক খাবার পাওয়া গেলে পানির নিচের সময়টুকু তাঁর কাছে ধ্যানের মতো মনে হয়। প্রতিদিনের জীবনও একরকম নয়। কখনো আবহাওয়া, কখনো সমুদ্রের অবস্থা, আবার কখনো কাজের ধরন বদলে যায়।
এই বৈচিত্র্যই তাঁর ভালো লাগার অন্যতম কারণ। যে দেশে একসময় কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়াই এসেছিলেন, সেই দেশের একটি ছোট দ্বীপের সঙ্গে এখন গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়েছে তাঁর।
কাইলি মনে করেন, হেনিয়ো নারীদের কাছ থেকে তিনি শুধু ডুব দেওয়ার কৌশল শেখেননি; শিখেছেন ধৈর্য, শারীরিক পরিশ্রম এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একটি ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার মূল্যও।
একসময় দক্ষিণ কোরিয়ায় ইংরেজি শেখানোই ছিল তাঁর জীবনের প্রধান কাজ। এখন সমুদ্রের গভীরে ডুব দেওয়া, স্থানীয় নারীদের সঙ্গে কাজ করা এবং দ্বীপের জীবনযাত্রার অংশ হয়ে ওঠাই তাঁর জীবনের বড় পরিচয়। কাইলির ভাষায়, এই গ্রামেই তিনি জীবনের বাকি সময় কাটাতে চান।












