বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবনে নানা পরিবর্তন আসে। কর্মজীবন থেকে অবসর, দাম্পত্য জীবনের টানাপোড়েন, সন্তানদের সঙ্গে দূরত্ব, শারীরিক অসুস্থতা কিংবা প্রিয়জন হারানোর মতো ঘটনা মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। এসব পরিস্থিতিতে অনেকেই একাকিত্ব, উদ্বেগ ও বিষণ্নতায় ভোগেন। কিন্তু বয়স হয়ে গেছে বলে মানসিক সমস্যার চিকিৎসা নেওয়ার প্রয়োজন নেই—এমন ধারণা ভুল। বরং জীবনের পরিণত বয়সেও মনোবিদের সহায়তা মানুষের চিন্তাভাবনা, সম্পর্ক ও জীবনযাপনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
৭০ বছর বয়সী মরিজিওর অভিজ্ঞতা সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়। শৈশব থেকেই মাথাব্যথা ও মাইগ্রেনের সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। মাত্র সাত বছর বয়স থেকে শুরু হওয়া এই সমস্যার কারণ জানতে জীবনের বিভিন্ন সময়ে একাধিক চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত নিজের শারীরিক কষ্টের পেছনে কী কারণ থাকতে পারে, তা আরও ভালোভাবে বোঝার আশায় তিনি মনোচিকিৎসা নেওয়া শুরু করেন।
একসময় তিনি বুঝতে পারেন, সমস্যার একটিমাত্র নির্দিষ্ট কারণ হয়তো কখনোই খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু তাতে থেরাপির গুরুত্ব কমে যায়নি। বরং নিজের জীবন নিয়ে ভাবার এবং অতীতের অভিজ্ঞতাগুলো নতুনভাবে বোঝার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। মরিজিওর ভাষায়, এই প্রক্রিয়া তাঁকে নিজের জীবন আরও পরিষ্কারভাবে বুঝতে সাহায্য করেছে।
একইভাবে দাম্পত্য সম্পর্কের টানাপোড়েন কাটিয়ে উঠতে থেরাপির সাহায্য নিয়েছিলেন ৭৩ বছর বয়সী আন্তোনিও ও তাঁর ৬৮ বছর বয়সী স্ত্রী জিলিওলা। দীর্ঘদিনের হতাশা, জমে থাকা অভিমান এবং এমন কিছু কথা, যা তাঁরা আগে একে অপরকে বলতে পারেননি—এসবই তাঁদের সম্পর্ককে কঠিন করে তুলেছিল।
আন্তোনিও জানান, থেরাপি নেওয়ার কিছুদিন পর তাঁর মন অনেক হালকা হয়ে আসে। নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতেও আগের চেয়ে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন তিনি। তাঁর স্ত্রী জিলিওলার মতে, নিজেদের ভেতরের অনুভূতিগুলো বোঝার চেষ্টা করা এবং আগে বলতে না পারা কথাগুলো প্রকাশ করতে পারা তাঁদের সাহায্য করেছে।
এই অভিজ্ঞতাগুলো একটি প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়—মনোচিকিৎসা কি কেবল তরুণদের জন্য? গবেষণা বলছে, বয়স্ক মানুষেরাও এর মাধ্যমে উপকৃত হতে পারেন। বয়স বাড়লেও নিজের অনুভূতি বোঝা, মানসিক কষ্ট কাটিয়ে ওঠা কিংবা সম্পর্কের উন্নতি ঘটানোর সুযোগ শেষ হয়ে যায় না।
বয়স্কদের জন্য থেরাপি কেন গুরুত্বপূর্ণ
মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মনোচিকিৎসার ইতিবাচক প্রভাব নিয়ে এখন যথেষ্ট গবেষণা রয়েছে। তবে বয়স্ক মানুষেরা তুলনামূলকভাবে কম এই সেবা নিয়ে থাকেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ৭০ বছরের বেশি বয়সীদের প্রায় ১৪ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগেন। এ বয়সে উদ্বেগ ও বিষণ্নতা উল্লেখযোগ্য সমস্যা। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে আত্মহত্যার মোট ঘটনার প্রায় ১৭ শতাংশ ঘটে এই বয়সসীমার মানুষের মধ্যে।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি গবেষণায় দেখা যায়, দেশটির ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মাত্র প্রায় ৪ শতাংশ মনোচিকিৎসা নিয়েছেন। ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ১২ শতাংশ এবং ৩৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে ৮ শতাংশ।
অর্থাৎ, বয়স্কদের মানসিক সহায়তার প্রয়োজন থাকলেও তাঁরা তুলনামূলকভাবে কম চিকিৎসার সুযোগ পাচ্ছেন।
নেদারল্যান্ডসের ভ্রিয়ে ইউনিভার্সিটি আমস্টারডামের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজির অধ্যাপক পিম কাইপার্সের মতে, বয়স বাড়ার কারণে মনোচিকিৎসা কম কার্যকর হয়ে যায়—এমন প্রমাণ নেই। প্রাপ্তবয়স্কদের বিভিন্ন বয়সেই এই চিকিৎসা কার্যকর হতে পারে।
বিভিন্ন বয়সের মানুষের বিষণ্নতার চিকিৎসা নিয়ে করা গবেষণার পর্যালোচনাতেও একই ধরনের ফল পাওয়া গেছে। এমনকি ৭৫ বছরের বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রেও মনোচিকিৎসার কার্যকারিতা কমে যাওয়ার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনে কিছু বিশেষ চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। অবসর নেওয়ার পর পরিচিত সামাজিক পরিবেশ থেকে দূরে সরে যাওয়া, দীর্ঘস্থায়ী রোগের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, প্রিয়জন হারানো কিংবা একাকিত্বের মতো অভিজ্ঞতা মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। এসব পরিস্থিতি সামলাতে থেরাপি সহায়ক হতে পারে।
এর ফলে অনেকের সামগ্রিক সুস্থতার অনুভূতি বাড়ে, নতুন করে কাজ করার আগ্রহ তৈরি হয় এবং সামাজিক যোগাযোগে অংশ নেওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে। অর্থাৎ, থেরাপি শুধু মানসিক কষ্ট কমানোর উপায় নয়; এটি মানুষকে নিজের সঙ্গে এবং চারপাশের জগতের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হতেও সাহায্য করতে পারে।
২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা পর্যালোচনায় দেখা যায়, দলগতভাবে পরিচালিত মানসিক সহায়তা কর্মসূচি বয়স্কদের জন্য বিশেষভাবে উপকারী হতে পারে। এ ধরনের ব্যবস্থায় একই ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাওয়া মানুষের সঙ্গে কথা বলা, অনুভূতি ভাগ করে নেওয়া এবং অন্যদের কাছ থেকে সমর্থন পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
মনোচিকিৎসা শুরু করার ক্ষেত্রে বয়স্কদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম হলেও, একবার শুরু করার পর তাঁদের অনেকেই নিয়মিত চিকিৎসা চালিয়ে যান। কিছু গবেষণায় বয়স্ক অংশগ্রহণকারীদের চিকিৎসা সম্পন্ন করার হার ৫৪ শতাংশ পর্যন্ত পাওয়া গেছে। কিছু ক্ষেত্রে এই হার তরুণদের তুলনায় বেশি।
কেন এমন হয়, তার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নেই। তবে অধ্যাপক কাইপার্সের ধারণা, বয়স্ক মানুষেরা যখন নিজের উদ্যোগে সহায়তা নিতে এগিয়ে আসেন, তখন তাঁদের মধ্যে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার আগ্রহও বেশি থাকতে পারে।
চিকিৎসা নিতে বাধা কোথায়
বয়স্ক মানুষেরা কেন তুলনামূলকভাবে কম মনোচিকিৎসা নেন, এর পেছনে আর্থিক কারণও রয়েছে। অনেকের স্বাস্থ্যবিমায় মনোচিকিৎসার খরচ অন্তর্ভুক্ত থাকে না। আবার নিজের অর্থে দীর্ঘদিন চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়াও সবার পক্ষে সম্ভব হয় না।
এ ছাড়া স্বাস্থ্যসেবাব্যবস্থার মধ্যেও কিছু বাধা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মনোচিকিৎসা নিতে হলে প্রথমে সাধারণ চিকিৎসকের কাছ থেকে পরামর্শ বা সুপারিশ প্রয়োজন হয়। কিন্তু কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, উদ্বেগ বা বিষণ্নতার লক্ষণ থাকা সত্ত্বেও বয়স্কদের তুলনামূলকভাবে কম মনোচিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়।
এর একটি কারণ হলো, বয়স বাড়ার সঙ্গে মানসিক কষ্টকে অনেক সময় স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হয়। শারীরিক অসুস্থতা, অবসর কিংবা জীবনের পরিবর্তনের কারণে মন খারাপ হওয়াকে অনেকে বার্ধক্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করেন। ফলে যে সমস্যার চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে, সেটিও অনেক সময় উপেক্ষিত থেকে যায়।
মনোবিশ্লেষণের প্রবর্তক সিগমুন্ড ফ্রয়েডের পুরোনো কিছু ধারণাও এ ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে। ১৯০৫ সালে প্রকাশিত মনোচিকিৎসাবিষয়ক একটি লেখায় তিনি মন্তব্য করেছিলেন, নির্দিষ্ট বয়সের পর মানুষের মানসিক প্রক্রিয়ার নমনীয়তা কমে যাওয়ায় চিকিৎসা কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা হ্রাস পেতে পারে।
তবে ইতালির পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষামূলক মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও জ্যেষ্ঠ গবেষক রোসানা দে বেনি এই ধারণাকে সঠিক বলে মনে করেন না। তাঁর মতে, গবেষণায় বরং দেখা যায়, বয়স্কদের ক্ষেত্রেও মনোচিকিৎসা কার্যকর হতে পারে।
দে বেনি মনে করেন, চিকিৎসকদের উচিত একজন বয়স্ক মানুষকে শুধু তাঁর বয়স দিয়ে বিচার না করা। প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, আবেগ, সম্পর্ক, আগ্রহ ও প্রয়োজন আলাদা। তাই চিকিৎসার ক্ষেত্রেও এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
বয়স নিয়ে নেতিবাচক ধারণা শুধু চিকিৎসকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; অনেক বয়স্ক মানুষও নিজের সম্পর্কে এমন ধারণা পোষণ করেন। তাঁরা মনে করতে পারেন, বয়স বাড়লে দুঃখ, উদ্বেগ বা একাকিত্ব মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। ফলে প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও সহায়তা চাইতে দ্বিধা করেন।
কিন্তু বয়স সম্পর্কে এ ধরনের নেতিবাচক মনোভাব নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। গবেষণায় বয়স নিয়ে বৈষম্য ও নেতিবাচক ধারণার সঙ্গে উদ্বেগ ও বিষণ্নতার বাড়তি ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তাই বার্ধক্যকে কেবল অবক্ষয়ের সময় হিসেবে না দেখে পরিবর্তন, শেখা ও নতুনভাবে জীবনকে বোঝার একটি পর্যায় হিসেবেও দেখা প্রয়োজন।
জীবনের প্রতিটি পর্যায়েই নতুন করে শুরু করা যায়
মরিজিওর জীবনে মনোচিকিৎসার গুরুত্ব শুধু শারীরিক সমস্যার কারণ খোঁজার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। দাম্পত্য বিচ্ছেদের সময় নিজেকে সামলানো, সন্তানদের সঙ্গে বিভিন্ন দ্বন্দ্ব মোকাবিলা করা এবং কর্মজীবন থেকে অবসরের আগের পর্যায়ে নতুন সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তিনি এর সহায়তা পেয়েছেন।
কর্মজীবন মানুষের পরিচয় ও দৈনন্দিন জীবনের একটি বড় অংশ। অবসরের কাছাকাছি সময়ে সেই পরিচিত রুটিন বদলে গেলে অনেকেই নতুন করে নিজের অবস্থান খুঁজতে সমস্যায় পড়েন। আগে যেখানে সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল, সেখানে অবসরের পর একাকিত্ব তৈরি হতে পারে। এ সময় নতুন আগ্রহ, সামাজিক যোগাযোগ এবং জীবনের পরবর্তী অধ্যায় নিয়ে ভাবতে থেরাপি সাহায্য করতে পারে।
মরিজিও মনে করেন, নিজের জীবনের নানা পর্যায়ে মনোচিকিৎসা তাঁকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। তিনি আশা করেন, তাঁর অভিজ্ঞতা অন্যদেরও সহায়তা নিতে উৎসাহিত করবে। হয়তো কেউ এখনই সিদ্ধান্ত নেবেন না, কিন্তু ভবিষ্যতে তাঁর কথাগুলো মনে রেখে সাহায্য চাইতে এগিয়ে আসতে পারেন।
এই অভিজ্ঞতার মূল শিক্ষা হলো, মানসিক সুস্থতার জন্য কখনোই বয়সকে চূড়ান্ত বাধা হিসেবে দেখা উচিত নয়। জীবনের কোনো পর্যায়ে মানসিক কষ্ট অসহনীয় হয়ে উঠলে, সম্পর্কের সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে কিংবা একাকিত্ব ও উদ্বেগ দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করলে পেশাদার সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
সবার জন্য একই ধরনের চিকিৎসা উপযুক্ত নয়। ব্যক্তির প্রয়োজন, অভিজ্ঞতা ও পরিস্থিতি অনুযায়ী মনোচিকিৎসার ধরন নির্ধারণ করা যায়। কারও জন্য চিন্তা ও আচরণের ধরন পরিবর্তনে সহায়ক চিকিৎসা উপযোগী হতে পারে, কারও জন্য অতীতের অভিজ্ঞতা বোঝার প্রক্রিয়া, আবার কারও জন্য পারিবারিক বা দলগত থেরাপি বেশি কার্যকর হতে পারে।
বয়স বাড়ার অর্থ শেখার, সম্পর্ক গড়ার কিংবা নিজের জীবনকে নতুনভাবে বোঝার সুযোগ শেষ হয়ে যাওয়া নয়। প্রয়োজন হলে সাহায্য চাওয়াও জীবনের প্রতি যত্নশীল হওয়ারই একটি অংশ।












