বিশ্বজুড়ে নারীরা নানা সামাজিক, ব্যক্তিগত ও পেশাগত কারণে তুলনামূলক বেশি বয়সে সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। বিশেষ করে ৩৫ থেকে ৪০ বছর বা তার পরেও মাতৃত্বের পরিকল্পনা করছেন অনেকে। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সন্তান ধারণের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় ডিম্বাণুর গুণগত মানের অবনতি। এতে গর্ভধারণের সম্ভাবনা কমে যায় এবং গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়ে।
এত দিন বয়সজনিত বন্ধ্যত্বের ক্ষেত্রে প্রধান চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে কৃত্রিম প্রজনন পদ্ধতি বা আইভিএফ। কিন্তু এই চিকিৎসা ব্যয়বহুল, শারীরিক ও মানসিকভাবে কষ্টকর এবং সব সময় সফল হয় না। অনেক নারীকে একাধিকবার এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তবে নতুন বৈজ্ঞানিক গবেষণা বয়সজনিত বন্ধ্যত্ব চিকিৎসায় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করছে।
ইউরোপের দুটি নতুন জীবপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এমন চিকিৎসা উদ্ভাবনের চেষ্টা করছে, যার মাধ্যমে নারীদের ডিম্বাণুর গুণগত মান উন্নত করা সম্ভব হতে পারে। তাদের লক্ষ্য, ডিম্বাণুতে ক্রোমোজোমের ত্রুটি কমিয়ে আইভিএফের সফলতার সম্ভাবনা বাড়ানো।
বয়সের সঙ্গে ডিম্বাণুর গুণগত মান কমে
নারীর ডিম্বাণু শরীরের সবচেয়ে পুরোনো কোষগুলোর মধ্যে অন্যতম। একজন নারী ভ্রূণ অবস্থায় থাকতেই তার ডিম্বাণুর প্রাথমিক মজুত তৈরি হয়। মায়ের গর্ভে থাকাকালে এই সংখ্যা কয়েক মিলিয়নে পৌঁছায়। বয়ঃসন্ধিতে তা কমে দাঁড়ায় প্রায় তিন থেকে চার লাখে।
এরপর প্রতি মাসে ডিম্বাণুর সংখ্যা কমতে থাকে। মেনোপজের সময় প্রায় শেষ হয়ে আসে এই মজুত। তবে সমস্যা শুধু ডিম্বাণুর সংখ্যা কমে যাওয়ায় সীমাবদ্ধ নয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অবশিষ্ট ডিম্বাণুর গুণগত মানও দুর্বল হয়।
সুস্থ মানবকোষে সাধারণত ২৩ জোড়া ক্রোমোজোম থাকে। ডিম্বাণু পরিপক্ব হওয়ার সময় প্রতিটি জোড়ার ক্রোমোজোম আলাদা হয়ে যায়। ফলে পরিপক্ব ডিম্বাণুতে থাকে ২৩টি একক ক্রোমোজোম, যা শুক্রাণুর ২৩টি ক্রোমোজোমের সঙ্গে মিলিত হয়ে ভ্রূণ গঠনে ভূমিকা রাখে।
এই প্রক্রিয়ায় ভুল হলে ডিম্বাণুতে ক্রোমোজোমের সংখ্যা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বা কম হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই অবস্থাকে বলা হয় অ্যানিউপ্লয়ডি। এটি বন্ধ্যত্ব ও গর্ভপাতের অন্যতম প্রধান কারণ।
গবেষণায় দেখা গেছে, বিশের কোঠায় থাকা নারীদেরও ২০ শতাংশের বেশি ডিম্বাণুতে ক্রোমোজোমের সংখ্যা স্বাভাবিক থাকে না। ৪০ বছরের বেশি বয়সী নারীদের ক্ষেত্রে এই হার বেড়ে প্রায় ৫০ শতাংশে পৌঁছায়।
ডিম্বাণুর ত্রুটি ঠেকাতে নতুন প্রযুক্তি
জার্মানির গটিঙ্গেনের ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর মাল্টিডিসিপ্লিনারি সায়েন্সেসের গবেষক মেলিনা শুহের নেতৃত্বে একটি দল ডিম্বাণুতে ক্রোমোজোমের ত্রুটি তৈরির আণবিক কারণ অনুসন্ধান করেছে।
গবেষণায় দেখা যায়, ডিম্বাণু পরিপক্ব হওয়ার সময় ক্রোমোজোমের জোড়া একসঙ্গে ধরে রাখতে কোহেসিন নামের একটি অণু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিম্বাণুতে এই অণুর পরিমাণ কমে যায়। ফলে ক্রোমোজোমগুলো সঠিকভাবে আলাদা হতে পারে না এবং ত্রুটিপূর্ণ ডিম্বাণু তৈরি হয়।
গবেষকেরা আরও দেখতে পান, শুগোশিন-১ নামের একটি প্রোটিন কোহেসিনকে ভেঙে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।
এই আবিষ্কারের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মেলিনা শুহ ও তার সহযোগী আগাতা জিলিনস্কা প্রতিষ্ঠা করেন ওভো ল্যাবস। প্রতিষ্ঠানটি এমব্রায়োপ্রটেক্ট-১ নামে একটি সম্ভাব্য চিকিৎসাপদ্ধতি তৈরি করছে। এর মূল উপাদান শুগোশিন-১। লক্ষ্য হলো, ডিম্বাণুতে ক্রোমোজোমের ত্রুটি তৈরি হওয়ার আগেই এই প্রোটিন প্রয়োগ করা।
ইঁদুরের ডিম্বাণুতে পরীক্ষার পর আইভিএফ রোগীদের দান করা ১০০টির বেশি মানব ডিম্বাণুতেও এটি পরীক্ষা করা হয়েছে।
প্রাথমিক ফলাফলে আশাব্যঞ্জক ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বয়স বাড়ার সঙ্গে ইঁদুরের ডিম্বাণুর প্রায় ৬০ শতাংশে ক্রোমোজোমের ত্রুটি দেখা দেয়। কিন্তু এমব্রায়োপ্রটেক্ট-১ প্রয়োগের পর এসব ত্রুটি প্রায় পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হয়েছে।
এই পদ্ধতিতে চিকিৎসা করা ইঁদুরের ডিম্বাণু নিষিক্ত করে সুস্থ বাচ্চাও জন্ম দেওয়া হয়েছে। মানব ডিম্বাণুর পরীক্ষায় ক্রোমোজোমের ত্রুটির হার নিয়ন্ত্রণ দলের তুলনায় প্রায় অর্ধেক কমেছে।
গবেষক মেলিনা শুহের দাবি, ৩৪ থেকে ৪০ বছর বয়সী নারীদের ডিম্বাণুতে এই চিকিৎসার পর স্বাভাবিক ক্রোমোজোমযুক্ত ডিম্বাণুর অনুপাত দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। তবে এসব ফলাফল এখনো কোনো স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে পর্যালোচিত হয়ে প্রকাশিত হয়নি।
অক্সফোর্ডের আরেক প্রতিষ্ঠানের নতুন উদ্যোগ
একই ধরনের সমস্যা সমাধানে কাজ করছে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইউ-প্লয়েড বায়োটেকনোলজিস। প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছেন আলেকজান্দার ওয়েবস্টার ও ক্লোয়ি চারালামবুস। তারা দুজনই মেলিনা শুহের গবেষণাগারে কাজ করেছেন।
ওভো ল্যাবস যেখানে শুগোশিন-১ প্রোটিনের কার্যকারিতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে, ইউ-প্লয়েড সেখানে লাইভান্তা নামের একটি অণু তৈরি করেছে। এটি সেপারেজ নামের একটি এনজাইমের কার্যক্রম ধীর করে। এই এনজাইম শুগোশিন-১ ভেঙে ফেলতে ভূমিকা রাখে। ফলে কোহেসিনের পরিমাণ কমে এবং ক্রোমোজোমের ত্রুটির ঝুঁকি বাড়ে।
ইঁদুরের ওপর ২০২৫ সালে প্রকাশিত পরীক্ষায় দেখা গেছে, লাইভান্তা প্রয়োগের ফলে ৮৪ শতাংশ ডিম্বাণুতে ক্রোমোজোমের ত্রুটি কমানো সম্ভব হয়েছে।
এবার মানবকোষেও এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাল্টিমোরে প্রজনন চিকিৎসাবিষয়ক একটি সম্মেলনে উপস্থাপিত প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যায়, লাইভান্তা প্রয়োগের পর পরিপক্ব হওয়া ডিম্বাণুর মধ্যে ৬৬ শতাংশে কোনো ক্রোমোজোমের ত্রুটি ছিল না। চিকিৎসা ছাড়া এই হার ছিল ৩৬ শতাংশ।
অর্থাৎ, পরীক্ষায় স্বাভাবিক ক্রোমোজোমযুক্ত ডিম্বাণুর অনুপাত প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
আরও দুটি পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা
ওভো ল্যাবস ডিম্বাণুর ক্রোমোজোমের ত্রুটি কমাতে আরও দুটি পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছে।
প্রথম পদ্ধতিতে কৃত্রিমভাবে তৈরি কোহেসিন ব্যবহার করে ডিম্বাণুর স্বাভাবিক কোহেসিনের কার্যকারিতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে প্রাথমিক গবেষণার ফল ৫ নভেম্বর একটি বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে প্রকাশের কথা রয়েছে।
দ্বিতীয় পদ্ধতিতে ডিম্বাণু বিভাজনের সময় ক্রোমোজোমগুলোকে সঠিকভাবে সাজিয়ে রাখার প্রক্রিয়া স্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে।
এ ক্ষেত্রে কেআইএফসি-১ নামের একটি প্রোটিন গুরুত্বপূর্ণ। গবেষকেরা দেখতে পেয়েছেন, অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর তুলনায় মানব ডিম্বাণুতে এই প্রোটিনের পরিমাণ অনেক কম। পরীক্ষায় মানব ডিম্বাণুতে কেআইএফসি-১ প্রয়োগ করলে ক্রোমোজোমের ত্রুটির ঝুঁকি কমেছে।
গবেষকদের ধারণা, এই পদ্ধতি কার্যকর হলে শুধু বেশি বয়সী নারী নন, কম বয়সী নারীদের আইভিএফ চিকিৎসার ফলও উন্নত হতে পারে।
তবে নতুন প্রযুক্তিগুলো নিয়ে এখনই নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান কোপারসার্জিক্যালের প্রজনন বিশেষজ্ঞ রিটা ভাসেনা প্রাথমিক গবেষণার ফলকে উৎসাহব্যঞ্জক বলে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, মানুষের চিকিৎসায় ব্যবহারের আগে এসব পদ্ধতির স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা এবং কার্যকারিতা প্রমাণ করতে হবে।
বাড়ছে নতুন চিকিৎসার চাহিদা
বয়সজনিত বন্ধ্যত্বের চিকিৎসায় নতুন পদ্ধতির চাহিদা বাড়ার কারণও স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৮ সালে বন্ধ্যত্বের চিকিৎসা নিতে আসা নারীদের ৪০ শতাংশের বেশি ছিলেন ৩৮ বছরের ঊর্ধ্বে। যুক্তরাজ্যে ২০২৩ সালে আইভিএফ চিকিৎসা শুরু করা প্রতি ছয়জনের একজনের বয়স ছিল ৪০ বছর বা তার বেশি।
ওভো ল্যাবস ও ইউ-প্লয়েডের গবেষকদের ভাষ্য, নতুন চিকিৎসার ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগেই এতে অংশ নিতে আগ্রহী অনেক নারী তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।
তবে এসব প্রযুক্তি এখনো গবেষণার প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। মানুষের শরীরে প্রয়োগের পর এগুলো কতটা নিরাপদ ও কার্যকর হবে, তা জানতে আরও পরীক্ষা প্রয়োজন।
তারপরও গবেষণার এই অগ্রগতি বন্ধ্যত্ব চিকিৎসায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এত দিন আইভিএফে মূলত ডিম্বাণু সংগ্রহ ও নিষিক্ত করার প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করতে হতো। নতুন গবেষণাগুলোর লক্ষ্য সেই প্রক্রিয়ার আরও আগে, অর্থাৎ ডিম্বাণুতে ত্রুটি তৈরির মূল কারণেই হস্তক্ষেপ করা। সফল হলে বয়সজনিত বন্ধ্যত্বের চিকিৎসায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
বয়সজনিত বন্ধ্যত্বের চিকিৎসায় নতুন গবেষণা ডিম্বাণুর ক্রোমোজোমের ত্রুটি কমিয়ে আইভিএফের সফলতা বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি করছে।












