হুই প্রোটিনই পেশি গঠনের জন্য সবচেয়ে কার্যকর বিকল্প। ব্যায়ামের পর দ্রুত পেশি পুনর্গঠন ও বৃদ্ধিতে এটি অন্য অনেক প্রোটিন পাউডারের তুলনায় বেশি কার্যকর। তবে সব ধরনের প্রোটিন পাউডার এক রকম নয়। কোন উপাদান রয়েছে, শরীর কতটা সহজে তা গ্রহণ করতে পারে এবং পেশি তৈরিতে কতটা সহায়তা করে—এসব বিষয় বিবেচনা করা জরুরি।
১৯৩৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ডেট্রয়েটের ফার্মাসিস্ট ইউজিন শিফ পনির তৈরির সময় পাওয়া তরল বর্জ্য থেকে প্রোটিন পাউডার তৈরি করেন। সেই তরল পদার্থের নাম হুই। একসময় পনির তৈরির উপজাত হিসেবে বিবেচিত হলেও বর্তমানে শরীরচর্চাকারী ও ক্রীড়াবিদদের কাছে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। বাজারে এখন হুইয়ের পাশাপাশি দুধ থেকে তৈরি কেসিন এবং উদ্ভিজ্জ উৎসের মটরশুঁটি ও সয়াবিনের প্রোটিন পাউডারও পাওয়া যায়।
তবে পেশি গঠনের জন্য কোনটি বেশি কার্যকর, তা নির্ভর করে প্রোটিনের অ্যামিনো অ্যাসিডের গঠনের ওপর। বিশেষ করে লিউসিন নামের একটি অ্যামিনো অ্যাসিড এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পেশি তৈরিতে লিউসিনের ভূমিকা
লিউসিন শরীরের জন্য অত্যাবশ্যকীয় নয়টি অ্যামিনো অ্যাসিডের একটি। শরীর নিজে এটি তৈরি করতে পারে না। তাই খাবারের মাধ্যমে গ্রহণ করতে হয়। হুই প্রোটিনের মোট ভরের প্রায় ১২ শতাংশই লিউসিন।
এর বিশেষত্ব হলো, এটি শুধু পেশি তৈরির উপাদান হিসেবেই কাজ করে না, পেশিতে প্রোটিন তৈরির প্রক্রিয়াও সক্রিয় করে। এ কাজে ভূমিকা রাখে এমটিওআর নামের একটি জৈব রাসায়নিক পথ। ব্যায়ামের পর পেশির ক্ষতিগ্রস্ত তন্তু পুনর্গঠনে এই প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ।
ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের কাইনেসিওলজির অধ্যাপক স্টুয়ার্ট ফিলিপসের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, লিউসিন একই সঙ্গে পেশি তৈরির সংকেত এবং নির্মাণসামগ্রী হিসেবে কাজ করে।
তবে বেশি লিউসিন গ্রহণ করলেই যে বেশি পেশি তৈরি হবে, তা নয়। নিউইয়র্কের লেহম্যান কলেজের গবেষক ব্র্যাড শোয়েনফেল্ডের মতে, তরুণ ও শারীরিকভাবে সক্রিয় ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ২৫ গ্রাম হুই প্রোটিনের একটি সাধারণ পরিবেশনে যে পরিমাণ লিউসিন থাকে, তার চেয়ে বেশি গ্রহণ করে বাড়তি পেশি গঠনের সুবিধা পাওয়া যায় না।
বয়স্কদের ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা আলাদা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পেশিকে প্রোটিন তৈরিতে উদ্দীপিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। ২০১৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত লিউসিনযুক্ত হুই প্রোটিন বয়স্কদের পেশি গঠনে সহায়তা করতে পারে।
শুধু লিউসিন নয়, প্রয়োজন অন্য অ্যামিনো অ্যাসিডও
পেশি তৈরির জন্য লিউসিন গুরুত্বপূর্ণ হলেও অন্য অ্যামিনো অ্যাসিডগুলোরও প্রয়োজন রয়েছে। ২০১২ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় তরুণদের তিনটি দলকে পায়ের ব্যায়ামের পর ভিন্ন ভিন্ন পরিমাণ হুই, লিউসিন ও অন্যান্য অ্যামিনো অ্যাসিড দেওয়া হয়।
এরপর ব্যায়ামের এক, তিন ও পাঁচ ঘণ্টা পর অংশগ্রহণকারীদের হাঁটুর ওপরের উরুর পেশি থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। দেখা যায়, লিউসিন সব দলের পেশিতে প্রোটিন তৈরির প্রক্রিয়া সক্রিয় করলেও যারা পূর্ণ মাত্রার হুই প্রোটিন পেয়েছিলেন, তাদের পেশিতে প্রোটিন তৈরির প্রক্রিয়া সবচেয়ে দীর্ঘ সময় সক্রিয় ছিল।
এ থেকে বোঝা যায়, শুধু লিউসিন নয়, পেশি পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য অ্যামিনো অ্যাসিডও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
হুই, কেসিন ও উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের পার্থক্য
কেসিনও দুধ থেকে পাওয়া প্রোটিন। পনির তৈরির সময় দুধের জমাট অংশে এটি থাকে, যেখান থেকে হুই আলাদা করা হয়। তবে কেসিনে লিউসিনের পরিমাণ তুলনামূলক কম। এর মোট ভরের প্রায় ৮ শতাংশ লিউসিন।
এ কারণে ব্যায়ামের পরপরই পেশি পুনর্গঠনের জন্য কেসিন হুইয়ের মতো কার্যকর নয়। তবে এতে অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় অ্যামিনো অ্যাসিডের ভালো সমন্বয় রয়েছে।
অন্যদিকে মটরশুঁটি ও সয়াবিন থেকে তৈরি প্রোটিন পাউডারে প্রতি পরিবেশনে মোট প্রোটিনের পরিমাণ সাধারণত হুইয়ের তুলনায় কম থাকে।
সব হুই প্রোটিনও সমান নয়
বাজারে হুই প্রোটিনের বিভিন্ন পরিশোধিত সংস্করণ পাওয়া যায়। এর মধ্যে হুই আইসোলেটে ল্যাকটোজের পরিমাণ কম থাকে। ফলে যারা ল্যাকটোজ এড়িয়ে চলতে চান, তাদের জন্য এটি উপযোগী হতে পারে।
আর হুই হাইড্রোলাইসেট তৈরি করা হয় এনজাইমের সাহায্যে প্রোটিনকে আগে থেকেই আংশিক ভেঙে। এতে হজম প্রক্রিয়া সহজ হতে পারে বলে দাবি করা হয়।
তবে এসব উন্নত সংস্করণ পেশি গঠনে সাধারণ হুইয়ের চেয়ে বেশি কার্যকর—এমন দাবির পক্ষে শক্ত প্রমাণ নেই। ২০২১ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, পেশিতে প্রোটিন তৈরির প্রক্রিয়া বাড়ানোর ক্ষেত্রে পরিশোধিত হুইয়ের বাড়তি সুবিধার প্রমাণ খুবই সীমিত।
তাই ব্যায়ামের পর দ্রুত পেশি পুনর্গঠনের জন্য সাধারণ ও বিশুদ্ধ হুই প্রোটিনই ভালো বিকল্প।
প্রোটিন পাউডার কেনার সময় সতর্কতা
কিছু উৎপাদক প্রোটিন পাউডারে গ্লাইসিন ও টরিনের মতো অ্যামিনো অ্যাসিড যোগ করেন। এসব উপাদান তুলনামূলক কম খরচে তৈরি করা যায়। কিন্তু এগুলো যোগ করলেই পেশি গঠনের কার্যকারিতা বাড়ে না। বরং পণ্যের মোট অ্যামিনো অ্যাসিডের পরিমাণ বেশি দেখানোর সুযোগ তৈরি হয়।
কিছু পণ্যে অতিরিক্ত শর্করা, ঘনত্ব বাড়ানোর উপাদান এবং ইমালসিফায়ারও ব্যবহার করা হয়। তাই শুধু প্যাকেটের গায়ে বেশি প্রোটিন বা অ্যামিনো অ্যাসিডের সংখ্যা দেখে পণ্য কেনা ঠিক নয়।
পেশি গঠনের জন্য প্রোটিনের উৎস, অ্যামিনো অ্যাসিডের গঠন এবং উপাদানের বিশুদ্ধতা বিবেচনা করা জরুরি। সব মিলিয়ে, ব্যায়ামের পর পেশি পুনর্গঠনের জন্য অতিরিক্ত উপাদান মেশানো পণ্যের চেয়ে বিশুদ্ধ হুই প্রোটিনই বেশি নির্ভরযোগ্য পছন্দ।












