যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে হামে আক্রান্ত হয়ে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ৩০ বছরের মধ্যে অঙ্গরাজ্যটিতে হামের কারণে এটিই প্রথম শিশুমৃত্যুর ঘটনা। সোমবার (২ নভেম্বর) স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ ও অঙ্গরাজ্য প্রশাসন মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
নিউইয়র্কের লুইস কাউন্টিতে শিশুটির মৃত্যু হয়েছে। অঙ্গরাজ্যের গভর্নর ক্যাথি হোকুল এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, একজন মা ও দাদি হিসেবে এই পরিবার কী কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা কল্পনা করাও তাঁর জন্য কঠিন। শিশুটির পরিবার ও স্বজনদের প্রতি সমবেদনা জানান তিনি।
হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ উল্লেখ করে হোকুল বলেন, এই রোগ থেকে সুরক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকা নেওয়া। তাঁর মতে, কয়েক দশকের জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় অর্জিত অগ্রগতি দুর্বল হয়ে পড়লে প্রতিরোধযোগ্য রোগের ঝুঁকি আবারও বাড়তে পারে।
নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের স্বাস্থ্য বিভাগ ও লুইস কাউন্টির স্বাস্থ্য বিভাগ যৌথ বিবৃতিতে শিশুটির মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে বাসিন্দাদের টিকার বিষয়ে হালনাগাদ থাকার আহ্বান জানিয়েছে। শিশুটির পরিবারের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি সম্মান দেখানোর অনুরোধও করেছে তারা।
নিউইয়র্কে বাড়ছে হাম
হামের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় গত মাসে নিউইয়র্কজুড়ে দুর্যোগকালীন জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন গভর্নর হোকুল। ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত অঙ্গরাজ্যটিতে ১৭৮ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছিল। এর মধ্যে লুইস কাউন্টিতে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত ১৫ জন আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। কাউন্টিতে আক্রান্তদের কেউই হাম, মাম্পস ও রুবেলা প্রতিরোধী এমএমআর টিকা নেননি।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) নিউইয়র্কে বিশেষজ্ঞ দল পাঠিয়েছে। দেশটির স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগ জানিয়েছে, অঙ্গরাজ্যের অনুরোধে মহামারিবিদ ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে কাজ করছেন। সংক্রমণ পর্যবেক্ষণ, তথ্য বিশ্লেষণ, পরিকল্পনা এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাঁরা সহায়তা দিচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঝুঁকি
সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে ৪ হাজার ৮০০-এর বেশি হামের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। ১৯৯১ সালের পর দেশটিতে এক বছরে এত বেশি সংক্রমণের ঘটনা আর দেখা যায়নি। ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে হাম নির্মূল হয়েছে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।
চলতি বছরের সংক্রমণের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি পেনসিলভানিয়ায় শনাক্ত হয়েছে। অঙ্গরাজ্যটিতে হামের সঙ্গে সম্পর্কিত পাঁচটি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।
হাম শুধু সাধারণ জ্বর বা ফুসকুড়ির রোগ নয়। সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, টিকা না নেওয়া প্রতি পাঁচজন আক্রান্তের একজনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হতে পারে। আক্রান্ত শিশুদের প্রতি ২০ জনে একজনের নিউমোনিয়া হতে পারে, যা ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে হামে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। প্রতি এক হাজার আক্রান্ত শিশুর একজনের মস্তিষ্কে প্রদাহ বা এনসেফালাইটিস দেখা দিতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক সংস্থা প্যান আমেরিকান হেলথ অর্গানাইজেশন আগামী সপ্তাহে হাম ও রুবেলা নির্মূলের অগ্রগতি পর্যালোচনায় বৈঠক করবে। ২০০০ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র যে হাম নির্মূলের স্বীকৃতি ধরে রেখেছে, সেই অবস্থান হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
টিকাদানের হার নিয়ে উদ্বেগ
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা যুক্তরাষ্ট্রে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে টিকাদানের হার কমে যাওয়াকে চিহ্নিত করেছেন। তবে সংক্রমণ বাড়তে থাকায় কিছু এলাকায় নতুন করে টিকা নেওয়ার প্রবণতাও বেড়েছে।
শিশুদের হাম থেকে প্রায় ৯৭ শতাংশ সুরক্ষা দিতে এমএমআর টিকার দুটি ডোজ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তিন বছর বয়সী শিশুদের ৯৩ শতাংশ অন্তত এক ডোজ এমএমআর টিকা নিয়েছিল। অথচ সংক্রমণ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় টিকাদানের হার ৯৫ শতাংশ।
২০২৫ সালে এই হার বেড়ে ৯৭ শতাংশে পৌঁছায়। ওই বছর কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্রে হামে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগের সচিব রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়র হামের সংক্রমণ মোকাবিলা এবং এমএমআর টিকার কার্যকারিতা নিয়ে তাঁর বিভিন্ন বক্তব্যের কারণে সমালোচনার মুখে পড়েছেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও অতীতে টিকার সঙ্গে অটিজমের সম্পর্ক নিয়ে বিতর্কিত দাবি করেছেন।
তবে সোমবারের বিবৃতিতে স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগ জানিয়েছে, কেনেডি ও সিডিসির পরিচালক এরিকা শোয়ার্টজ স্পষ্ট করেছেন যে হাম প্রতিরোধে এমএমআর টিকাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
নিউইয়র্কের গভর্নর হোকুলও বলেছেন, ভবিষ্যতে কোনো পরিবারকে যেন হামের কারণে সন্তান হারাতে না হয়, সে জন্য টিকাদান ও প্রমাণভিত্তিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা অব্যাহত রাখা হবে।












