পাকিস্তানের লাহোরে দুই বিদেশি নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগে করা মামলায় পাঁচ সন্দেহভাজনকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়েছে পুলিশ। তবে অপহরণ, অবৈধভাবে আটকে রাখা ও অর্থ আদায়ের মতো অভিযোগে তাদের জড়িত থাকার কথা তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই মামলায় তিনজনের বিরুদ্ধে দুই নারীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ এনেছে পুলিশ।
জুলাই মাসে দায়ের করা মামলার তদন্ত শেষে আদালতে জমা দেওয়া অসম্পূর্ণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। অভিযুক্তদের একজনের সঙ্গে দেশটির এক জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক ব্যক্তির ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ রয়েছে। তবে ওই ব্যক্তিসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে ধর্ষণের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে দাবি করেছে পুলিশ।
ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসায় বিনিয়োগ নিয়ে বিরোধ
তদন্ত প্রতিবেদনে দুই নারীর অভিযোগের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে সিঙ্গাপুরে তিন প্রধান সন্দেহভাজনের একজনের সঙ্গে তাদের পরিচয় হয়। ওই ব্যক্তি তাদের ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে আগ্রহ দেখান। প্রথম বিনিয়োগ থেকে মুনাফা পাওয়ার পর তিনি আরও পাঁচ লাখ ডলার বিনিয়োগ করেন। তবে পরবর্তী সময়ে ওই দুই নারী তাকে কোনো মুনাফা দেননি এবং বিনিয়োগের অর্থও ফেরত দেননি বলে অভিযোগ।
পুলিশের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুনে ওই সন্দেহভাজন অন্য এক বিনিয়োগকারীর সঙ্গে বৈঠকের ব্যবস্থা করার কথা বলে দুই নারীকে পাকিস্তানে আমন্ত্রণ জানান। তারা ইসলামাবাদের একটি হোটেলে ওঠেন এবং পরে মুরিসহ বিভিন্ন এলাকায় যান।
একপর্যায়ে ওই ব্যক্তি তার এক সহযোগীকে জানান, দুই নারীর কাছে তিনি টাকা পান। এরপর ওই সহযোগী আরেক প্রধান সন্দেহভাজনকে বিষয়টি জানান, যাকে তদন্ত প্রতিবেদনে ‘বস’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
লাহোরের বাড়িতে আটকে রেখে অর্থ আদায়ের অভিযোগ
গত ২৯ জুন দুই নারীকে লাহোরের ডিফেন্স ফেজ-৭ এলাকার একটি বাড়িতে নেওয়া হয়। সেখানে তাদের আটকে রেখে পাওনা অর্থ পরিশোধের জন্য চাপ দেওয়া হয় বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের দাবি, অস্ত্রধারী ব্যক্তিরা বাড়িটিতে দুই নারীকে পাহারা দিতেন। তাদের ছুরি, বন্দুক ও ভাঙা আয়নার টুকরা দেখিয়ে ভয় দেখানো হয়। টাকা না দিলে হত্যা করে লাশের বিভিন্ন অংশ বিক্রি করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছেন দুই নারী।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে প্রায় ১৯ হাজার ৫০০ ডলার স্থানান্তর করানো হয়। লাহোরের একটি ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে অর্থটি পাকিস্তানি মুদ্রায় রূপান্তর করা হয়। এর মধ্যে দুই সন্দেহভাজন প্রত্যেকে ১১ লাখ রুপি করে পেয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ওই বাড়িতে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে তিনজনের বিরুদ্ধে প্রমাণ পাওয়া গেছে। অন্য পাঁচজনের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ সমর্থন করার মতো প্রমাণ মেলেনি।
দুর্ঘটনার পর পুলিশের হাতে দুই নারী
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১ জুলাই বিমানবন্দরে নেওয়ার পথে একটি গাড়ি ভাট্টা চক এলাকায় দুর্ঘটনায় পড়ে। এ সময় দুই নারী চিৎকার করে সাহায্য চাইলে রাজনৈতিক ব্যক্তির আত্মীয় হিসেবে পরিচিত এক সন্দেহভাজন পালিয়ে যান। পরে পুলিশ তাদের নিজেদের হেফাজতে নেয়।
পুলিশের দাবি, দুই নারীর কাছ থেকে আদায় করা অর্থের মধ্যে ৪৩ লাখ রুপি উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে ধারণা করা একটি মুঠোফোন ও গাড়িও জব্দ করা হয়েছে। দুটি পিস্তল ও একটি রাইফেল উদ্ধারের কথাও জানিয়েছে পুলিশ। অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় পৃথক মামলাও করা হয়েছে।
বাড়িটি কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে ভাড়া দেওয়ার অভিযোগে আরেকজন এবং আলামত নষ্ট করতে সহায়তার অভিযোগে আরও একজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ডিএনএ ও ফরেনসিক প্রতিবেদন এখনো অপেক্ষমাণ
দুই নারীর চিকিৎসা পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় তাদের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে। তদন্তের অংশ হিসেবে ডিএনএ, আঙুলের ছাপ ও পলিগ্রাফ পরীক্ষার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ফোনকলের তথ্যও সংগ্রহ করেছে পুলিশ।
তবে পাঞ্জাব ফরেনসিক সায়েন্স এজেন্সির প্রতিবেদন এখনো পাওয়া যায়নি। তদন্তে বিলম্ব এড়াতে পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ থাকার দাবি করে পুলিশ অসম্পূর্ণ প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। আদালতকে অভিযুক্তদের নোটিশ পাঠিয়ে হাজির করার অনুরোধও জানিয়েছে তারা।
অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ রফাকত আলী গন্ডাল ইতিমধ্যে অভিযুক্তদের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদনের অনুলিপি বিতরণ করেছেন। আগামী ১১ নভেম্বর মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে।
এদিকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত তিনজনের মধ্যে দুজনের আইনজীবী সালমান শহীদ পুলিশের তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার অভিযোগ, মূল সন্দেহভাজনদের সুবিধা দিতে পুলিশ তদন্ত করেছে। তার দুই মক্কেল ওই দলের একজনের স্বল্প বেতনের কর্মচারী এবং তাদের বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে। তাদের একজন ঘটনার কথিত স্থানটির পরিচ্ছন্নতাকর্মী ছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।
এর আগে জুলাইয়ে লাহোর পুলিশের ডিআইজি অপারেশনস ফয়সাল কামরান বলেছিলেন, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে বলে অভিযোগ ওঠা সন্দেহভাজনকেও অন্য অপরাধীর মতো বিবেচনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি জানিয়েছিলেন, তদন্তে একটি অপরাধী চক্রের সংশ্লিষ্টতার আশঙ্কা পাওয়া গেছে। কোনো আইনি দুর্বলতা যেন অভিযুক্তদের সুবিধা দিতে না পারে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকার কথা বলেছিলেন তিনি।
দুই বিদেশি নারী ৩ জুলাই পাকিস্তান ছেড়ে চলে যান।












