যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দুই বছর আরও সংঘাতপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে আইন প্রণয়নে বাধার মুখে পড়বেন তিনি। একই সঙ্গে ডেমোক্র্যাটদের তদন্ত, অভিশংসনের উদ্যোগ এবং রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলা করতে হতে পারে তাঁকে।
তবে ক্ষমতার শেষ দুই বছরকে নিষ্ক্রিয়ভাবে কাটানোর মানুষ হিসেবে ট্রাম্পকে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। বরং তাঁদের ধারণা, কংগ্রেসে নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাম্প আরও আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক অবস্থান নিতে পারেন। ইরানে নতুন করে সামরিক অভিযান, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সমঝোতার চেষ্টা, বাণিজ্যনীতি এবং ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে নিজের অবস্থান ধরে রাখার উদ্যোগ—সবই তাঁর সম্ভাব্য কর্মপরিকল্পনায় থাকতে পারে।
জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের পরিচালক পিটার লোগে বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ট্রাম্প পরাজয়ের পর চুপচাপ সরে দাঁড়াবেন—এমনটা তিনি মনে করেন না। তাঁর মতে, ইতিহাসে এমন কোনো নজির নেই, যেখানে ট্রাম্পকে কোণঠাসা করা হলে তিনি লড়াই বন্ধ করেছেন। বরং প্রতিবারই আরও জোরালোভাবে পাল্টা আঘাত করেছেন।
ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সংঘাত বাড়তে পারে
ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের একটি বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলেও তিনি নিজের অবস্থান থেকে সরবেন না। নিউইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ডেমোক্র্যাটদের আইন প্রণয়নের উদ্যোগ এলে তিনি সবকিছুতে ভেটো দেবেন।
এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত কিংবা অভিশংসনের উদ্যোগ নেওয়া হলে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। টাইম সাময়িকীকে তিনি বলেছেন, ডেমোক্র্যাটরা তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে তিনিও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন।
এ ক্ষেত্রে বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে ট্রাম্প ডেমোক্র্যাট নেতাদের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দিতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা। বিশেষ করে যেসব আইনপ্রণেতা তাঁর কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত করছেন, তাঁরা পাল্টা রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে পারেন।
২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজয় মেনে না নেওয়ার অতীত অবস্থানের কারণে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল নিয়েও বিরোধ তৈরি করতে পারেন ট্রাম্প। কোনো আসনের ভোট গণনা নিয়ে প্রশ্ন তোলা কিংবা বিতর্কিত নির্বাচনী ফলের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি বিলম্বিত করার চেষ্টা তাঁর সম্ভাব্য পদক্ষেপের মধ্যে থাকতে পারে।
ইরান নিয়ে নতুন সামরিক পদক্ষেপ?
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত থাকে। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালেও সামরিক ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের হাতে উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা থাকবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান আবার শুরু করার সুযোগ তাঁর সামনে রয়েছে। তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের বক্তব্যে নতুন আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনাও দেখা গেছে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের রায়ান হাস এএফপিকে বলেন, ট্রাম্প চান না তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার একজন যুদ্ধবাজ নেতার পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত হোক। বরং তিনি এমন একজন প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্মরণীয় হতে চান, যিনি যুক্তরাষ্ট্রকে আরও শক্তিশালী অবস্থানে রেখে গেছেন।
এদিকে ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে বরখাস্ত করার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা চলছে। নিজের প্রশাসনের ব্যর্থতার দায় অন্যের ওপর চাপানোর প্রবণতা ট্রাম্পের মধ্যে রয়েছে বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকেরা।
ইউক্রেন, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা অব্যাহত রাখতে পারেন ট্রাম্প। এ ক্ষেত্রে ইউক্রেনকে রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য চাপ দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী সপ্তাহে এ বিষয়ে নতুন ত্রিপক্ষীয় আলোচনা হওয়ার কথা।
একই সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টাও চালিয়ে যেতে পারেন তিনি। চলতি মাসের শেষ দিকে চীনে একটি সম্মেলনে তিন নেতার সম্ভাব্য বৈঠক নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
অন্যদিকে ন্যাটো এবং পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা কমানোর যে প্রবণতা ট্রাম্পের প্রশাসনে দেখা গেছে, তা আরও জোরদার হতে পারে। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের রায়ান হাসের মতে, বাণিজ্যনীতিতে অবশ্য ট্রাম্পের সক্রিয়তা কমার সম্ভাবনা নেই। কানাডার প্রতি তাঁর সাম্প্রতিক কঠোর অবস্থানও এর উদাহরণ।
২০২৮ সালের নির্বাচনেও নিজের প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা
২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক আলোচনায় নিজের অবস্থান ধরে রাখতে চাইবেন ট্রাম্প। তবে রিপাবলিকান পার্টির সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স কিংবা পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও—কাকে সমর্থন করবেন, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট অবস্থান জানাননি তিনি।
সংবিধান অনুযায়ী তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার সুযোগ না থাকলেও ট্রাম্প একসময় এ বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। সম্প্রতি অবশ্য সেই আলোচনা থেকে অনেকটাই সরে এসেছেন।
আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গ্রেট আমেরিকান প্রেসিডেন্টস: দ্য টুয়েলভ হু ট্রান্সফর্মড দ্য নেশন বইয়ের লেখক অ্যালান লিচম্যানের মতে, ট্রাম্প ভবিষ্যৎ নির্বাচনে নিজেকে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা ‘কিংমেকার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত রাখার চেষ্টা করবেন। অর্থাৎ নিজে প্রার্থী না হলেও রিপাবলিকান পার্টির পরবর্তী প্রেসিডেন্ট প্রার্থী বাছাইয়ে তাঁর প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা থাকতে পারে।
ওয়াশিংটনে নিজের স্মৃতিচিহ্ন রেখে যেতে চান ট্রাম্প
ক্ষমতার শেষ পর্যায়ে ট্রাম্প প্রশাসনিক নীতির পাশাপাশি ওয়াশিংটনের অবকাঠামো ও স্থাপনা সংস্কারের দিকেও মনোযোগ দিতে পারেন।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারাভিযানের শেষ ভাষণে নীতিগত বিষয়গুলোর তুলনায় ওয়াশিংটনের সৌন্দর্যবর্ধন এবং লিংকন মেমোরিয়ালের প্রতিফলন পুকুর সংস্কারের পরিকল্পনা নিয়ে বেশি কথা বলেছেন তিনি।
ওয়াশিংটনের বিভিন্ন স্থাপনায় নিজের ছাপ রেখে যাওয়ার ইচ্ছা ট্রাম্প আগেও প্রকাশ করেছেন। তাঁর আশঙ্কা, তিনি নিজে উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে অন্যরা তাঁর নামে উল্লেখযোগ্য কোনো স্থাপনা বা স্মৃতিচিহ্ন তৈরি করবে না।
সোমবার লিংকন মেমোরিয়ালের প্রতিফলন পুকুরের সামনে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, ওয়াশিংটনের জন্য তাঁদের অনেক বড় পরিকল্পনা রয়েছে।
কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ হারানো ট্রাম্পের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অবস্থানকে চাপে ফেলতে পারে। তবে সামরিক, কূটনৈতিক ও নির্বাহী ক্ষমতার ব্যবহার, বিরোধীদের বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপ এবং দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বে প্রভাব ধরে রাখার মাধ্যমে মেয়াদের শেষ দুই বছরেও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকার সুযোগ তাঁর সামনে থাকবে।












