যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দুই বছরের কার্যক্রমের ওপর ভোটারদের এই রায়কে রিপাবলিকানদের জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে দেশটির কয়েকটি সংবাদমাধ্যম।
মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের সব আসন এবং সিনেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে ভোট হয়েছে। পাশাপাশি ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর নির্বাচন, অঙ্গরাজ্যের আইনসভা এবং বিভিন্ন স্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবের ওপরও ভোট দিয়েছেন মার্কিন নাগরিকেরা।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতেও এগোচ্ছে ডেমোক্র্যাটরা। দলটির প্রার্থী রয় কুপার নর্থ ক্যারোলাইনায় রিপাবলিকান প্রার্থী মাইকেল হোয়াটলিকে হারিয়ে সিনেটের একটি আসন জয় করেছেন। অন্যদিকে সাউথ ক্যারোলাইনায় রিপাবলিকান প্রার্থী ডারলিন গ্রাহামকে পরাজিত করেছেন ডেমোক্র্যাট অ্যানি অ্যান্ড্রুজ। এর ফলে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেতে প্রয়োজনীয় চারটি রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত আসনের মধ্যে দুটি নিজেদের দখলে নিতে পেরেছে ডেমোক্র্যাটরা।
সাউথ ক্যারোলাইনায় অ্যান্ড্রুজের জয় বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই অঙ্গরাজ্যে ১৯৯৮ সালের পর প্রথম কোনো ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের নির্বাচনে জয় পেলেন। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প এখানে ১৮ শতাংশ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন।
পেশায় শিশু চিকিৎসক অ্যান্ড্রুজের কাছে হেরে গেছেন সদ্য প্রয়াত সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের বোন ডারলিন গ্রাহাম। লিন্ডসে গ্রাহামের মৃত্যুর পর চলতি বছরের ১৪ জুলাই তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন ডারলিন। নির্বাচনে অ্যান্ড্রুজের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছিলেন সাউথ ক্যারোলাইনার সাবেক দুই গভর্নর, যাঁদের একজন রিপাবলিকান এবং অন্যজন ডেমোক্র্যাট।
জর্জিয়াতেও বড় জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। দলটির প্রার্থী কিশা ল্যান্স বটমস গভর্নর নির্বাচনে রিপাবলিকান ব্যবসায়ী রিক জ্যাকসনকে পরাজিত করেছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অঙ্গরাজ্যের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর হওয়ার ইতিহাস গড়েছেন। একই সঙ্গে জর্জিয়ার প্রথম নারী গভর্নরও হতে যাচ্ছেন তিনি।
আটলান্টার সাবেক মেয়র বটমস আগে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা এবং হোয়াইট হাউসের জনসম্পৃক্ততা দপ্তরের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। জর্জিয়ায় দুই দশকের বেশি সময় ধরে গভর্নরের পদ রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তাঁর জয় অঙ্গরাজ্যটির রাজনৈতিক সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
জর্জিয়ায় সিনেটর জন অসফও পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। ট্রাম্পের সমর্থন পাওয়া রিপাবলিকান প্রতিনিধি মাইক কলিন্সকে পরাজিত করে জয় নিশ্চিত করেন তিনি। বিজয় ভাষণে অসফ বলেন, মার্কিন জনগণ ট্রাম্পের দুর্নীতি, অযোগ্যতা ও রাজনৈতিক আচরণের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান জানিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর চলমান সংকট এখনো কাটেনি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নিউ হ্যাম্পশায়ারেও রিপাবলিকানদের হারিয়ে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট ক্রিস পাপাস। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ও সাবেক সিনেটর জন সুনুনু পরাজয় স্বীকার করে বলেন, নির্বাচনে জয় না পেলেও প্রচারণার সময় ভোটারদের কাছ থেকে অভাবনীয় সাড়া পেয়েছেন।
ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় চাপ
নির্বাচনের আগে থেকেই ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমছিল। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং এর ফলে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ভোটারদের হতাশা নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প নিজে প্রার্থী না হলেও ভোটারদের তাঁর মতো করেই ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এমনকি সমর্থকদের বলেছিলেন, তাঁকে যেন ব্যালটে থাকা প্রার্থী হিসেবে কল্পনা করে ভোট দেন।
তবে হোয়াইট হাউস নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফল নিয়ে আত্মরক্ষামূলক অবস্থান নিয়েছে। একজন কর্মকর্তা বলেছেন, ট্রাম্প নিজে নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন না এবং তাঁর সমর্থকেরা সাধারণত তিনি নির্বাচনে থাকলেই বেশি সংখ্যায় ভোট দিতে আসেন। রিপাবলিকান প্রার্থীদের ব্যক্তিগত যোগ্যতাও ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে বলে দাবি করেন তিনি।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ইরানের সংঘাত শেষ হলে জ্বালানির দাম কমতে পারে। তখন ডেমোক্র্যাটদের ভোট দেওয়া অনেক ভোটার নিজেদের সিদ্ধান্ত নিয়ে অনুতপ্ত হবেন। তবে নির্বাচনের ফল যা-ই হোক, ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে অবস্থান আরও কঠোর হবে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
ভোটার উপস্থিতিতে রেকর্ড
এবারের নির্বাচনে কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে ভোটার উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। টেক্সাসে ৭৭ লাখের বেশি ভোটার আগাম ভোট দিয়েছেন, যা মধ্যবর্তী নির্বাচনে অঙ্গরাজ্যটির আগাম ভোটের নতুন রেকর্ড।
সাউথ ক্যারোলাইনায় গভর্নর নির্বাচনে নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যে ভোট দেওয়ার হার ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফ্লোরিডাতেও ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের তুলনায় নিবন্ধিত ভোটারদের বেশি অংশ ভোট দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন অঙ্গরাজ্যটির নির্বাচন কর্মকর্তা।
এবারের নির্বাচনে প্রচারণা ও ফলাফল অনুসরণের ক্ষেত্রেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা বেড়েছে। ইউটিউব ও টুইচে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সংবাদমাধ্যমের সরাসরি সম্প্রচার ব্যাপক দর্শক পেয়েছে। ডেমোক্র্যাটপন্থী ভাষ্যকার হাসান পাইকারের টুইচ সম্প্রচার একপর্যায়ে ২ লাখ ১৮ হাজার দর্শক দেখেছেন। অন্যদিকে এনবিসি নিউজের বিশ্লেষক স্টিভ করনাকির ইউটিউব সম্প্রচারে দর্শকসংখ্যা ছিল ৩ লাখ ১৩ হাজারের বেশি।
প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হলে আগামী বছর থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের আইন প্রণয়ন ও নীতিনির্ধারণী কার্যক্রমে বড় ধরনের বাধার মুখে পড়তে হতে পারে। তবে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে যাচ্ছে, তা নির্ধারণে বাকি গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোর ফলাফল এখনো বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।












