ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার পাঁচ বন্ধুর কাছে পাহাড়ে ঘুরতে যাওয়া ছিল বছরের সবচেয়ে বড় আনন্দ। কারখানায় মাসে ১৯ থেকে ২০ হাজার রুপি বেতনের চাকরি করতেন তাঁরা। সীমিত আয়ের মধ্যেও সারা বছর কিছু টাকা জমিয়ে রাখতেন একটি ভ্রমণের জন্য। কিন্তু উত্তরাখণ্ডের কেদারতালে পাহাড় দেখতে গিয়ে এবার তুষারপাত ও তুষারধসের কবলে পড়ে নিখোঁজ হয়েছেন তাঁরা।
নিখোঁজ আট পর্যটকের মধ্যে রয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের এই পাঁচ বন্ধু। তাঁরা হলেন রিন্টু মণ্ডল (৪০), উদয় ঘোষ (৩০), রতন ঘোষ (২৩), তাপস বাউরি (৩০) ও মনোজ খাওয়াস (৩৯)। তাঁদের মধ্যে রিন্টু, উদয়, রতন ও তাপস সালবনি গ্রামের বাসিন্দা। মনোজের বাড়ি কেশরা গ্রামে।
গত ২৪ অক্টোবর বাড়ি থেকে উত্তরাখণ্ডের উদ্দেশে রওনা হন তাঁরা। রিন্টুর ভাই সিঁটু মণ্ডল জানান, ২৬ অক্টোবর শেষবার ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছিল। তখন রিন্টু বলেছিলেন, কয়েক দিন ফোনে যোগাযোগ করা সম্ভব হবে না।
এরপর কেটে যায় কয়েক দিন। সোমবার স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা নিখোঁজ পাঁচ বন্ধুর পরিবারের সদস্যদের বাড়িতে গিয়ে তাঁদের নিখোঁজ হওয়ার খবর জানান। এতে পরিবারগুলোতে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।
সিঁটু জানান, এ নিয়ে টানা পাঁচ বছর উত্তরাখণ্ডে বেড়াতে গেছেন তাঁর ভাই ও বন্ধুরা। দার্জিলিং ও নেপালেও ঘুরেছেন তাঁরা। পাহাড়ের প্রতি তাঁদের বিশেষ ভালোবাসা ছিল। প্রতিবছর ভ্রমণের খরচ জোগাতে আগে থেকেই টাকা জমাতেন।
রিন্টু স্থানীয় একটি স্পঞ্জ আয়রন কারখানায় কাজ করতেন। মাসে তাঁর আয় ছিল প্রায় ১৯ হাজার রুপি। ভাইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, পাঁচ বন্ধুর মধ্যে রিন্টুই ছিলেন দলনেতা। এলাকায় পরিচিত ও জনপ্রিয় ছিলেন তিনি। বিয়ে করার চেয়ে পাহাড়ে ঘুরতে যাওয়ার বার্ষিক পরিকল্পনাতেই তাঁর আগ্রহ ছিল বেশি।
ভ্রমণের জন্য প্রয়োজনীয় পোশাক ও সরঞ্জামও নিজেরাই কিনেছিলেন বন্ধুরা। বছরের পর বছর সঞ্চয় করে ট্রেকিংয়ের জ্যাকেট ও বিশেষ জুতা সংগ্রহ করেছিলেন তাঁরা।
উদয় ঘোষ কাজ করতেন বাঁকুড়ার একটি রাবার কারখানায়। তাঁর মাসিক আয়ও ছিল প্রায় ২০ হাজার রুপি। ভাই মলয় ঘোষ জানান, এবার তাঁদের লক্ষ্য ছিল কেদারতাল দেখা। গত চার বছরে উত্তরাখণ্ডের বিভিন্ন তীর্থস্থান ও পর্যটন এলাকায় গেলেও কেদারতালে যাওয়া হয়নি।
উদয়ের বিয়ের পরিকল্পনাও ছিল পরিবারের বাড়ি নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত। বাড়ির প্রথম তলার ছাদের কাজ শেষ হয়েছে। বাকি নির্মাণকাজ ধীরে ধীরে শেষ করে তারপর বিয়ে করার কথা ভাবছিলেন তিনি। এবারের ভ্রমণের জন্য নিজের জমানো প্রায় সব টাকাই খরচ করেছিলেন।
উদয়ের বাবা দীনেশ ঘোষ ছেলের ফিরে আসার আশায় দিন গুনছেন। প্রশাসনের কর্মকর্তারা তাঁদের জানিয়েছেন, তুষারপাতের কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হয়েছে। তারপরও ছেলে জীবিত ফিরে আসবে বলে বিশ্বাস করছেন তিনি।
অন্যদিকে, তাপস বাউরি একটি স্পঞ্জ আয়রন কারখানায় কাজ করতেন। তিনি বাবা-মা ও ভাইয়ের সঙ্গে থাকতেন। রতন ঘোষ ও মনোজ খাওয়াস কাজ করতেন একটি ভূমি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে।
উদ্ধার অভিযানে মিলেছে দুটি মরদেহ
কেদারতালে নিখোঁজ আট পর্যটকের সন্ধানে মঙ্গলবার পঞ্চম দিনের মতো উদ্ধার অভিযান চালানো হয়। এদিন উদ্ধারকারী দল একজন পুরুষ ও একজন নারীর মরদেহ উদ্ধার করেছে। তবে তাঁদের পরিচয় এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।
উত্তরকাশী জেলা জরুরি পরিচালনা কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, সকাল সাড়ে ৭টার দিকে রাজ্য দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনী (এসডিআরএফ) ও নেহরু ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিংয়ের (এনআইএম) যৌথ দল তল্লাশি শুরু করে। দুর্গম এলাকায় দীর্ঘ চেষ্টার পর দুটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
বিকেল ৩টার দিকে অভিযান স্থগিত করে উদ্ধারকারীরা বেস ক্যাম্পে ফিরে যান। বুধবার আবারও অভিযান শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ঘটনাস্থলে হেলিকপ্টার পরিচালনার সুবিধার্থে বিকল্প একটি হেলিপ্যাডও তৈরি করা হয়েছে। জায়গাটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪ হাজার ৫ মিটার উঁচুতে অবস্থিত।
আবহাওয়ার সতর্কতা পৌঁছায়নি অভিযাত্রীদের কাছে
নিখোঁজ পর্যটকেরা ১২ সদস্যের একটি অভিযাত্রী দলের অংশ ছিলেন। গত ২৭ অক্টোবর গঙ্গোত্রী থেকে কেদারতালের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন তাঁরা। দলে ছিলেন সাতজন পর্যটক, একজন গাইড, একজন রাঁধুনি ও তিনজন মালবাহক। ২৬ অক্টোবর তিন দিনের অভিযানের অনুমতি নেওয়া হয়েছিল। ২৯ অক্টোবর তাঁদের ফিরে আসার কথা ছিল।
অভিযাত্রী দল রওনা হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ২৭ অক্টোবর সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ১১টার দিকে কর্তৃপক্ষ আবহাওয়ার সতর্কতা পায়। এতে ২৯ অক্টোবর প্রতিকূল আবহাওয়ার আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছিল। তবে অভিযাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারায় সতর্কবার্তাটি তাঁদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
৩০ অক্টোবর দলটির ফিরে না আসার খবর পাওয়ার পর কর্তৃপক্ষ জানতে পারে, ভারী তুষারপাত ও তুষারধসে তাঁরা আটকা পড়েছেন।
এরপর ৩১ অক্টোবর তুষারধসে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার নিচে কাচ্চি ধাংয়ের কাছে তিনজন মালবাহক ও একজন রাঁধুনিকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।
সোমবার চতুর্থ দিনের অভিযানে উদ্ধারকারীরা কেদারকাডাক এলাকায় একটি তাঁবু, ব্যাগ ও অন্যান্য ব্যক্তিগত জিনিসপত্র দেখতে পান। পরে ওই এলাকায় খনন করে দুটি মরদেহের সন্ধান মেলে। আকাশপথে তল্লাশি চালিয়েও নিখোঁজদের বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
নিখোঁজ আটজনের মধ্যে উত্তরপ্রদেশের দুই নারীও রয়েছেন। তাঁদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।












