ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে সমঝোতার আলোচনা চললেও দুই দেশের অবস্থানের ব্যবধান এখনো অনেক বেশি। মধ্যস্থতাকারীরা দুই পক্ষের মতপার্থক্য কমাতে জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক অভিযানের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, নতুন করে হামলা চালানোর বিষয়ে তাঁর কোনো তাড়াহুড়ো নেই।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিন বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এসব কথা বলেন। ইরান যুদ্ধ এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন জনগণের অসন্তোষের মধ্যেই ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরুর আশঙ্কা বাড়ছে।
ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, তিনি অনেক মানুষকে হত্যা করতে চান না। তবে প্রয়োজন হলে সামরিক পদক্ষেপ নিতে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত।
অন্যদিকে, ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে বর্তমান অচলাবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র মোটামুটি সন্তুষ্ট। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র যা চায়, তার প্রায় সবই অর্জন করছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সম্ভাব্য নতুন হামলার ইঙ্গিত সম্পর্কে জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত রয়েছে। তবে হামলার কোনো কারণ নাও থাকতে পারে।
ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে পরোক্ষ আলোচনা চলছে বলেও জানান তিনি।
মধ্যস্থতায় কাতারের তৎপরতা
ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যে ব্যবধান কমাতে মধ্যস্থতাকারীরা জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। গত আট দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য চুক্তির একটি খসড়া নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা সোমবার রাতে তেহরান সফর করেন।
তবে তেহরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দিতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের কয়েকটি শর্ত মেনে নিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের ওপর থেকে তেল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া এবং জব্দ করা ইরানি অর্থ ছাড় করা।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজায়ি বলেছেন, ইরানের দাবির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জবাব সন্তোষজনক নয়। তাঁর মতে, তেহরানের সাতটি শর্ত স্পষ্টভাবে মেনে নিয়ে সেগুলো বাস্তবায়ন করলেই হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই মধ্যস্থতাকারীদের দেওয়া প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে। কাতারের প্রতিনিধিদল তেহরান থেকে দোহায় ফিরে এলেও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
তিনি বলেন, সংঘাত এড়াতে আঞ্চলিক দেশগুলো সম্মিলিতভাবে নিবিড় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। চুক্তির সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি বলেও আশাবাদ প্রকাশ করেন তিনি।
আলোচনার সঙ্গে যুক্ত এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগামী ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে ওয়াশিংটন ও তেহরানের প্রতিক্রিয়া পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। তবে ইরানের আরেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান বা প্রস্তাব পর্যালোচনার জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই।
ইরানের কঠোর অবস্থান
ইরানের ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত দাবি তেহরান মেনে নেবে না। ইরানের শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত পারমাণবিক আলোচনা শুরু হওয়ারও সম্ভাবনা নেই।
তিনি আরও সতর্ক করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলে শক্তিশালী জবাব দেবে ইরান।
দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, তেহরান তার অবস্থান থেকে সরে আসবে না। তাঁর দাবি, সামরিক হুমকি ও শক্তি প্রয়োগ করে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার চেষ্টা সফল হবে না।
ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আলী আবদোল্লাহিও জানিয়েছেন, মার্কিন ও ইসরায়েলি স্থাপনাসহ বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুর তালিকা হালনাগাদ করা হচ্ছে। যেকোনো হুমকির জবাব তাৎক্ষণিকভাবে দেওয়া হবে।
এদিকে ইরানের কট্টরপন্থী সংবাদপত্র কায়হান জানিয়েছে, নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে ব্রিটেন, ইতালি, গ্রিস, রোমানিয়া, আলবেনিয়া ও সাইপ্রাসে থাকা মার্কিন স্থাপনাগুলোও ইরানের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
ইরানের দ্বীপে মার্কিন হামলা
কূটনৈতিক আলোচনা চলার মধ্যেই মঙ্গলবার রাতে ইরানের কেশম দ্বীপে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা ও সম্পদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।
মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, হামলাটি ছিল প্রতিরক্ষামূলক ও সীমিত। এটি বড় ধরনের সামরিক অভিযান আবার শুরু করার ইঙ্গিত নয়।
তবে ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধ নতুন করে ছড়িয়ে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা বাড়ছে। বিশেষ করে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
সৌদি আরবের সঙ্গে ইরানের আলোচনা
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমাতে ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যেও আলোচনা চলছে। ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতিদের সৌদি আরবের ওপর হামলা জোরদারের মধ্যে এ উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সৌদি আরবের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। এ ব্যবস্থায় বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের সুযোগ না রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
গত সপ্তাহে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা তেহরানে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। গত আগস্টের পর এটিই ছিল এ পর্যায়ের প্রথম যোগাযোগ।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত থাকলেও সমঝোতার পথ এখনো অনিশ্চিত। একদিকে ট্রাম্প সামরিক পদক্ষেপের প্রস্তুতির কথা বলছেন, অন্যদিকে তেহরানও কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে। ফলে মধ্যস্থতাকারীদের উদ্যোগ সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কাটেনি।












