ইরান যুদ্ধ শুরুর পর সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছানোর এক মাসের মধ্যেই অক্টোবরে কমেছে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রপ্তানি। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর হামলা ও নিরাপত্তাঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় এ অঞ্চলের তেল পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে নজরদারি এড়াতে ট্যাংকারগুলোর অবস্থান শনাক্ত করার সংকেত বন্ধ রাখার প্রবণতা বাড়ায় প্রকৃত রপ্তানির পরিমাণ নির্ধারণও কঠিন হয়ে পড়েছে।
জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ভর্টেক্সার তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে অপরিশোধিত তেল, কনডেনসেট ও পরিশোধিত জ্বালানি পণ্য রপ্তানি হয়েছে দৈনিক গড়ে ১ কোটি ৭১ লাখ ব্যারেল। তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজি এই হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছে।
সেপ্টেম্বরে এই রপ্তানির পরিমাণ ছিল দৈনিক ১ কোটি ৮৯ লাখ ব্যারেল। অর্থাৎ এক মাসে রপ্তানি কমেছে দৈনিক ১৮ লাখ ব্যারেল। তবে অক্টোবরে রপ্তানি যুদ্ধ শুরুর আগের স্বাভাবিক পরিমাণের প্রায় ৭৫ শতাংশে ছিল।
অন্য একটি জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের হিসাবেও রপ্তানি কমার চিত্র উঠে এসেছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরে অপরিশোধিত তেল ও কনডেনসেট রপ্তানি সেপ্টেম্বরে তুলনায় দৈনিক প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল কমেছে।
হরমুজ প্রণালিতে বাড়ছে নিরাপত্তাঝুঁকি
রপ্তানি কমার অন্যতম কারণ হিসেবে হরমুজ প্রণালির আশপাশে জাহাজের ওপর হামলার ঘটনা এবং নিরাপত্তাঝুঁকি বৃদ্ধিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। অক্টোবরে এ অঞ্চলে জাহাজ চলাচলের ওপর হামলা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে।
নিরাপত্তার কারণে অনেক ট্যাংকার তাদের অবস্থান শনাক্ত করার স্বয়ংক্রিয় সংকেত বন্ধ রাখছে। ফলে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে জাহাজের চলাচল পর্যবেক্ষণ করেও সব চালানের তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যাচ্ছে না।
ভর্টেক্সার বিশ্লেষক জর্জ মরিসের মতে, হরমুজ প্রণালিতে ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে সমুদ্রপথে তেল রপ্তানি সাম্প্রতিক যুদ্ধ-পরবর্তী সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে কিছুটা পিছিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি বলছে, অক্টোবরে রপ্তানির প্রাথমিক হিসাব পরবর্তী সময়ে কমার চেয়ে বাড়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ, অনেক ট্যাংকারের চলাচলের তথ্য দেরিতে পাওয়া যাচ্ছে। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে চালানের বিষয়টি নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন হচ্ছে।
অপরিশোধিত তেল রপ্তানি দ্রুত ফিরছে
ভর্টেক্সার তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরে অপরিশোধিত তেল ও কনডেনসেট রপ্তানি দৈনিক গড়ে ১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। এটি যুদ্ধের আগের স্বাভাবিক রপ্তানির প্রায় ৮৬ শতাংশ।
অন্যদিকে পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যের রপ্তানি ছিল দৈনিক ৩১ লাখ ব্যারেল, যা স্বাভাবিক সময়ের অর্ধেকের সামান্য বেশি। অর্থাৎ অপরিশোধিত তেলের রপ্তানি তুলনামূলক দ্রুত পুনরুদ্ধার হলেও পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যের সরবরাহ এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
দেশভিত্তিক হিসাবে সৌদি আরবের রপ্তানি সেপ্টেম্বরে তুলনায় প্রায় স্থিতিশীল ছিল। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রপ্তানিতে সবচেয়ে বড় পতন দেখা গেছে। ইরাক, ওমান ও কুয়েতের রপ্তানিও কমেছে।
কেপলারের হিসাব অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি, লোহিত সাগর ও ওমান উপসাগর দিয়ে অক্টোবরে অপরিশোধিত তেল ও কনডেনসেটের গড় প্রবাহ ছিল দৈনিক প্রায় ১ কোটি ৬১ লাখ ব্যারেল। সেপ্টেম্বরে এই পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৭০ লাখ ৯০ হাজার ব্যারেল।
দুই প্রতিষ্ঠানের হিসাবেই ইরানকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে দেশটি বর্তমানে তেল রপ্তানি করছে না।
বিশ্লেষকদের জন্য এখন বড় প্রশ্ন হলো, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা পরিস্থিতি কত দ্রুত স্বাভাবিক হয় এবং উপসাগরীয় দেশগুলো যুদ্ধ-পূর্ব রপ্তানির মাত্রায় ফিরতে পারে কি না। কারণ, এই অঞ্চলের তেল সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন বিশ্ব জ্বালানি বাজারের ওপর চাপ বাড়াতে পারে।












