সন্ত্রাসী হামলার ঝুঁকি বাড়তে থাকায় চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের (সিপিইসি) নিরাপত্তা জোরদারে ইসলামাবাদের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বেইজিং। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও গভীর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চীনের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে পরিচিত এই করিডর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
সোমবার পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান আসিম মুনির এবং প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠকে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের প্রধান লিউ হাইসিং এ প্রতিশ্রুতি দেন। দায়িত্ব নেওয়ার এক বছরের বেশি সময় পর এটিই ছিল তাঁর প্রথম সরকারি পাকিস্তান সফর।
মুনিরের সঙ্গে বৈঠকে লিউ বলেন, চীন পাকিস্তানের সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনা ও নীতিনির্ধারণ বিষয়ে অভিজ্ঞতা বিনিময় বাড়াতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের উন্নত সংস্করণ ‘সিপিইসি ২.০’ বাস্তবায়নেও কাজ করতে চায় বেইজিং। কৌশলগত এই যোগাযোগপথের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন পরিচালনা নিশ্চিত করতে দুই দেশকে একসঙ্গে কাজ করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
গোয়াদর বন্দর ঘিরে বাড়ছে হামলার ঝুঁকি
চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ সিপিইসি। পাকিস্তানের গোয়াদর বন্দর এই করিডরের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। আরব সাগরের উপকূলে অবস্থিত বন্দরটি পরিচালনায় চীনের ভূমিকা রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্দর ও এর আশপাশের এলাকা বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলার অন্যতম লক্ষ্য হয়ে উঠেছে।
প্রায় দুই সপ্তাহ আগে বালুচ লিবারেশন ফ্রন্ট গোয়াদর এলাকায় হামলা চালায়। এর জবাবে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে এবং ১০ জন সশস্ত্র সদস্যকে হত্যার দাবি করে। এর আগে বালুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী বিভিন্ন সংগঠন ও ইসলামপন্থী জঙ্গিগোষ্ঠীর হামলায় পাকিস্তানে চীনা নাগরিকেরাও লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন।
সংঘাত ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা প্রকল্পের গবেষক জেইন শাহর মতে, গোয়াদর দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আদর্শিক লক্ষ্য। তাঁদের অভিযোগ, সিপিইসির আওতায় নেওয়া উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে স্থানীয় সম্পদ শোষণ করা হচ্ছে। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালে এ অঞ্চলে সশস্ত্র সহিংসতা আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে।
আঞ্চলিক উত্তেজনায় কৌশলগত গুরুত্ব বাড়ছে
শুধু পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতিই নয়, আফগানিস্তানের সঙ্গে গত দুই বছরে সীমান্ত উত্তেজনাও করিডরের উত্তরাঞ্চলের জন্য ঝুঁকি তৈরি করেছে।
বহু বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্প চীনের জন্য বিশেষ কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। কারণ, জ্বালানি আমদানির বড় অংশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালাক্কা প্রণালির ওপর নির্ভরশীল চীনের। এই নির্ভরতা কমানোর বিকল্প পথ তৈরিতে পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে যাওয়া করিডরটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। চীনের কাছে এই কৌশলগত দুর্বলতা ‘মালাক্কা সংকট’ নামে পরিচিত।
এ ছাড়া ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশের অপেক্ষায় থাকা জাহাজগুলোর জন্য গোয়াদর একটি সম্ভাব্য আশ্রয়স্থল বা অপেক্ষার কেন্দ্র হিসেবে কৌশলগত গুরুত্ব পেতে পারে।
সিপিইসি ২.০-তে নতুন খাত যুক্ত করার পরিকল্পনা
নতুন সংস্করণ সিপিইসি ২.০-এর আওতায় অবকাঠামো ও যোগাযোগের পাশাপাশি শিল্প, কৃষি, খনিজ সম্পদ এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে চীন ও পাকিস্তান।
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রাওয়ালপিন্ডিতে সেনা সদর দপ্তরে মুনির ও লিউয়ের বৈঠকে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়। দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সহযোগিতার সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেন তাঁরা।
পরে ইসলামাবাদে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠক করেন লিউ। এটিও ছিল তাঁদের প্রথম আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ। সেখানে তিনি বলেন, চীন পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ ও উদ্বেগের বিষয়ে সমর্থন অব্যাহত রাখবে এবং বিভিন্ন খাতে বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতার পাশাপাশি উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়াবে।
শাহবাজ শরিফও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, যোগাযোগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি এবং কৃষির আধুনিকায়নে দুই দেশের যৌথ উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
এদিকে চীনের তৈরি জেড-১০এমই যুদ্ধ হেলিকপ্টার কেনার বিষয়ে পাকিস্তানের সম্ভাব্য একটি সিদ্ধান্ত নিয়েও আলোচনা চলছে। চীনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ছবিতে দাবি করা হয়েছে, পাকিস্তান ৩০টি হেলিকপ্টার কেনার নির্দেশ দিয়েছে। তবে এ তথ্যের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
চীনের কাছে পাকিস্তান শুধু অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত অংশীদার নয়, বরং আঞ্চলিক যোগাযোগ ও নিরাপত্তা কৌশলেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে।












