ইউরোপের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এখন আর শুধু রাশিয়ার সম্ভাব্য সামরিক আগ্রাসনের আশঙ্কায় সীমাবদ্ধ নেই। মহাদেশটির সামনে রয়েছে সামরিক সক্ষমতার ঘাটতি, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা-প্রতিশ্রুতির অনিশ্চয়তা, চীনের সঙ্গে জটিল অর্থনৈতিক সম্পর্ক, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সাইবার হামলার মতো বহুমুখী ঝুঁকি। এসব চ্যালেঞ্জ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। ফলে ইউরোপের প্রধান কাজ শুধু প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানো নয়; রাজনৈতিক ঐক্য, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও গণতান্ত্রিক কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে একটি বিশ্বাসযোগ্য সামরিক ও ভূরাজনৈতিক শক্তি হয়ে ওঠা।
ইউরোপের নেতাদের পাশাপাশি নীতিনির্ধারক, বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ মানুষের মধ্যেও প্রশ্নটি গুরুত্ব পাচ্ছে: মহাদেশটি কি নিজের ভূখণ্ড, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান রক্ষার মতো সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে? বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা-ছাতার নিশ্চয়তা যখন আগের মতো নির্ভরযোগ্য বলে মনে হচ্ছে না, তখন এ প্রশ্নের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
সামরিক ব্যয় বাড়লেই সক্ষমতা বাড়ে না
ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়িয়েছে। কিন্তু অর্থ বরাদ্দ বাড়ালেই সামরিক শক্তি দ্রুত বৃদ্ধি পায় না। অস্ত্র ও গোলাবারুদের কৌশলগত মজুত, আকাশ প্রতিরক্ষা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ, ড্রোন, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং সামরিক সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণে ইউরোপের ঘাটতি রয়েছে। যুদ্ধের সময় দ্রুত সেনা ও সরঞ্জাম সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবহন ও রসদব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী করা দরকার।

প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সমন্বয়ও বড় সমস্যা। বিভিন্ন দেশের সামরিক প্রশিক্ষণ, সেনা মোতায়েনের পদ্ধতি এবং অস্ত্র উৎপাদনব্যবস্থায় পার্থক্য রয়েছে। ফলে যৌথ মহড়া কিংবা সংকটের মুহূর্তে সমন্বিত সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ইউরোপের প্রতিরক্ষা শিল্পে মানসম্মত উৎপাদন এবং বিভিন্ন দেশের ব্যবহৃত সরঞ্জামের মধ্যে সামঞ্জস্য বাড়ানো তাই জরুরি।
এর পাশাপাশি রাজনৈতিক বিভাজনও ইউরোপের সম্মিলিত উদ্যোগকে দুর্বল করে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা হুমকি সম্পর্কে ধারণা এক নয়। রাশিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে জাতীয় স্বার্থ ও রাজনৈতিক অবস্থানের পার্থক্য রয়েছে। সামরিক সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক সামর্থ্যেও দেশগুলোর মধ্যে ব্যবধান স্পষ্ট। অভিবাসন নিয়ে বিতর্ক ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। পররাষ্ট্রনীতিতে সর্বসম্মতির নিয়মও অনেক সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
ইউক্রেন যুদ্ধের পরও রাশিয়ার প্রশ্ন থাকবে
২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার ইউক্রেন আক্রমণ ইউরোপের নিরাপত্তা-পরিবেশ আমূল বদলে দিয়েছে। যুদ্ধ বন্ধ হলেও কিংবা যুদ্ধবিরতি হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কাটবে না। রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতা এবং ভবিষ্যতে ইউরোপের অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ বজায় থাকবে।
বিশেষ করে পোল্যান্ড, বাল্টিক অঞ্চলের দেশগুলো, ফিনল্যান্ড, মলদোভা এবং কৃষ্ণসাগর-সংলগ্ন রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা পরিস্থিতি ইউরোপের কৌশলগত হিসাবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। এসব দেশের মধ্যে কয়েকটি ন্যাটোর সদস্য; মলদোভা ন্যাটোর সদস্য নয়। ইউরোপীয়দের আশঙ্কা, রাশিয়া নতুন কোনো যুদ্ধ শুরু না করলেও দেশগুলোর মতপার্থক্য কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক ও কৌশলগত চাপ বজায় রাখতে পারে। এ পরিস্থিতিতে ইউরোপের পারমাণবিক প্রতিরোধব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতার সীমা
ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আটলান্টিকপারের সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। তবে ওয়াশিংটন সব পরিস্থিতিতে একই মাত্রায় সামরিক ও রাজনৈতিক সহায়তা দেবে—এ নিশ্চয়তা আর আগের মতো স্পষ্ট নয়। ইউক্রেন যুদ্ধ, বাণিজ্যনীতি, ইউরোপের প্রতিরক্ষা ব্যয় ভাগাভাগি এবং ন্যাটোর ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
প্রতিরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ক্ষেত্রে ইউরোপ এখনো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। উন্নত স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া সামরিক গোয়েন্দা তথ্য, কৌশলগত বিমান পরিবহন, উদ্ধার অভিযান, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ এবং দূরপাল্লার নিখুঁত অস্ত্রের সক্ষমতায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এর বাইরে রয়েছে মার্কিন পারমাণবিক প্রতিরোধের নিশ্চয়তা।

এই নির্ভরতা ইউরোপের কৌশলগত স্বাধীনতার পরিসর সীমিত করে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পরিবর্তে সহযোগিতা বজায় রেখেই নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো ইউরোপের জন্য বাস্তবসম্মত পথ।
চীনের সঙ্গে সম্পর্ক: সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতা
চীনের সঙ্গে ইউরোপের সম্পর্কও নিরাপত্তা পরিকল্পনাকে জটিল করে তুলেছে। চীন ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার, আবার প্রযুক্তিগত প্রতিযোগীও। রাশিয়ার সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এই সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
খনিজ সম্পদ, ব্যাটারি, সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তি এবং শিল্প উৎপাদনের বিভিন্ন উপকরণের জন্য ইউরোপের চীনা সরবরাহব্যবস্থার ওপর উল্লেখযোগ্য নির্ভরতা রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক বিরোধ দেখা দিলে ইউরোপের শিল্প উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এ কারণে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেও গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ও শিল্পের ক্ষেত্রে নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে ইউরোপ। তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক সংকট তৈরি হলে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কাও ইউরোপের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
দক্ষিণের প্রতিবেশী অঞ্চলও নিরাপত্তার অংশ
ইউরোপের দক্ষিণে মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা এবং সাহেল-সাহারা অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত, দুর্বল রাষ্ট্রব্যবস্থা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে। এসব পরিস্থিতি থেকে সন্ত্রাসবাদ, সংগঠিত অপরাধ, অস্ত্র ও মানব পাচার এবং অনিয়মিত অভিবাসনের মতো ঝুঁকি ইউরোপে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
মধ্যপ্রাচ্য ইউরোপের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অঞ্চলটি জ্বালানি সরবরাহের বড় উৎস এবং আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোর সঙ্গে যুক্ত। এ কারণে ইউরোপ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। সম্ভাব্য সংঘাত প্রতিরোধে কূটনৈতিক উদ্যোগও এ নীতির অংশ।
জ্বালানি ও শিল্পের দুর্বলতা
রাশিয়ার জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে ইউরোপ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার কারণে আন্তর্জাতিক সংকটের প্রভাব থেকে মহাদেশটি পুরোপুরি মুক্ত নয়। জ্বালানির দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পের ব্যয় বৃদ্ধি পায়, কমে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা।
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক সংঘাতের মতো দীর্ঘস্থায়ী সংকট জ্বালানির বাজার, সামুদ্রিক পরিবহন এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এতে ইউরোপীয় সরকারগুলোর ব্যয় বাড়বে এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় উৎপাদনভিত্তি দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় ঋণের চাপ এবং সীমিত বাজেটের মধ্যে বিভিন্ন খাতের প্রতিযোগিতা প্রতিরক্ষা শিল্পে বড় বিনিয়োগের সুযোগ সংকুচিত করে। ফলে নিরাপত্তা ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনাকে অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয় করা জরুরি।
প্রযুক্তি, জলবায়ু ও ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি
ইউক্রেন যুদ্ধ দেখিয়েছে, আধুনিক যুদ্ধে শুধু ব্যয়বহুল ও অত্যাধুনিক অস্ত্র নয়, তুলনামূলক কম খরচের কার্যকর প্রযুক্তিও গুরুত্বপূর্ণ। ড্রোনসহ নতুন সামরিক ব্যবস্থার দ্রুত উন্নয়ন যুদ্ধের ধরন বদলে দিচ্ছে। তাই বিদেশি প্রযুক্তি ও সরঞ্জামের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব গবেষণা, উৎপাদন ও উদ্ভাবনের সক্ষমতা বাড়ানো ইউরোপের জন্য জরুরি।
প্রচলিত যুদ্ধের বাইরেও সাইবার হামলা, গুপ্তচরবৃত্তি, সন্ত্রাসবাদ ও নাশকতার ঝুঁকি রয়েছে। জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা, সমুদ্রের তলদেশের যোগাযোগ কেবল, পাইপলাইন, বন্দর, রেলপথ, স্যাটেলাইট, সরকারি নেটওয়ার্ক ও তথ্যভান্ডার এসব হামলার লক্ষ্য হতে পারে। এসব গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষায় সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বেসামরিক প্রশাসন এবং বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।
জলবায়ু পরিবর্তনকেও নিরাপত্তার বাইরের বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। খাদ্যনিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং প্রতিবেশী অঞ্চলের স্থিতিশীলতার ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণে সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি খাদ্য ও জ্বালানির মজুত নিশ্চিত করা, জরুরি সেবা সচল রাখা এবং সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় বেসামরিক পরিকল্পনা শক্তিশালী করাও প্রয়োজন।
ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নটি তাই সামরিক ব্যয়ের সীমা ছাড়িয়ে রাজনৈতিক ঐক্য, প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা, শিল্প সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত। মহাদেশটির সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো, বহুমুখী হুমকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় শক্তি অর্জনের পাশাপাশি তার গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অক্ষুণ্ন রাখা।
ওয়ালিদ এম. আবদেলনাসেরের আরও লেখা
ইউরোপের রাজনৈতিক সংকট: জনরোষ, মেরুকরণ ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
ইরান যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র–ইউরোপ মতভেদের প্রভাব











