ইউক্রেনে রাশিয়ার বিমান হামলায় অন্তত ৩১ জন নিহত হয়েছেন। ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলের একটি গ্রামের স্কুলে এই হামলা হয়, যেখানে স্থানীয় বাসিন্দাদের আশ্রয় দেওয়ার পাশাপাশি প্রতি সপ্তাহে মানবিক সহায়তা বিতরণ করা হতো। এ ঘটনায় আরও পাঁচজন আহত হয়েছেন। নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ৫০ জন।
সোমবার (২ নভেম্বর) সম্মুখযুদ্ধের কাছাকাছি কোমিশুভাখা গ্রামে এ হামলা চালানো হয়। জাপোরিঝঝিয়া আঞ্চলিক সামরিক প্রশাসনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান মিখাইলো সেমিকিন জাতীয় টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারে হতাহতের তথ্য জানান। নিহতদের মধ্যে উদ্ধারকর্মী ও পুলিশ সদস্যরাও রয়েছেন। জরুরি সেবা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে উদ্ধারকারী দলের দুজন সদস্য এবং চারজন পুলিশ কর্মকর্তা রয়েছেন। আহত উদ্ধারকর্মীদের মধ্যে আরও দুজনকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, হামলার সময় স্কুলটিতে কোনো ক্লাস চলছিল না। যুদ্ধের সম্মুখসারির খুব কাছে হওয়ায় সেখানে নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ ছিল। তবে প্রতি সোমবার স্থানীয় বাসিন্দারা ওই স্কুলে এসে মানবিক সহায়তার প্যাকেট সংগ্রহ করতেন। ভবনটি আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছিল।
জেলেনস্কির ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে রাশিয়ার বিমান থেকে স্কুলটিতে কয়েকটি বোমা ফেলা হয়। ওই সময় সেখানে সহায়তা নিতে মানুষ জড়ো হচ্ছিলেন। এরপর দ্বিতীয় দফায় আবারও বোমা হামলা চালানো হয়, যার লক্ষ্য ছিল আশ্রয়কেন্দ্রটি। তিনি এ ঘটনাকে পরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর অভিযোগ, স্থানীয় বাসিন্দারা প্রতি সপ্তাহে সেখানে মানবিক সহায়তা নিতে আসেন, এ বিষয়টি রুশ বাহিনীর অজানা থাকার কথা নয়।
তবে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, কোমিশুভাখা ও আশপাশের দুটি এলাকায় ইউক্রেনীয় সামরিক ইউনিটকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। মঙ্গলবার দেওয়া এক বিবৃতিতে তারা জানায়, এতে ইউক্রেনের ২৫ জন সেনা নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি ১৫টি সামরিক যান ও একটি ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম ধ্বংস হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
যুদ্ধের শুরু থেকে রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষই বেসামরিক নাগরিকদের ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তবে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষকেরা গত আগস্টে জানিয়েছিলেন, ইউক্রেনে বেসামরিক মানুষের হতাহতের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে যুদ্ধ শুরুর পর ২০২২ সালের মার্চের পর যেকোনো মাসের তুলনায় বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত বা আহত হয়েছিলেন।
মানবিক সহায়তা ও যুদ্ধবিরতি নিয়ে প্রশ্ন
জেলেনস্কি অভিযোগ করেছেন, রাশিয়া উত্তেজনা কমানোর বদলে সাধারণ মানুষকে হত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। তাঁর মতে, দক্ষিণাঞ্চলীয় ওলেশকি শহরে সাম্প্রতিক মানবিক উদ্যোগের পর পরিস্থিতি শান্ত করার সুযোগ ছিল। কিন্তু রাশিয়া সেই সুযোগ কাজে লাগায়নি। ওলেশকিতে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া এবং সেখান থেকে চলে যেতে ইচ্ছুক বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় ছয় দিনের স্থানীয় যুদ্ধবিরতি হয়েছিল। হামলার আগের দিন সেই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হয়।
ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহাও হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁর মতে, রাশিয়ার এই পদক্ষেপ বর্বর ও নিষ্ঠুর। হামলার পর তিনি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় রাশিয়ার দলগুলোর অংশগ্রহণ বন্ধ রাখার আহ্বান জানান। এদিকে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া ব্যক্তিদের উদ্ধারে পুলিশ ও উদ্ধারকারী দল কাজ করছে। ঘটনাস্থলের প্রকাশিত ছবিতে স্কুল চত্বরজুড়ে ধ্বংসাবশেষ ও আগুনে পোড়া স্থাপনার চিহ্ন দেখা গেছে।
আবুধাবিতে রাশিয়া-ইউক্রেন বৈঠকের উদ্যোগ
এ হামলার মধ্যেই যুদ্ধ বন্ধের উপায় খুঁজতে নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগের খবর পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগামী ১০ ও ১১ নভেম্বর আবুধাবিতে রাশিয়া ও ইউক্রেনের প্রতিনিধিদের নিয়ে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের আয়োজন করবে ওয়াশিংটন। বৈঠকে যুদ্ধের অবসান, যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সংঘাত কমানোর সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
দীর্ঘদিনের এই যুদ্ধের অবসানে শীতকাল আসার আগেই অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে বেসামরিক মানুষের ওপর ধারাবাহিক হামলা এবং দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অবস্থানের মধ্যে নতুন আলোচনায় কতটা অগ্রগতি হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।












