মিয়ানমারের সামরিক জান্তা যখন একের পর এক ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে, তখন দেশটির রাজধানী নেপিডোতে জাপানের বিশেষ দূত ইয়োহেই সাসাকাওয়ার ২০২৬ সালের অক্টোবরে প্রত্যাবর্তন নতুন করে আলোচনায় এনেছে টোকিওর নীরব কূটনীতিকে। দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারের সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসা সাসাকাওয়ার এই উদ্যোগের পেছনে জাপানের একটি স্বতন্ত্র কূটনৈতিক অবস্থান রয়েছে। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে জটিল।
কারণ, মিয়ানমারের সংকট এখন আর কেবল সামরিক জান্তা ও বিরোধীদের মধ্যে আস্থার অভাব কিংবা আলোচনার টেবিলে বসার অনীহার বিষয় নয়। সংঘাতের দুই পক্ষ দেশটির ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে সামরিক বাহিনী চায় বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে। অন্যদিকে প্রতিরোধ আন্দোলন ও জাতিগত সংগঠনগুলোর লক্ষ্য সামরিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে একটি ফেডারেল গণতান্ত্রিক ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা।
এই দুই লক্ষ্যকে একই সমঝোতার কাঠামোয় আনা কতটা সম্ভব, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
শান্তির দুই পথ, গন্তব্য আলাদা
বার্মা নিউজ ইন্টারন্যাশনালের (বিএনআই) মূল্যায়নে মিয়ানমারের শান্তিপ্রক্রিয়া কার্যত দুটি পৃথক ধারায় বিভক্ত। একটি ধারার ভিত্তি ২০১৫ সালের জাতীয় যুদ্ধবিরতি চুক্তি (এনসিএ) এবং ২০০৮ সালের সংবিধান। অন্য ধারাটি গড়ে উঠেছে সামরিক অভ্যুত্থানবিরোধী প্রতিরোধ এবং নতুন ফেডারেল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিকে কেন্দ্র করে।
সামরিক জান্তা প্রথম কাঠামোর মধ্যেই রাজনৈতিক সংস্কারের কথা বলছে। তাদের কাছে ২০০৮ সালের সংবিধানই রাষ্ট্র পরিচালনার গ্রহণযোগ্য ভিত্তি। বিপরীতে প্রতিরোধশক্তিগুলো মনে করে, ওই সংবিধান বহাল রেখে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তাদের দাবি, রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করতে হবে।

বিএনআইয়ের স্টিয়ারিং কমিটির সম্পাদক মা তিন তিন নিয়ো এই দুই অবস্থানকে সমান্তরাল পথ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেগুলোর এক জায়গায় মিলিত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। মিয়ানমার পিস মনিটরের কো হ্নিন কো উর মূল্যায়নও একই রকম। তাঁর মতে, জান্তার কর্মকাণ্ডের প্রধান উদ্দেশ্য ক্ষমতায় টিকে থাকা। অন্যদিকে সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক ভূমিকা অবসান ঘটানো প্রতিরোধ আন্দোলনের ছয় দফা ঐকমত্যের অন্যতম ভিত্তি।
এখানে সংকটের গভীরতা বোঝা জরুরি। একটি পক্ষ বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামো সংস্কারের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে চায়। অন্য পক্ষ সেই কাঠামোরই অবসান ঘটাতে চায়। ফলে মধ্যস্থতা দিয়ে সাময়িক সমঝোতা সম্ভব হলেও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে মৌলিক বিরোধ অমীমাংসিত থেকে যাচ্ছে।
প্রতিরোধশক্তির ছয় দফা এবং জান্তার রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা
মিয়ানমারে ফেডারেল গণতান্ত্রিক ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতিগত ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর জোট এবং সংশ্লিষ্ট স্টিয়ারিং কাউন্সিল ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক লক্ষ্য সামনে এনেছে।
প্রথমত, সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের অবসান এবং রাজনীতিতে তাদের অংশগ্রহণ বন্ধ করা। দ্বিতীয়ত, সব সশস্ত্র বাহিনীকে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত বেসামরিক সরকারের অধীনে পরিচালিত করা। তৃতীয়ত, ২০০৮ সালের সংবিধান সম্পূর্ণ বাতিল করা এবং সেটি পুনর্বহালের সব প্রচেষ্টা ঠেকানো।
এর পাশাপাশি সব পক্ষের সম্মতিতে ফেডারেল ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধভিত্তিক নতুন সংবিধান প্রণয়ন, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সমতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিশ্চিত করা এবং সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ন্যায়বিচার ও অতীতের অপরাধের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার দাবি রয়েছে।
এই দাবিগুলো কেবল জান্তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিবাদ নয়; এগুলো মিয়ানমারের রাষ্ট্রব্যবস্থা পুনর্গঠনের একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক রূপরেখা।
এখানেই সাসাকাওয়ার নীরব কূটনীতি কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছে। তিনি যদি শুধু জান্তার সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখেন, তাহলে এমন একটি রাজনৈতিক কাঠামোকে পরোক্ষ বৈধতা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে, যার অবসানই প্রতিরোধশক্তির প্রধান দাবি। আবার জাতীয় ঐক্য সরকার (এনইউজি) এবং তাদের ফেডারেল ডেমোক্রেসি চার্টারকে আলোচনার কেন্দ্রে আনলে নেপিডোর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
২০২২ সালে রাখাইনে হওয়া যুদ্ধবিরতির অভিজ্ঞতাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ওই সমঝোতা শেষ পর্যন্ত টেকেনি। কারণ, মানবিক বিরতি সংঘাতের রাজনৈতিক কারণ দূর করতে পারেনি। নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া যুদ্ধবিরতি অনেক সময় কেবল সামরিক পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি করে।

কূটনীতির পাশাপাশি বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা
রাজনৈতিক সমাধানের পথ যখন অনিশ্চিত, তখন সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। জান্তার বিমান হামলা, ড্রোন আক্রমণ, গোলাবর্ষণ এবং গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় বেসামরিক জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকা বিপর্যস্ত হচ্ছে।
এ অবস্থায় কেবল রাজনৈতিক সংলাপের আহ্বান যথেষ্ট নয়। সাসাকাওয়ার নেতৃত্বাধীন নিপ্পন ফাউন্ডেশন মিয়ানমারের জাতিগত অঞ্চলগুলোতে স্কুল ও চিকিৎসাকেন্দ্র নির্মাণে সহায়তা দিয়েছে। এই মানবিক কার্যক্রমকে আরও কার্যকরভাবে সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে প্রতিরোধশক্তির নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলোতে বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা, চিকিৎসা ও জরুরি সহায়তার অবকাঠামো গড়ে তোলাকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
এ ধরনের উদ্যোগ রাজনৈতিক সমাধানের বিকল্প নয়। কিন্তু সমাধান না আসা পর্যন্ত মানুষের জীবন রক্ষার জন্য এগুলো অপরিহার্য।
নীরব কূটনীতি যদি শুধু বৈঠক আয়োজন এবং সাময়িক যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সংঘাতের মূল কারণ অক্ষত থাকবে। আর সেই ব্যর্থতার বোঝা বহন করতে হবে সাধারণ মানুষকে।
চীন-যুক্তরাষ্ট্রের সমীকরণে জাপানের অবস্থান
মিয়ানমারের সংকটে জাপানের ভূমিকার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বিপরীতে জাপান একটি ভারসাম্যপূর্ণ শক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সঙ্গে সেতুবন্ধ তৈরির সুযোগও টোকিওর রয়েছে।
তবে এই ভূরাজনৈতিক হিসাব যেন মিয়ানমারের মানুষের বাস্তব দুর্ভোগকে আড়াল না করে। কোনো আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হলেও যদি সামরিক আধিপত্যের প্রশ্ন অমীমাংসিত থাকে, তাহলে সংঘাত আবার ফিরে আসবে।

২০২২ সালের যুদ্ধবিরতি ব্যবহার করে আরাকান আর্মির পুনর্গঠনের বিষয়টিকেও এই বাস্তবতার মধ্যে দেখতে হবে। নিরাপত্তার নিশ্চয়তাহীন একটি সমঝোতা থেকে নিজেদের সামরিক অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা কোনো অস্বাভাবিক কৌশলগত আচরণ নয়। বরং রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া যুদ্ধবিরতির সীমাবদ্ধতাই এতে প্রকাশ পেয়েছে।
জাপান যদি আসিয়ানের ২০২৬ সালের জুলাইয়ে নির্ধারিত অগ্রগতি মূল্যায়নের মানদণ্ডকে সমর্থন করে, তাহলে সেখানে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তাকে প্রধান বিবেচনা করতে হবে। কতটি বৈঠক হয়েছে কিংবা যুদ্ধবিরতি কত দিন স্থায়ী হয়েছে, শুধু তা দিয়ে অগ্রগতি মাপা যাবে না। বিমান হামলার সংখ্যা, মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর সুযোগ এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের পরিস্থিতিও মূল্যায়নের অংশ হওয়া জরুরি।
সমাধানের আগে স্বীকার করতে হবে সংঘাতের মূল কারণ
সাসাকাওয়ার অক্টোবরের সফর থেকে কিছু এলাকায় মানবিক অগ্রগতি কিংবা সীমিত যুদ্ধবিরতির সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য মধ্যস্থতাকারীদের মিয়ানমারের মূল রাজনৈতিক বিরোধটি স্পষ্টভাবে স্বীকার করতে হবে। সেটি হলো সামরিক আধিপত্যের আকাঙ্ক্ষা বনাম ফেডারেল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবি।
এনইউজি এবং ফেডারেল ডেমোক্রেসি চার্টারকে কেবল যুদ্ধবিরতির আলোচনায় অংশ নেওয়া পক্ষ হিসেবে দেখলে চলবে না। নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা ও ক্ষমতা ভাগাভাগির কাঠামো তৈরিতে তাদের প্রকৃত রাজনৈতিক অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। একই সঙ্গে জাপানের উন্নয়ন সহায়তা ও অর্থনৈতিক উপস্থিতিকে এমনভাবে কাজে লাগানো প্রয়োজন, যাতে পুনর্গঠন কার্যক্রমের সঙ্গে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তার বাস্তব নিশ্চয়তা যুক্ত থাকে।
মিয়ানমারে নীরব কূটনীতি একসময় কার্যকর হতে পেরেছিল, যখন পক্ষগুলোর মধ্যে কোনো একটি অভিন্ন চুক্তি বাস্তবায়নের প্রশ্ন ছিল। কিন্তু এখন বিরোধটি আরও মৌলিক। এক পক্ষ সামরিক বাহিনীর আধিপত্য বজায় রাখতে চায়, অন্য পক্ষ সেই আধিপত্যের অবসান চায়।
এই প্রশ্নের সৎ ও স্পষ্ট সমাধান ছাড়া কোনো মধ্যস্থতাই স্থায়ী শান্তি আনতে পারবে না। সাসাকাওয়ার উদ্যোগে আরেকটি যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হলেও সেটি হবে বড়জোর সাময়িক স্বস্তি। রাজনৈতিক বিরোধের সমাধান না হলে সংঘাত আবার ফিরে আসবে। আর প্রতিবারই তার সবচেয়ে নির্মম মূল্য দিতে হবে মিয়ানমারের সাধারণ মানুষকে।












