বিশ্ব অর্থনীতির জ্বালানি ব্যবস্থার কাঠামো বদলে যাচ্ছে। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তি, বৈদ্যুতিক যানবাহন ও আধুনিক ব্যাটারির ব্যবহার বাড়ানোর যে বৈশ্বিক উদ্যোগ চলছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ খনিজ। লিথিয়াম, নিকেল, কোবাল্ট ও অন্যান্য খনিজ এখন শুধু শিল্পের কাঁচামাল নয়; এগুলো ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
এই পরিবর্তনের ফলে খনিজসমৃদ্ধ দেশগুলোর গুরুত্ব বেড়েছে। কিন্তু চাহিদা বাড়লেই উৎপাদনকারী দেশ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী সমানভাবে লাভবান হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং খনিজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাষ্ট্রগুলোর প্রতিযোগিতায় পরিবেশগত সুরক্ষা, শ্রমিকের অধিকার এবং ন্যায্য আয় বণ্টনের প্রশ্নগুলো পেছনে পড়ে গেলে জ্বালানি রূপান্তরের নামে নতুন ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি হতে পারে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার ২০২৬ সালের ‘গ্লোবাল ক্রিটিক্যাল মিনারেলস আউটলুক’ অনুযায়ী, ঘোষিত নীতিগুলো বাস্তবায়িত হলে ২০৪০ সাল নাগাদ গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সামগ্রিক চাহিদা প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে। এই পূর্বাভাসের পরিপ্রেক্ষিতে খনিজসমৃদ্ধ দেশগুলো নিজেদের সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে চাইছে। দীর্ঘদিন ধরে কাঁচামাল রপ্তানি করে অন্য দেশের শিল্পায়নে অবদান রাখলেও নিজেরা সীমিত অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে তারা এখন দেশীয় শিল্প ও মূল্য সংযোজনের ওপর জোর দিচ্ছে। কাঁচামাল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপও সেই কৌশলের একটি অংশ।
কিন্তু শুধু দেশে খনিজ উত্তোলন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও শিল্প স্থাপন করলেই উন্নয়নের সুফল নিশ্চিত হয় না—ইন্দোনেশিয়ার অভিজ্ঞতা সেই ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
শিল্পায়নই সব সমস্যার সমাধান নয়

নিকেলসমৃদ্ধ দেশ হিসেবে ইন্দোনেশিয়া কাঁচামাল রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে নিজস্ব প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। এতে খনন, গলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়েছে। বিশেষ করে দেশটির তিনটি নিকেলসমৃদ্ধ প্রদেশে এ শিল্পের উল্লেখযোগ্য বিস্তার ঘটেছে।
তবে এই প্রবৃদ্ধির সুফল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট শিল্পাঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়লেও সেই প্রবৃদ্ধি জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারেনি। একই সঙ্গে শিল্প সম্প্রসারণের পরিবেশগত ও সামাজিক ক্ষতির বোঝা বহন করতে হচ্ছে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে। খনিজ উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কারণে পরিবেশের ক্ষতি, সামাজিক চাপ এবং জীবিকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হলেও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষেরা শিল্পের সুফল সমানভাবে পাচ্ছেন না।
উন্নয়নের নামে প্রান্তিক অঞ্চলকে খনিজ উত্তোলনের কেন্দ্রে পরিণত করার এই প্রক্রিয়ায় নতুন সম্পদ আহরণের সীমান্ত তৈরি হচ্ছে। কিন্তু কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশগত সুরক্ষা এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহি না থাকলে এসব অঞ্চল শেষ পর্যন্ত ‘ত্যাগের ভূখণ্ডে’ পরিণত হয়। জাতীয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির জন্য স্থানীয় মানুষ তখন নিজেদের পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও জীবিকার ক্ষতি মেনে নিতে বাধ্য হন।
এখানেই খনিজসম্পদভিত্তিক শিল্পায়নের মৌলিক সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়। রাষ্ট্রের হাতে সম্পদের নিয়ন্ত্রণ থাকা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই নিয়ন্ত্রণের অর্থ যদি কেবল দেশীয় কোম্পানি ও শিল্পের মুনাফা বাড়ানো হয়, তাহলে সম্পদসমৃদ্ধ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায় মৌলিক পরিবর্তন আসে না।
আন্তর্জাতিক নীতির সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান
খনিজ উত্তোলনকে আরও টেকসই ও ন্যায়সংগত করার বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নীতিগত অঙ্গীকারের ঘাটতি নেই। ২০২৪ সালে জাতিসংঘ মহাসচিবের জ্বালানি রূপান্তরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজবিষয়ক প্যানেল ন্যায়বিচার ও সমতার ভিত্তিতে নতুন কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানায়। প্যানেলের নীতিতে বলা হয়েছে, খনিজসম্পদের উন্নয়ন থেকে উৎপাদনকারী দেশ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে বাস্তব সুফল পেতে হবে।

আফ্রিকান ইউনিয়নের ‘আফ্রিকা মাইনিং ভিশন’ এবং আসিয়ানের টেকসই খনিজ উন্নয়নবিষয়ক নীতিতেও একই ধরনের অঙ্গীকার রয়েছে। কিন্তু এসব নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে অগ্রাধিকারের বৈষম্য।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইন্দোনেশিয়ার সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির ক্ষেত্রে পাম তেল ও নিকেলের বিষয়ে এই বৈষম্য স্পষ্ট। পাম তেলের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের কঠোর টেকসই মানদণ্ড রয়েছে, অথচ নিকেলের ক্ষেত্রে একই ধরনের শর্ত নেই। অথচ উভয় শিল্পেরই পরিবেশ ও সমাজের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এই বৈপরীত্য থেকে বোঝা যায়, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় টেকসই উন্নয়নের কথা বলা হলেও বাজারে প্রবেশাধিকার ও বাণিজ্যিক স্বার্থ অনেক সময় পরিবেশগত ও সামাজিক দায়বদ্ধতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়।
বৈশ্বিক দক্ষিণের সম্মিলিত শক্তি
এই পরিস্থিতি বদলাতে খনিজ উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে নীতিগত সহযোগিতা আরও জোরদার করা জরুরি। বিশেষ করে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর অভিজ্ঞতা, ব্যর্থতা ও সাফল্য বিনিময়ের জন্য কার্যকর নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে। কারণ ইন্দোনেশিয়া, চিলি, জাম্বিয়া ও কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের খনিজসম্পদ এবং রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা এক নয়। ফলে সব দেশে একই উন্নয়ন কৌশল কার্যকর হবে, এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
ন্যাচারাল রিসোর্স গভর্ন্যান্স ইনস্টিটিউটের ‘সাউথ-সাউথ ট্রানজিশন মিনারেলস লার্নিং প্ল্যাটফর্ম’ এ ধরনের সহযোগিতার একটি উদাহরণ। এর মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সরকারি কর্মকর্তারা খনিজ উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ নিয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও নীতিগত শিক্ষা বিনিময় করছেন। এ ধরনের উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন, যাতে দেশগুলো নিজ নিজ বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি তৈরি করতে পারে।
তবে শুধু সরকারের মধ্যে সহযোগিতা যথেষ্ট নয়। নাগরিক সমাজ, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর মধ্যে আন্তদেশীয় যোগাযোগও জরুরি। কোনো দেশের সরকার বা কোম্পানি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভিযোগ উপেক্ষা করলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে সেই অভিযোগ বৈশ্বিক পর্যায়ে তুলে ধরা সম্ভব। এতে কোম্পানি, বিনিয়োগকারী ও ক্রেতাদের ওপর জবাবদিহির চাপ বাড়ে।
ইন্দোনেশিয়ায় এ ধরনের উদ্যোগের একটি বাস্তব উদাহরণ রয়েছে। দেশটির পরিবেশবাদী সংগঠন ওয়ালহি এবং ফ্রেন্ডস অব দ্য আর্থ জাপান শতাধিক সংগঠনকে সঙ্গে নিয়ে সোরোওয়াকো নিকেল প্রকল্পে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের বিষয়ে ভালে ইন্দোনেশিয়ার শেয়ারহোল্ডারদের পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানায়। সরকারের কার্যকর উদ্যোগের অভাবে ভালে, সুমিতোমো মেটাল মাইনিং ও মিতসুইসহ কয়েকটি শেয়ারহোল্ডার প্রতিষ্ঠান কোম্পানিটির ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

একইভাবে মাইটি আর্থ, ক্লাইমেট রাইটস ইন্টারন্যাশনাল এবং গ্লোবাল উইটনেস ইন্দোনেশিয়ার নিকেল উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে বিনিয়োগকারী ও বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তারা গাড়ি ও ব্যাটারি উৎপাদকদের সরবরাহব্যবস্থায় সামাজিক ও পরিবেশগত মানদণ্ড অনুসরণ এবং যথাযথ যাচাইয়ের আহ্বান জানায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ওয়েদা বে নিকেল দায়িত্বশীল খনন নিশ্চয়তা উদ্যোগের মানদণ্ড অনুসরণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং কয়েকটি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নিকেল সরবরাহকারীদের জন্য কঠোর শর্ত আরোপ করেছে।
ঘোষণার বাইরে বাস্তব জবাবদিহি
আন্তর্জাতিক চাপ ইন্দোনেশিয়া সরকারের নীতিগত অবস্থানেও প্রভাব ফেলেছে। ২০২৫ সালে ওইসিডির দায়িত্বশীল খনিজ সরবরাহব্যবস্থাবিষয়ক ফোরামে পাবলিশ হোয়াট ইউ পে ইন্দোনেশিয়া দেশটির নিকেল খাতের সুশাসন নিয়ে উদ্বেগ তুলে ধরে। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ সরকার নিকেল সরবরাহব্যবস্থায় পরিবেশগত, সামাজিক ও সুশাসনসংক্রান্ত নির্দেশিকা তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ইন্দোনেশিয়ার বিদ্যমান আইন ও বিধিবিধানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সামঞ্জস্য নির্ধারণে এসব নির্দেশিকা সহায়ক হওয়ার কথা। ২০২৭ সালজুড়ে এ বিষয়ে পরামর্শ, যাচাই ও প্রচারের কাজ চলার কথা রয়েছে।
জ্বালানি রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় খনিজের সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু সেই সরবরাহব্যবস্থা যদি স্থানীয় মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন করে, পরিবেশ ধ্বংস করে এবং সম্পদের সুফল অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ করে, তাহলে সেই ব্যবস্থাকে টেকসই উন্নয়ন বলা যায় না।
বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর সামনে এখন দুটি প্রধান কাজ। একদিকে নিজেদের মধ্যে নীতিগত সহযোগিতা ও অভিজ্ঞতা বিনিময় বাড়ানো, অন্যদিকে নাগরিক সমাজের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করে কোম্পানি ও রাষ্ট্রের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। আন্তর্জাতিক ঘোষণাগুলোতে ন্যায়বিচার ও সমতার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এখন প্রয়োজন সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তব নীতি, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও স্থানীয় মানুষের অধিকার সুরক্ষার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা।












