২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে পূরণের লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু বর্তমান সক্ষমতা, বিনিয়োগের সংকট, ব্যাংকঋণের জটিলতা, ব্যাটারি সংরক্ষণের ঘাটতি এবং দুর্বল বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনাকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলছে।
সোলার এক্সপো ২০২৬-এ আলোচনায় উঠে এসেছে, নীতিগত সহায়তা ও সরকারি অর্থায়নের উদ্যোগ থাকলেও সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের পথে বাস্তব বাধা অনেক। বিশেষ করে বেসরকারি বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা, জমির অভাব, বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ এবং গ্রিডের সীমিত সক্ষমতা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লক্ষ্যের তুলনায় উৎপাদন খুবই কম
আলোচনায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৮৪০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে কার্যকর উৎপাদন হচ্ছে ৭০০ থেকে ৭৫০ মেগাওয়াট। অথচ ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা অর্জনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এই ব্যবধান পূরণে আগামী কয়েক বছরে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বহুগুণ বাড়াতে হবে। কিন্তু বিনিয়োগের বিদ্যমান বাধাগুলো দূর না হলে সেই গতি অর্জন কঠিন হবে।

সরকার সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক কমিয়ে ১ শতাংশ করেছে। বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বরে নতুন সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা যুক্ত হয়েছিল ৮৮ মেগাওয়াট, অক্টোবরে তা বেড়ে ১২২ মেগাওয়াট হয়েছে। তবে এই অগ্রগতি ২০৩০ সালের লক্ষ্যের তুলনায় কতটা যথেষ্ট, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
অর্থায়নেও অনিশ্চয়তা
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প সম্প্রসারণে বিদ্যমান সবুজ অর্থায়ন তহবিল থেকে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। আগামী গ্রীষ্মের আগে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট নতুন সক্ষমতা যুক্ত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি প্রকল্পের মোট বিনিয়োগের ২০ শতাংশ দেবেন বেসরকারি বিনিয়োগকারী, ২০ শতাংশ ছাদের মালিক এবং বাকি ৬০ শতাংশ ঋণ হিসেবে দেবে নির্ধারিত অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান। প্রাথমিক বরাদ্দ শেষ হলে আরও ৫০০ কোটি টাকা দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
তবে এই অর্থায়ন কাঠামো বাস্তবায়ন কতটা সহজ হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, নির্ধারিত তিনটি প্রতিষ্ঠানের ঋণের সুদ তুলনামূলক বেশি হতে পারে। ঋণের ব্যয় কমাতে এইচএসবিসি, সিটি ব্যাংক ও ব্র্যাক ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা চলছে। বেসরকারি ব্যাংকগুলো প্রায় ৫ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক ৫০ কোটি ডলার এবং এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক প্রাথমিকভাবে আরও ৫০ কোটি ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকও ২৫ কোটি ডলারের প্রাথমিক অর্থায়ন বিবেচনা করছে। তবে এসব অর্থায়ন কার্যকরভাবে প্রকল্পে যুক্ত না হওয়া পর্যন্ত বিনিয়োগের ঘাটতি কাটবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।

ব্যাটারি ছাড়া সৌরবিদ্যুৎ কতটা কার্যকর?
সৌরবিদ্যুতের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো, সূর্যের আলো ও আবহাওয়ার ওপর এর উৎপাদন নির্ভর করে। ফলে চাহিদার সময় অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে ব্যাটারি সঞ্চয়ব্যবস্থা অপরিহার্য।
আলোচনায় বলা হয়েছে, পরিকল্পিত সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ সামাল দিতে প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট ব্যাটারি সঞ্চয় সক্ষমতা প্রয়োজন হতে পারে। ২৫ থেকে ৩০ কিলোওয়াটের বেশি সক্ষমতার নির্দিষ্ট নতুন সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে ১০ শতাংশ ব্যাটারি সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রয়েছে। মোট সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়ালে তা ২০ শতাংশ করার প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে।
কিন্তু ব্যাটারি সংরক্ষণ ও আধুনিক সঞ্চালন অবকাঠামোয় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ছাড়া নতুন সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুতের পুরোটা গ্রিডে যুক্ত করা কঠিন হবে। শীতকালে বিদ্যুতের চাহিদা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন যুক্ত হলে গ্রিড পরিচালনায় বাড়তি সমন্বয়ের প্রয়োজন হবে।
সৌরবিদ্যুতের দাম নিয়েও প্রশ্ন
সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের পাশাপাশি এর উৎপাদন ব্যয় ও ভোক্তার ওপর সম্ভাব্য আর্থিক চাপ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। আলোচনায় প্রতি ইউনিট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের তুলনামূলক ব্যয় ৩ টাকা ৪৪ পয়সা থেকে ৩ টাকা ৯৪ পয়সা উল্লেখ করা হলেও কোনো কোনো বেসরকারি উদ্যোক্তা সর্বোচ্চ ১০ টাকা ৮৫ পয়সা পর্যন্ত বিদ্যুৎ কেনার দাম প্রস্তাব করেছেন বলে প্রশ্ন তোলা হয়।

এ অবস্থায় প্রতিযোগিতামূলক দর নির্ধারণ ও কঠোর নিয়ন্ত্রক তদারকির দাবি উঠেছে। আলোচনায় বলা হয়েছে, প্রতি ইউনিটে ২৬ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হওয়া ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারলে সাশ্রয় হওয়া অর্থ ব্যাটারি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করা সম্ভব।
নীতির স্থিতিশীলতা চান উদ্যোক্তারা
বেসরকারি উদ্যোক্তারা ঋণপত্র খোলার জটিলতা, বাণিজ্যিক ব্যাংকের তারল্যসংকট, জমির স্বল্পতা এবং কর-সুবিধা অব্যাহত থাকবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, শুধু শুল্ক কমানো বা অর্থায়নের ঘোষণা দিয়ে বড় বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত নিশ্চয়তা এবং একটি পূর্ণাঙ্গ নবায়নযোগ্য জ্বালানি আইন।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের সৌরবিদ্যুৎ পরিকল্পনায় লক্ষ্য বড় হলেও বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নিয়ে একাধিক প্রশ্ন রয়েছে। অর্থায়ন, ব্যাটারি সংরক্ষণ, গ্রিডের সক্ষমতা এবং বিদ্যুতের দাম—এই সমস্যাগুলোর সমাধান না হলে ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়তে পারে।











