যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে (মিডটার্ম) নজিরবিহীন জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার মধ্য দিয়ে দলটি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থানের বিরুদ্ধে জনগণের শক্তিশালী প্রতিবাদের প্রতিফলন ঘটাতে পেরেছে। কিন্তু এই বিজয়ের পরই দলটির সামনে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—ভোটাররা আসলে কী পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছেন? ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, অভিশংসনের উদ্যোগ, নাকি জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক সমস্যার সমাধান?
নির্বাচনে বড় জয় পেলেও এসব প্রশ্নে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে এখনো মতপার্থক্য রয়েছে। দলের নেতারা একমত যে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোই হবে নতুন কংগ্রেসের প্রধান অগ্রাধিকার। তবে ট্রাম্প ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে তদন্ত কতটা জোরালো হবে, অভিশংসনের পথে এগোনো উচিত কি না এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার মতো প্রগতিশীল কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে কি না, তা নিয়ে দলটির ভেতরে বিভক্তি স্পষ্ট।
নতুন কংগ্রেস আগামী জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়ার ব্যাপারে প্রাথমিক ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ওবামাকেয়ার স্বাস্থ্যবিমা আরও সাশ্রয়ী করা, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারি স্বাস্থ্যবিমা কর্মসূচি মেডিকেইডে ট্রাম্প প্রশাসনের কাটছাঁটের কিছু সিদ্ধান্ত ফিরিয়ে নেওয়া, তাঁর আরোপিত অজনপ্রিয় শুল্ক প্রত্যাহার এবং ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটানো।
তবে এসব অভিন্ন লক্ষ্য থাকা সত্ত্বেও ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভেতরে রাজনৈতিক কৌশল ও নীতিগত অবস্থান নিয়ে গভীর মতপার্থক্য রয়েছে। এবারের নির্বাচনে একদিকে মধ্যপন্থী ও প্রচলিত ধারার প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন, অন্যদিকে দলীয় নেতৃত্বের সমালোচক নতুন প্রগতিশীল রাজনীতিকদেরও উত্থান ঘটেছে।
সিনেটে ডেমোক্র্যাটিক নেতা চাক শুমার এই বিজয়কে প্রজন্মগত রাজনৈতিক পরিবর্তন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেছেন, নির্বাচনে জয় মানেই দলটি যা খুশি করার অনুমতি পেয়ে গেছে—এমন নয়।
বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে শুমার বলেন, ভোটাররা তাঁদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়েছেন, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে তাঁরা যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য অবাধ অনুমোদন দিয়েছেন।
প্রতিনিধি পরিষদের সম্ভাব্য পরবর্তী স্পিকার হাকিম জেফরিসও একই অবস্থান তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের জীবনযাত্রার ব্যয়সংকট মোকাবিলাই হবে ডেমোক্র্যাটদের প্রধান দায়িত্ব। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অভিশংসনের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাটিক ককাসের কোনো সদস্য এখন পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেননি।
সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে বিভক্তি
নির্বাচনের ফলকে অনেক ডেমোক্র্যাট ট্রাম্পের নীতির বিরুদ্ধে জনগণের স্পষ্ট প্রত্যাখ্যান হিসেবে দেখছেন। তাঁদের ধারণা, জীবনযাত্রার ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবা এবং সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক দুরবস্থাকে সামনে রেখে প্রচার চালানোর কারণেই দলটি এত বড় জয় পেয়েছে।
তবে নির্বাচনী প্রচারের সময় ডেমোক্র্যাট কৌশলবিদদের একটি অংশ সতর্ক করেছিলেন, শুধু ট্রাম্পের বিরোধিতা করে ভোট পাওয়া সম্ভব হলেও ক্ষমতায় গেলে নিজেদের বিকল্প নীতিগত কর্মসূচি উপস্থাপন করতে হবে।
স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় এবার নির্বাচনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছিল। গত বছর রিপাবলিকানদের কারণে মহামারির সময় চালু হওয়া ওবামাকেয়ারের বর্ধিত ভর্তুকির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। এর ফলে স্বাস্থ্যবিমার প্রিমিয়াম ৫০ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়। নির্বাচনের কয়েক মাস আগে লাখ লাখ মানুষ তাঁদের স্বাস্থ্যবিমা পরিকল্পনা থেকে সরে যেতে বাধ্য হন।
ডেমোক্র্যাট নেতারা মনে করছেন, ওবামাকেয়ারের ভর্তুকি পুনর্বহাল এবং মেডিকেইডে কাটছাঁটের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের উদ্যোগে কিছু রিপাবলিকানের সমর্থন পাওয়া সম্ভব। একই সঙ্গে এসব উদ্যোগে ট্রাম্পের ভেটো দেওয়াও রাজনৈতিকভাবে কঠিন হতে পারে।
কিন্তু দলের প্রগতিশীল অংশ মনে করে, শুধু বিদ্যমান কর্মসূচি পুনর্বহাল করলেই চলবে না। স্বাস্থ্যসেবাকে সর্বজনীন করার লক্ষ্যে আরও বড় উদ্যোগ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে তাদের অন্যতম দাবি ‘মেডিকেয়ার ফর অল’—যে ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ বা সব নাগরিকের স্বাস্থ্যবিমার দায়িত্ব সরকারি ব্যবস্থার অধীনে আনার কথা বলা হয়। তবে বেসরকারি স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে এই প্রস্তাব দীর্ঘদিন ধরেই ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়া থেকে রিপাবলিকানদের একটি আসন ছিনিয়ে নেওয়া ডেমোক্র্যাটিক প্রগতিশীল নেতা র্যান্ডি ভিলেগাস মনে করেন, স্বাস্থ্যসেবার মতো বড় ইস্যুতে খুব সীমিত পদক্ষেপ নিলে দলটি জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হবে।
নতুন নির্বাচিত সদস্যদের এক ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, মানুষকে আরও বড় পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখানোর সাহস থাকতে হবে। তাঁর কাছে সেই পরিবর্তনের অর্থ সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার জন্য লড়াই করা।
ট্রাম্প প্রশাসনের জবাবদিহি কতটা নিশ্চিত হবে?
নতুন কংগ্রেসের জন্য ডেমোক্র্যাট নেতারা এখনো পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করেননি। তবে নতুন ও পুনর্নির্বাচিত সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে দুটি বিষয়ে মোটামুটি ঐকমত্যের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। একটি হলো ট্রাম্প প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, অন্যটি রাজনীতিতে করপোরেট অর্থের প্রভাব কমানো।
মেরিল্যান্ডের ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেন মনে করেন, দলটিকে একই সঙ্গে কয়েকটি লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, ইরান যুদ্ধ বন্ধের চেষ্টা এবং শ্রমজীবী মানুষের জন্য কার্যকর অর্থনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ।
রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, করপোরেশন, ধনকুবের এবং বিশেষ স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের অতিরিক্ত সতর্ক হওয়া উচিত নয়। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে ওঠার পেছনে এসব গোষ্ঠীর ভূমিকা রয়েছে বলে ভোটারদের একটি অংশ মনে করে।
তবে অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির জন্য দায়ী করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা নিয়ে দলটির ভেতরে মতবিরোধ তৈরি হতে পারে।
ভ্যান হোলেনসহ অনেক ডেমোক্র্যাট ধনকুবেরদের সম্পদের ওপর কর আরোপের পক্ষে। কিন্তু ক্যালিফোর্নিয়ায় ধনকুবেরদের মোট সম্পদের ওপর এককালীন ৫ শতাংশ কর বসানোর একটি প্রস্তাব মঙ্গলবারের নির্বাচনে ব্যর্থ হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে ডেমোক্র্যাটদের শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই অঙ্গরাজ্যেই প্রস্তাবটি সমর্থন পায়নি। ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট গভর্নর গ্যাভিন নিউজমও এর বিরোধিতা করেছিলেন। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে তাঁর নাম আলোচনায় রয়েছে।
টেক্সাস থেকে নির্বাচিত ডেমোক্র্যাট সিনেটর জেমস টালারিকো মনে করেন, রাজনীতিতে বড় অর্থের প্রভাব কমানোও নির্বাচনী ম্যান্ডেটের অংশ হওয়া উচিত। নির্বাচনী প্রচারে বিশ্বের শীর্ষ ধনকুবের ইলন মাস্ক তাঁর বিরুদ্ধে ২৩ কোটি ডলারের প্রচার ব্যয় করেছিলেন। বিজয়ী ভাষণে টালারিকো বলেন, রাজনীতি থেকে বড় অর্থের প্রভাব দূর করতে নির্বাচনী অর্থায়ন ব্যবস্থায় সংস্কার প্রয়োজন।
অভিবাসন, ন্যূনতম মজুরি ও শিশুযত্নেও চাপ
নির্বাচনের পরদিন থেকেই বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট সংগঠন নতুন কংগ্রেসের জন্য নিজেদের দাবিদাওয়া তুলে ধরতে শুরু করেছে।
শ্রমিক সংগঠন, অভিবাসন অধিকারকর্মী, আমেরিকাস ভয়েস, লাতিনো কমিউনিটি ফাউন্ডেশন এবং আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়নসহ কয়েকটি সংগঠন নির্বাচনের ফল নিয়ে তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ করেছে। তাদের দাবি, ২০২৪ সালের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের দিকে ঝুঁকে পড়া সংখ্যালঘু ভোটারদের একটি বড় অংশ এবার আবার ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন দিয়েছে।
সংখ্যালঘু ভোটারদের গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে অভিবাসন কর্মকর্তাদের বলপ্রয়োগের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ, ফেডারেল পর্যায়ে ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ৭ ডলার ২৫ সেন্ট থেকে বাড়িয়ে ১৭ ডলারে উন্নীত করা এবং সবার জন্য শিশুযত্নের সুযোগ নিশ্চিত করা।
যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল ন্যূনতম মজুরি ২০০৯ সাল থেকে ঘণ্টায় ৭ ডলার ২৫ সেন্টে অপরিবর্তিত রয়েছে। ফলে মজুরি বৃদ্ধির দাবি শ্রমজীবী মানুষের অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
ভ্যান হোলেন নির্বাচনের ফলাফলকে ব্যাপকতা ও রাজনৈতিক তাৎপর্যের দিক থেকে অসাধারণ বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, মধ্যবর্তী নির্বাচন সাধারণত ক্ষমতাসীন দলের প্রতি জনগণের সমর্থন বা অসন্তোষের প্রতিফলন ঘটায়। কিন্তু এবারের ফলাফলে রাজনীতির নতুন ধারার জন্যও জনগণের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে।
বিজয়ের চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ঐক্য ধরে রাখা
ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী সাফল্য দলটির সামনে বড় রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু এই সুযোগ কতটা কাজে লাগানো যাবে, তা নির্ভর করবে দলটি নিজেদের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য কতটা সামাল দিতে পারে তার ওপর।
মধ্যপন্থীরা যেখানে স্বাস্থ্যসেবার বিদ্যমান কর্মসূচি পুনর্বহাল, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিকে অগ্রাধিকার দিতে চান, সেখানে প্রগতিশীলরা আরও বড় কাঠামোগত পরিবর্তনের দাবি তুলছেন। তাঁদের লক্ষ্য সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, ধনকুবেরদের ওপর কর, শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি এবং রাজনীতিতে করপোরেট অর্থের প্রভাব কমানো।
অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত ও সম্ভাব্য অভিশংসনের প্রশ্নটিও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে ডেমোক্র্যাট নেতৃত্ব বুঝতে পারছে, নির্বাচনী বিজয়ের পর তাদের প্রতিটি পদক্ষেপের মূল্যায়ন হবে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার ভিত্তিতে।
শুমারের সতর্কবার্তার রাজনৈতিক তাৎপর্য এখানেই। ট্রাম্পবিরোধী ভোট পেলেও ডেমোক্র্যাটরা ধরে নিতে পারবে না যে ভোটাররা তাদের সব নীতির পক্ষে সমর্থন দিয়েছেন। বরং স্বাস্থ্যসেবা, দ্রব্যমূল্য, মজুরি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার মতো সরাসরি জনজীবনের বিষয়গুলোতে বাস্তব অগ্রগতি দেখাতে হবে।
সুতরাং এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয় যতটা ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে অসন্তোষের প্রকাশ, ততটাই দলটির জন্য নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান নতুন করে নির্ধারণের পরীক্ষা। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পাওয়া তাদের সাফল্য; কিন্তু সেই নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করে জনগণের আস্থা ধরে রাখাই হবে আরও কঠিন চ্যালেঞ্জ।












