রাতের অন্ধকার দূর করে কৃত্রিমভাবে সূর্যের আলো ছড়িয়ে দিতে মহাকাশে ৫০ হাজার আয়নাযুক্ত উপগ্রহ স্থাপনের পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। তবে এই উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। তাঁদের আশঙ্কা, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রাতের আকাশের স্বাভাবিক রূপ বদলে যাবে। ব্যাহত হতে পারে মহাকাশ পর্যবেক্ষণ এবং পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য।
যুক্তরাষ্ট্রের স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান রিফ্লেক্ট অরবিটাল নিজেদের ‘সানলাইট অ্যাজ আ সার্ভিস’ বা সেবা হিসেবে সূর্যের আলো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে। তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, মহাকাশে আয়নাযুক্ত উপগ্রহ স্থাপন করে সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে পৃথিবীর নির্দিষ্ট এলাকায় পাঠানো হবে। ফলে রাতের বেলাতেও প্রয়োজন অনুযায়ী সূর্যের আলো পাওয়া সম্ভব হবে।
প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, গ্রাহকেরা ঘণ্টাপ্রতি পাঁচ হাজার ডলার খরচ করে এই আলো ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। সৌর প্যানেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং রাতের বেলায় অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে এই প্রযুক্তি কাজে লাগতে পারে বলে দাবি করছে প্রতিষ্ঠানটি।
রাতের আকাশের উজ্জ্বলতা বাড়ার আশঙ্কা
প্রকল্পটি নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ পরিবেশ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব। ইউরোপীয় দক্ষিণাঞ্চলীয় মানমন্দিরের (ইএসও) তথ্য অনুযায়ী, পরিকল্পনা অনুযায়ী ৫০ হাজার উপগ্রহ মহাকাশে স্থাপন করা হলে রাতের আকাশের সামগ্রিক উজ্জ্বলতা বর্তমানের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ বেড়ে যেতে পারে।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ৫৪ মিটার আয়তনের প্রতিফলকযুক্ত একটি উপগ্রহ থেকে ফিরে আসা আলো চাঁদের আলোর তুলনায় ৪০ গুণ বেশি উজ্জ্বল হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে পৃথিবী থেকে দূরবর্তী নক্ষত্র, গ্রহ ও অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তু পর্যবেক্ষণ কঠিন হয়ে পড়বে।
বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, কৃত্রিম আলোর এমন বিস্তার শুধু জ্যোতির্বিজ্ঞানের গবেষণাকেই বাধাগ্রস্ত করবে না, বরং প্রাণিজগতের স্বাভাবিক দিন-রাতের ছন্দেও প্রভাব ফেলতে পারে।
পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী বেন নওয়াক অবশ্য এসব উদ্বেগকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে নারাজ। তাঁর মতে, নতুন প্রযুক্তি নিয়ে মানুষের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
গত ১০ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় বিশাল ফ্লাডলাইট ব্যবহার করে প্রযুক্তিটির পরীক্ষা চালিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে এখনো তাদের কোনো উপগ্রহ মহাকাশে পাঠানো হয়নি। ভারতের মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্কাইরুট অ্যারোস্পেসের সঙ্গে যৌথভাবে প্রথম উপগ্রহ উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
বিজ্ঞানীদের প্রশ্ন, রাতের আকাশের মালিক কে?
প্রকল্পটির সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্পদার্থবিদ গাসপার বাকোস। তাঁর আশঙ্কা, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পৃথিবী থেকে মহাকাশ পর্যবেক্ষণের প্রচলিত সুযোগ মারাত্মকভাবে সংকুচিত হতে পারে।
আলাবামা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানী মিশেল উটেনও প্রকল্পটির নৈতিক ও সামাজিক দিক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর প্রশ্ন, রাতের আকাশের মালিক কে? রাতের আকাশের স্বাভাবিক রূপ কেমন থাকবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষেরও মতামত দেওয়ার অধিকার থাকা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
প্রযুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে রাতের অন্ধকারকে কৃত্রিম আলোয় বদলে দেওয়ার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। তবে সেই সম্ভাবনার বিপরীতে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং মহাকাশ গবেষণার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির প্রশ্নও সামনে আসছে।












