ক্যানসার ও বার্ধক্য নিয়ে গবেষণার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাঙের ভ্রূণ নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় পাচারসহ একাধিক ফৌজদারি অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন রুশ বিজ্ঞানী কসেনিয়া পেত্রোভা। প্রায় চার মাস অভিবাসন হেফাজতে থাকার পর তাঁর বিরুদ্ধে করা সব অভিযোগ প্রত্যাহার করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল প্রসিকিউশন। বুধবার এক ফেডারেল বিচারক অভিযোগগুলো খারিজের আবেদন অনুমোদন করেন।
৩১ বছর বয়সী পেত্রোভা হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলে গবেষণার কাজে ব্যাঙের ভ্রূণের নমুনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরছিলেন। ২০২৫ সালের শুরুর দিকে ফ্রান্সে ছুটি কাটিয়ে বোস্টনের লোগান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে শুল্ক কর্মকর্তারা তাঁর কাছে থাকা নমুনা নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। পরে তাঁকে পাচার, তথ্য গোপন এবং সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়।
পেত্রোভা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, নমুনাগুলো যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সময় শুল্ক কর্তৃপক্ষকে ঘোষণা করতে হয়, বিষয়টি তিনি জানতেন না। অবৈধভাবে সেগুলো দেশে নেওয়ার কোনো উদ্দেশ্যও তাঁর ছিল না।
গবেষণার নমুনা ঘিরে আইনি জটিলতা
ফ্রান্সে পেত্রোভা এমন একটি গবেষণাগার পরিদর্শন করেছিলেন, যেখানে ব্যাঙের ভ্রূণের অত্যন্ত পাতলা টিস্যু নমুনা প্রস্তুত করা হয়। সেখান থেকেই নিজের গবেষণার জন্য নমুনা সংগ্রহ করেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সময় এসব নমুনা নিয়ে শুল্ক কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর বিরোধ তৈরি হয়। কর্তৃপক্ষের অভিযোগ ছিল, তিনি ভ্রূণ সম্পর্কে যথাযথ তথ্য দেননি এবং কর্মকর্তাদের বিভ্রান্ত করেছেন।
অন্যদিকে পেত্রোভার আইনজীবীরা দাবি করেন, নমুনাগুলো ছিল নিষ্ক্রিয়, জীবিত নয় এবং বিষাক্তও নয়। ফলে সেগুলো জনস্বাস্থ্যের জন্য কোনো ঝুঁকি তৈরি করেনি। তাঁদের বক্তব্য, হার্ভার্ডের এই বিজ্ঞানী চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণায় যুক্ত ছিলেন, যার লক্ষ্য ছিল বার্ধক্যপ্রক্রিয়া সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া।
ভিসা বাতিল নিয়ে আদালতের প্রশ্ন
মামলাটি দুর্বল হয়ে পড়ে গত এপ্রিলে। ওই সময় এক ফেডারেল বিচারক রায় দেন, নমুনা নিয়ে ঘটনার পর শুল্ক কর্মকর্তা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে পেত্রোভার ভিসা বাতিল করেছিলেন।
এই ঘটনায় পেত্রোভা রাশিয়ায় ফেরত পাঠানোর আশঙ্কায় ছিলেন। তাঁর আশঙ্কা ছিল, দেশে ফিরে তাঁকে কারাবাসের মুখেও পড়তে হতে পারে।
তাঁর আইনজীবীরা আরও অভিযোগ করেন, সরকার অভিবাসনসংক্রান্ত মামলায় হেরে যাওয়ার আশঙ্কায় তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ এনেছে। তাঁদের মতে, এটি ছিল প্রতিহিংসামূলক ও অস্বাভাবিক আইনি পদক্ষেপ।
মামলা চালানোর চেয়ে প্রত্যাহারকে যুক্তিযুক্ত মনে করেছে প্রসিকিউশন
মঙ্গলবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি লিয়া ফোলি আদালতে সব অভিযোগ প্রত্যাহারের আবেদন করেন। তিনি মামলার নতুন পরিস্থিতি এবং তাঁর দপ্তরের অগ্রাধিকার ও সীমিত সম্পদের বিষয়টি তুলে ধরেন।
ফোলির যুক্তি ছিল, মামলা চালিয়ে যাওয়ার ব্যয় জনস্বার্থে এর সম্ভাব্য সুবিধার চেয়ে বেশি। তবে তিনি পেত্রোভার বিরুদ্ধে বাছাই করে কিংবা প্রতিহিংসামূলকভাবে মামলা করার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন।
এপ্রিলে আদালতের আরেকটি সিদ্ধান্তও প্রসিকিউশনের অবস্থানকে জটিল করে তুলেছিল। ওই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পেত্রোভার আইনজীবীরা একই ধরনের ঘটনায় অন্য যাত্রীদের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থাসংক্রান্ত সরকারি নথি পাওয়ার সুযোগ পেতে পারতেন। বিশেষ করে শুল্ক ঘোষণা না করা পণ্য বহনের তুলনীয় মামলাগুলোর তথ্য চাওয়া যেত। এতে তাঁর বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলকভাবে মামলা করার অভিযোগ যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হতো।
বিচারক লিও সরোকিন বুধবার কোনো শুনানি ছাড়াই সব অভিযোগ খারিজ করেন। তিনি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মনোনীত বিচারক।
আইনজীবীদের স্বস্তি, গবেষণায় ফেরার সুযোগ
রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন পেত্রোভার আইনজীবী ড্যানিয়েল মার্কস। তাঁর বক্তব্য, হার্ভার্ডের এই বিজ্ঞানীর বিরুদ্ধে এমন মামলা আদৌ করা উচিত হয়নি। চিকিৎসা গবেষণার জন্য আনা নিষ্ক্রিয় ও নিরীহ নমুনাকে কেন্দ্র করে ফৌজদারি মামলা চালানো অযৌক্তিক ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ পেত্রোভার আটক থাকার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। তাদের অভিযোগ ছিল, ব্যাঙের ভ্রূণ সম্পর্কে তিনি ফেডারেল কর্মকর্তাদের বিভ্রান্ত করেছিলেন।
সব অভিযোগ প্রত্যাহারের ফলে দীর্ঘ আইনি জটিলতার অবসান ঘটল পেত্রোভার জন্য। গবেষণার নমুনা বহন ও শুল্কসংক্রান্ত একটি ঘটনা কীভাবে অভিবাসন ও ফৌজদারি মামলায় রূপ নিয়েছিল, এই মামলাটি তা আবার সামনে এনেছে।












