বাংলাদেশের কৃষিতে একসময় ভুট্টা ছিল তুলনামূলক অপরিচিত ফসল। ধান ও গমের প্রাধান্যের বাইরে সীমিত কিছু এলাকায় এর চাষ হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলেছে। দেশের উত্তরাঞ্চলের চর, নদীতীরবর্তী জমি, সমতল কৃষিজমি থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় এখন ভুট্টার আবাদ ছড়িয়ে পড়েছে। কৃষকের কাছে এটি শুধু একটি বিকল্প ফসল নয়, অনেক ক্ষেত্রে আয়ের নতুন উৎস।
এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে পোলট্রি, মাছ ও গবাদিপশুর খাদ্যশিল্পের দ্রুত সম্প্রসারণ। এসব শিল্পে ভুট্টার চাহিদা বাড়ায় কৃষকেরাও ফসলটি চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। তুলনামূলক বেশি ফলন, বাজারে ক্রেতার উপস্থিতি এবং ধান-গমের বাইরে নতুন আয়ের সুযোগ ভুট্টাকে বাংলাদেশের কৃষিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে এসেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৫ লাখ ১৩ হাজার হেক্টর জমিতে ভুট্টা উৎপাদিত হয়েছে। উৎপাদনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৮ লাখ ৭০ হাজার টন। আগের অর্থবছরের তুলনায় উৎপাদন বেড়েছে ৭ শতাংশ। অন্যদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভুট্টার আবাদি জমি বেড়ে প্রায় ৬ লাখ ৭২ হাজার হেক্টরে পৌঁছানোর প্রাক্কলন করা হয়েছিল।
উত্তরাঞ্চলের মাঠে ভুট্টার বিস্তার
ভুট্টা চাষের বিস্তারে দেশের উত্তরাঞ্চল বিশেষ ভূমিকা রাখছে। লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর, দিনাজপুর, নীলফামারী, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও গাইবান্ধার বিভিন্ন এলাকায় এই ফসলের আবাদ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার চরাঞ্চলেও ভুট্টা চাষ কৃষকের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
বিশেষ করে বালুমিশ্রিত চরজমিতে ভুট্টার ফলন ভালো হওয়ায় অনেক কৃষক এই ফসলের দিকে ঝুঁকেছেন। বর্ষায় পানিতে ডুবে যাওয়া জমি শুষ্ক মৌসুমে কাজে লাগানোর সুযোগও তৈরি হয়েছে।
লালমনিরহাটের তিস্তা তীরবর্তী চরাঞ্চলে বহু কৃষক দীর্ঘদিন ধরে ভুট্টা চাষ করছেন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রংপুর অঞ্চলে প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার হেক্টর জমিতে ভুট্টা চাষের তথ্য পাওয়া যায়। এই অঞ্চলের আবাদি জমির উল্লেখযোগ্য অংশ চরাঞ্চলে অবস্থিত।
শীতকাল ভুট্টা চাষের প্রধান মৌসুম
বাংলাদেশে সাধারণত রবি ও খরিফ—দুই মৌসুমেই ভুট্টা চাষ হয়। তবে শীতকালীন চাষে ফলনের সম্ভাবনা বেশি। সাধারণত নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে বীজ বপন করা হয়। ফসল সংগ্রহ করা হয় মার্চ ও এপ্রিল মাসে।
গ্রীষ্মকালেও ভুট্টা চাষ হয়। এ ক্ষেত্রে এপ্রিল-মে মাসে বপন করে আগস্ট-সেপ্টেম্বরের দিকে ফসল তোলা হয়। তবে শীতকালীন উৎপাদনই দেশের মোট ভুট্টার বড় অংশ জোগান দেয়।
ভুট্টা চাষের জন্য মাঝারি তাপমাত্রা, পর্যাপ্ত পানি এবং পানি নিষ্কাশনের ভালো ব্যবস্থা প্রয়োজন। অতিরিক্ত পানি জমে থাকলে গাছের ক্ষতি হয়। ফুল আসার সময় অতিরিক্ত তাপমাত্রা পরাগায়ন ব্যাহত করে ফলন কমিয়ে দিতে পারে। তাই জমি নির্বাচন থেকে শুরু করে সেচ ও পরিচর্যা—প্রতিটি ধাপেই কৃষকের সতর্কতা প্রয়োজন।
পোলট্রি ও মাছের খাদ্যশিল্প বড় বাজার তৈরি করেছে
বাংলাদেশে ভুট্টার চাহিদা বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় কারণ প্রাণিখাদ্যশিল্পের সম্প্রসারণ। পোলট্রি খাদ্য তৈরিতে ভুট্টা অন্যতম প্রধান উপাদান। মাছ ও গবাদিপশুর খাদ্য উৎপাদনেও এর ব্যবহার রয়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, দেশে উৎপাদিত ভুট্টার প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পোলট্রি খাদ্যে ব্যবহৃত হয়। মাছের খাদ্যে যায় প্রায় ১৫ শতাংশ এবং গবাদিপশুর খাদ্যে প্রায় ১২ শতাংশ। বাকি অংশ খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, মিষ্টান্ন ও অন্যান্য শিল্পে ব্যবহার করা হয়।
এ ছাড়া ভুট্টার মোচা থেকে মানুষের খাবার, পপকর্ন, সুইট কর্ন ও বেবি কর্ন তৈরি হয়। ভুট্টার গাছ গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। ফলে একটি ফসল থেকেই কৃষি ও খাদ্যশিল্পের একাধিক খাতে উপকরণ পাওয়া সম্ভব।
কৃষকের আয় বাড়লেও দামের নিশ্চয়তা নেই
ভুট্টা চাষে কৃষকের আগ্রহের অন্যতম কারণ এর তুলনামূলক ভালো ফলন। উত্তরাঞ্চলের অনেক এলাকায় প্রতি বিঘায় ৩৫ থেকে ৪৫ মণ পর্যন্ত ভুট্টা পাওয়া যায়। তবে জমির ধরন, বীজ, সার, সেচ ও পরিচর্যার ওপর ফলন নির্ভর করে।
২০২৫ সালের মে মাসে প্রকাশিত কৃষকদের অভিজ্ঞতাভিত্তিক এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর ও দিনাজপুরে ভুট্টার দাম আগের মৌসুমের তুলনায় কেজিতে দুই থেকে তিন টাকা কমে ২৮ থেকে ২৯ টাকায় নেমেছিল। অথচ উৎপাদন খরচ বেড়ে কেজিপ্রতি প্রায় ১১ থেকে ১৩ টাকায় পৌঁছায়।
প্রতি বিঘায় উৎপাদন খরচ জমি ও অন্যান্য ব্যয়ভেদে প্রায় ১৪ থেকে ১৬ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়েছে। ফলন ভালো হলেও বাজারদর কমে গেলে কৃষকের প্রত্যাশিত লাভ কমে যায়। বিশেষ করে ফসল কাটার মৌসুমে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ ভুট্টা বাজারে আসায় দাম পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এ কারণে শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, কৃষকের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আমদানিনির্ভরতা কমানোর সুযোগ
দেশে ভুট্টার উৎপাদন বাড়লেও প্রাণিখাদ্যশিল্পের চাহিদা পুরোপুরি স্থানীয় উৎপাদন দিয়ে মেটানো সব সময় সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বিদেশ থেকে ভুট্টা আমদানি করতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের ২০২৫-২৬ বিপণনবর্ষের পূর্বাভাসে বাংলাদেশের ভুট্টার উৎপাদন প্রায় ৫৮ লাখ টন এবং আবাদি জমি প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর ধরা হয়েছিল।
স্থানীয় উৎপাদন বাড়লে আমদানির ওপর চাপ কমতে পারে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি কৃষকের জন্য বড় বাজার তৈরি হবে। তবে উৎপাদন বাড়ানোর সঙ্গে সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজার ব্যবস্থার উন্নয়নও জরুরি।
রোগবালাই ও সংরক্ষণ বড় চ্যালেঞ্জ
ভুট্টা চাষে ফল আর্মিওয়ার্ম বা একধরনের ক্ষতিকর পোকার আক্রমণ বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশে এই পোকার বিস্তার শনাক্ত হওয়ার পর থেকে কৃষকেরা নতুন ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছেন। গাছের পাতা ও মোচায় আক্রমণ হলে ফলন কমে যেতে পারে।
এ ছাড়া ফসল কাটার পর সঠিকভাবে শুকানো ও সংরক্ষণ না করলে ভুট্টায় ছত্রাক জন্মাতে পারে। এর ফলে আফলাটক্সিন নামের ক্ষতিকর বিষাক্ত উপাদান তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা মানুষ ও প্রাণীর স্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক।
কৃষকের অনেকেরই পর্যাপ্ত গুদাম বা সংরক্ষণ সুবিধা নেই। ফলে ফসল ওঠার পরপরই কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন তাঁরা। উন্নত শুকানোর ব্যবস্থা, নিরাপদ গুদাম এবং সহজ ঋণসুবিধা থাকলে কৃষকেরা বাজারের ভালো সময়ের জন্য অপেক্ষা করার সুযোগ পেতেন।
কৃষির নতুন অর্থনীতিতে ভুট্টার অবস্থান
বাংলাদেশে ভুট্টার বিস্তার কৃষির বহুমুখীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ধাননির্ভর কৃষি থেকে বেরিয়ে এসে কৃষকেরা বাজারের চাহিদা অনুযায়ী নতুন ফসল বেছে নিচ্ছেন। প্রাণিখাদ্যশিল্পের প্রসার এই পরিবর্তনকে আরও গতিশীল করেছে।
তবে ভুট্টার ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শুধু উৎপাদনের পরিমাণের ওপর নয়। উন্নত বীজ, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, সেচ, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং ন্যায্য বাজারদর নিশ্চিত করা গেলে এই ফসল কৃষকের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের খাদ্য ও প্রাণিখাদ্যশিল্পের আমদানিনির্ভরতাও কমাতে পারে।
বাংলাদেশের মাঠে ভুট্টার ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি তাই কেবল একটি ফসলের বিস্তার নয়, কৃষির নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনারও ইঙ্গিত।












