সারাক্ষণ রিপোর্ট
নেপালের ভোতে কোশি নদীর ভয়াবহ বন্যার পর পুনর্গঠনের জন্য ২ কোটি ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় গঠিত আন্তর্জাতিক তহবিল। তবে দেশটির পুনর্গঠনে প্রয়োজনীয় অর্থের তুলনায় এই সহায়তা খুবই সামান্য। তাই সীমিত অর্থের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিকল্পনা, স্থাপত্য ও প্রকৌশল শিক্ষায় মৌলিক পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন নেপালের স্থপতি ও প্রকৌশল শিক্ষাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ জিবা রাজ পোখারেল।
তাঁর মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার নতুন সুযোগ তৈরি হলেও অর্থের পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। ফলে নেপালকে পুনর্গঠনের কাজে দক্ষ জনবল, আধুনিক পরিকল্পনা এবং কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় আন্তর্জাতিক সহায়তা সামান্য
২০২২ সালে গঠিত ফান্ড ফর রেসপন্ডিং টু লস অ্যান্ড ড্যামেজ (এফআরএলডি) জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সহায়তা দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নে যেসব দেশের অবদান খুব সামান্য, অথচ ক্ষতির শিকার হতে হচ্ছে বেশি, তাদের জন্য এই তহবিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
নেপালের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পষ্ট। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনে দেশটির অবদান ০.১ শতাংশেরও কম। অথচ বন্যা ও অন্যান্য জলবায়ুজনিত দুর্যোগে দেশটিকে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।
ভোতে কোশি বন্যার পুনর্গঠনে নেপালের প্রয়োজন প্রায় ৪৭৫ কোটি ডলার। সেখানে প্রতিশ্রুত ২ কোটি ডলার প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম। তবে আন্তর্জাতিক ক্ষয়ক্ষতি তহবিলের আওতায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা।
আন্তর্জাতিক তহবিলে অর্থের সংকট
লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, গত বছরের ব্রাজিলের জলবায়ু সম্মেলন কপ৩০-এ নেপালের জন্য বিশেষ সহায়তার আহ্বান জানানো হয়েছিল। তহবিলের আবেদন গ্রহণের সময়সীমা গত জুলাইয়ের মাঝামাঝি শেষ হয়। নেপাল আনুষ্ঠানিক আবেদন না করলেও দেশটির জন্য বিশেষ বরাদ্দের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ওই তহবিলে ১১৯টি দেশ মোট ১৭৬টি আবেদন জমা দিয়েছিল। এসব আবেদনে চাওয়া অর্থের পরিমাণ ছিল ২৮০ কোটি ডলার। বিপরীতে তহবিলে প্রতিশ্রুত অর্থ ছিল মাত্র ৮২ কোটি ২০ লাখ ডলার। ভারতও তিনটি প্রকল্পের জন্য মোট ৫ কোটি ২০ লাখ ডলারের আবেদন করেছিল।
উন্নত দেশগুলো ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর ১০০ বিলিয়ন ডলার জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু অনেক দেশ সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করেনি। ২০২৪ সালে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বার্ষিক প্রয়োজন ছিল ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার। অথচ উন্নত দেশগুলো ২০৩৫ সাল থেকে বছরে ৩০০ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে।
পুনর্গঠনে পরিকল্পনা ও প্রকৌশলীদের ভূমিকা
সীমিত অর্থ দিয়ে পুনর্গঠন করতে হলে পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি ও প্রকৌশলীদের দক্ষতার ওপর নির্ভর করতে হবে বলে মনে করেন পোখারেল।
তাঁর মতে, নদীর তীর থেকে নিরাপদ দূরত্বে নতুন বসতি গড়ে তোলার পরিকল্পনা করতে হবে। ভবন নির্মাণে জলবায়ুসহিষ্ণু বাঁশ, পাথর ও মাটির মতো উপকরণের ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। পাশাপাশি নতুন বসতিতে টেকসই সড়ক, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে প্রকৌশলীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বাবুরাম ভট্টরাই একজন পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতি। নগর পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা, দূষণকারীকে দায়বদ্ধ করার নীতি এবং সড়ক প্রশস্তকরণসহ বিভিন্ন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেছেন লেখক।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ পেশায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। আধুনিক নির্মাণের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের সমন্বয়ের উদাহরণ হিসেবে নতুন বাসস্টপগুলোর নকশার কথা তুলে ধরেছেন পোখারেল। এসব স্থাপনায় ঐতিহ্যবাহী বিশ্রামাগারের স্থাপত্যরীতির প্রতিফলন রয়েছে।
প্রকৌশল শিক্ষায় পুরোনো পদ্ধতি বড় বাধা
নেপালে দক্ষ স্থপতি, পরিকল্পনাবিদ ও প্রকৌশলীর অভাব নেই। কিন্তু তাঁদের শিক্ষাব্যবস্থায় এখনো শিক্ষকনির্ভর ও প্রচলিত পাঠ্যক্রমের প্রভাব বেশি। লেখকের মতে, শিক্ষার্থীরা কী শিখেছে, তার পরিবর্তে শিক্ষক কী পড়িয়েছেন—এ বিষয়টিই বেশি গুরুত্ব পায়।
তিনি মনে করেন, পাঠ্যক্রমকে ফলাফলভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থায় রূপান্তর করতে হবে। এতে শিক্ষার্থীর বাস্তব দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা ও পেশাগত যোগ্যতা মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
বর্তমান ব্যবস্থার কারণে নেপালের প্রকৌশল ও স্থাপত্য শিক্ষার ডিগ্রি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যথাযথ স্বীকৃতি পাচ্ছে না। ফলে বিদেশে কাজ করতে গিয়ে অনেক স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীকে অপেক্ষাকৃত নিচের পদে দায়িত্ব পালন করতে হয়।
ওয়াশিংটন অ্যাকর্ডের সদস্য হওয়ার উদ্যোগ
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের জন্য নেপালকে ওয়াশিংটন অ্যাকর্ডের সদস্য হওয়ার ওপর গুরুত্ব দিতে বলেছেন পোখারেল। এটি প্রকৌশল শিক্ষার মান ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করার একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা এর সদস্য।
উদাহরণ হিসেবে ইন্দোনেশিয়ার কথা তুলে ধরেছেন তিনি। দেশটি মাত্র তিন বছরের প্রচেষ্টায় ওয়াশিংটন অ্যাকর্ডের সদস্যপদ অর্জন করে। পরে বিদেশে পাঁচ হাজারের বেশি প্রকৌশলী পাঠানোর সুযোগ তৈরি হয়, যা দেশটির জন্য অর্থনৈতিক সুবিধা বয়ে আনে।
নেপাল ইঞ্জিনিয়ারিং কাউন্সিল এ উদ্যোগে নেতৃত্ব দিচ্ছে। সংস্থাটি ভারতের ভোপালের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব টেকনিক্যাল টিচার্স ট্রেনিং অ্যান্ড রিসার্চের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করেছে। প্রতিষ্ঠানটি নেপালের প্রকৌশল শিক্ষাকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির উপযোগী করে তুলতে পরামর্শক ও সহযোগী হিসেবে কাজ করছে।
ইতিমধ্যে পোখারা, কাঠমান্ডুসহ বিভিন্ন এলাকার বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য ও প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমাঞ্চলের ফার ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পূর্বাঞ্চলের পূর্বাঞ্চল বিশ্ববিদ্যালয় এবং ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এই উদ্যোগে যুক্ত হয়েছেন।
পোখারেলের মতে, এখন প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক ও নীতিগত সহযোগিতা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এতে নেপালের নতুন প্রজন্মের প্রকৌশলী ও স্থপতিরা আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও পেশাগত স্বীকৃতি পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
ভোতে কোশির বন্যার পুনর্গঠন থেকে শুরু করে প্রকৌশল শিক্ষার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি—দুই ক্ষেত্রেই দক্ষতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন লেখক।












