সুন্দরবনের গভীর অরণ্যে, গাছের শিকড়ের জটিল বিস্তার, পাতার স্তূপ আর নদী-খালের কিনারায় নীরবে চলাচল করে এক রহস্যময় প্রাণী—গোখরা সাপ। কখনো মাটির ওপর, কখনো গাছের ডালে, আবার কখনো পানির ভেতর দিয়ে এগিয়ে যায় সে। বনের অন্য প্রাণীদের মতো সহজে চোখে পড়ে না। কিন্তু সুন্দরবনের খাদ্যজাল ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যে তারও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
গোখরা বলতেই সাধারণত ফণা তোলা বিষধর সাপের পরিচিত ছবি মনে আসে। তবে সুন্দরবনে একাধিক প্রজাতির গোখরা ও গোখরাগোত্রীয় সাপের উপস্থিতি রয়েছে। এর মধ্যে পদ্ম গোখরা বা মনোকলড কোবরা এবং রাজ গোখরা বা শঙ্খচূড় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এরা একই ধরনের সাপ নয়। বিশেষ করে রাজ গোখরা আকার, খাদ্যাভ্যাস ও আচরণের দিক থেকে অন্য গোখরাদের তুলনায় আলাদা।
ম্যানগ্রোভের জটিল পরিবেশে বসবাস
সুন্দরবনের পরিবেশ গোখরার জন্য এক বিশেষ আবাসস্থল। এখানে রয়েছে লবণাক্ত ও মিঠাপানির মিশ্রণ, অসংখ্য নদী-খাল, কাদামাটির চর, ঘন গাছপালা এবং মাটির ওপর ছড়িয়ে থাকা শ্বাসমূল। জোয়ার-ভাটার কারণে প্রতিদিন বদলে যায় বনের অনেক এলাকার চেহারা।
এই পরিবেশে সাপের চলাচল ও আশ্রয়ের জন্য রয়েছে নানা ধরনের জায়গা। গাছের গোড়া, ঝোপঝাড়, পচা পাতার স্তূপ এবং মাটির ফাঁকফোকর তাদের আড়াল দেয়। সুন্দরবনের রাজ গোখরা ম্যানগ্রোভ বনকে নিজের আবাস হিসেবে ব্যবহার করে। বাংলাদেশের বন ও বন্য প্রাণী বিষয়ক গবেষণায় এই প্রজাতির উপস্থিতি সুন্দরবনে নথিভুক্ত হয়েছে।
শিকারি হিসেবে গোখরার জীবন
গোখরার খাদ্যাভ্যাস প্রজাতিভেদে আলাদা। পদ্ম গোখরা সাধারণত ইঁদুর, ব্যাঙ, ছোট সরীসৃপ ও অন্যান্য উপযুক্ত ছোট প্রাণী শিকার করে। অন্যদিকে রাজ গোখরার প্রধান খাদ্যই হলো অন্য সাপ। বিষধর ও নির্বিষ—দুই ধরনের সাপই তার শিকারের তালিকায় থাকতে পারে। এ কারণেই তার বৈজ্ঞানিক নামের প্রথম অংশ ‘ওফিওফ্যাগাস’, যার অর্থ সাপখেকো।
রাজ গোখরা শিকার খুঁজতে ঘন ঝোপ, বনভূমির মেঝে এবং গাছপালার আশপাশে চলাচল করে। তার ঘ্রাণশক্তি ও জিহ্বার সাহায্যে পরিবেশের রাসায়নিক সংকেত শনাক্ত করার ক্ষমতা শিকার খুঁজে পেতে সহায়তা করে। শিকার কাছে এলে দ্রুত আক্রমণ করে বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে তাকে দুর্বল করে ফেলে।
সাপের শরীরে বিষ থাকলেও তা রাজ গোখরার শিকার হওয়ার ক্ষেত্রে সব সময় বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। তবে অন্য বিষধর সাপ শিকার করার সময় তার নিজেরও ঝুঁকি থাকে। খাদ্যশৃঙ্খলে এই শিকারি অন্য সাপের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।
ফণা তোলা কি আক্রমণের সংকেত?
গোখরার সবচেয়ে পরিচিত বৈশিষ্ট্য তার ফণা। বিপদ অনুভব করলে শরীরের সামনের অংশ উঁচু করে ঘাড়ের পাশের পাঁজর প্রসারিত করে ফণা তৈরি করে। এতে সাপটিকে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বড় দেখায়।
এটি মূলত আত্মরক্ষার কৌশল। শত্রুকে ভয় দেখিয়ে দূরে সরিয়ে দেওয়াই এর উদ্দেশ্য। বিপদ কাছাকাছি এলে হিসহিস শব্দ করতে পারে এবং প্রয়োজন হলে কামড়ও দিতে পারে। তবে ফণা তুললেই সাপটি আক্রমণ করতে যাচ্ছে, এমন ধারণা সঠিক নয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এটি দূরত্ব বজায় রাখার সতর্কসংকেত।
রাজ গোখরা স্থলভাগে চলাচলের পাশাপাশি পানিতেও দক্ষ। সুন্দরবনের নদী ও খালবেষ্টিত পরিবেশে এই দক্ষতা তার চলাচলের বাড়তি সুবিধা তৈরি করে। বাংলাদেশের বন বিভাগের প্রজাতি মূল্যায়নেও তাকে ভালো সাঁতারু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডিম, বাসা ও মাতৃত্বের ব্যতিক্রমী গল্প
রাজ গোখরার প্রজননজীবন অন্য অনেক সাপের তুলনায় বিশেষ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। স্ত্রী রাজ গোখরা শুকনো পাতা ও বনভূমির অন্যান্য জৈব উপাদান একত্র করে ডিম রাখার বাসা তৈরি করে। সাপের মধ্যে এ ধরনের বাসা নির্মাণের আচরণ অত্যন্ত বিরল।
ডিম পাড়ার পর স্ত্রী সাপ বাসার আশপাশে অবস্থান করে এবং ডিম ফুটে বাচ্চা বের হওয়া পর্যন্ত সেগুলোর নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখে। এ সময় বাসার কাছে কোনো প্রাণী চলে এলে সে আত্মরক্ষামূলক আচরণ করতে পারে। ডিম ফুটে বাচ্চা বের হওয়ার পর তারা সাধারণত নিজেদের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের প্রজাতি মূল্যায়নে রাজ গোখরার এই বাসা তৈরির আচরণকে বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বনের ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
সুন্দরবনের গোখরা শুধু ভয়ংকর বিষধর প্রাণী নয়, বনের খাদ্যজালেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সাধারণ গোখরা ইঁদুরের মতো প্রাণী শিকার করে। এতে ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে রাজ গোখরা অন্যান্য সাপ শিকার করে। ফলে বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
তবে এই প্রাণীর জীবনও ঝুঁকিমুক্ত নয়। বনভূমির গুণগত মান কমে যাওয়া, আবাসস্থল নষ্ট হওয়া এবং মানুষের হাতে নির্বিচারে সাপ মারা পড়া তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি। বাংলাদেশে রাজ গোখরাকে বিপন্নপ্রবণ (ভালনারেবল) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বন বিভাগের প্রজাতি মূল্যায়ন অনুযায়ী, সুন্দরবনে এই সাপের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে নিয়মিত হলেও এর মোট জনসংখ্যা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই।
ভয় নয়, প্রয়োজন সচেতন সহাবস্থান
সুন্দরবনে জেলে, বাওয়ালি, মৌয়াল ও বনজীবীদের নিয়মিত বনের ভেতরে যেতে হয়। ফলে বিষধর সাপের সঙ্গে তাদের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। বিশেষ করে পাতার স্তূপ, গাছের গোড়া কিংবা ঝোপঝাড়ে কাজ করার সময় সতর্ক থাকা জরুরি।
গোখরা দেখা গেলে সেটিকে ধরতে, তাড়াতে কিংবা মারতে যাওয়ার চেষ্টা করা বিপজ্জনক। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে সাপটিকে নিজের মতো সরে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত। বন্য প্রাণীর আবাসস্থল রক্ষা এবং মানুষের মধ্যে সাপ সম্পর্কে সঠিক ধারণা তৈরি করাও সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সুন্দরবনের গোখরার জীবন তাই শুধু বিষ, ফণা আর শিকারের গল্প নয়। এটি এমন এক প্রাণীর জীবন, যে জোয়ার-ভাটার পরিবর্তনশীল পরিবেশে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখে বনের প্রাকৃতিক ভারসাম্যের অংশ হয়ে আছে। তাকে রক্ষা করা মানে সুন্দরবনের সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য রক্ষার প্রচেষ্টাকেও শক্তিশালী করা।












