গরুর দুধের বদলে ওট বা আমন্ড মিল্কের মতো উদ্ভিদভিত্তিক পানীয় গ্রহণ করলে শরীরে গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে কিশোরী, তরুণী ও গর্ভবতী নারীদের জন্য এ ধরনের খাদ্যাভ্যাস বাড়তি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকেরা। তাঁদের মতে, উদ্ভিদভিত্তিক দুধ ও দুগ্ধজাত বিকল্পে আয়োডিনসহ কয়েকটি জরুরি পুষ্টি উপাদানের পরিমাণ সাধারণত প্রাণিজ দুধের তুলনায় কম।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সারে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, দুগ্ধজাত খাবারের পরিবর্তে উদ্ভিদভিত্তিক বিকল্প গ্রহণ করলে আয়োডিন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন বি২ ও ভিটামিন বি১২ গ্রহণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে চিকিৎসা সাময়িকী ‘ল্যানসেট প্ল্যানেটারি হেলথ’-এ।
আয়োডিনের ঘাটতিতে বেশি ঝুঁকিতে কিশোরীরা
গবেষণায় আগে বাজারে থাকা ১৪৬ ধরনের উদ্ভিদভিত্তিক দুধ, ৭৬ ধরনের দই এবং ৬৭ ধরনের পনির পরীক্ষা করা হয়েছিল। এসব পণ্যে আয়োডিন, ক্যালসিয়াম এবং বিভিন্ন ভিটামিনের উপস্থিতি বিশ্লেষণ করেন গবেষকেরা।
ফলাফলে দেখা যায়, উদ্ভিদভিত্তিক দুগ্ধ বিকল্পের মাত্র ১২ শতাংশে আয়োডিন যোগ করা হয়েছে। অন্যদিকে ৬১ শতাংশ পণ্যে ক্যালসিয়াম এবং ৪৬ শতাংশে ভিটামিন বি১২ যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ বাজারের অধিকাংশ বিকল্প পণ্যে আয়োডিনের ঘাটতি রয়েছে।
গবেষকদের হিসাবে, যুক্তরাজ্যে ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরীদের ৫৪ শতাংশের খাদ্যাভ্যাসে আগে থেকেই পর্যাপ্ত আয়োডিনের অভাব রয়েছে। তারা যদি দুগ্ধজাত খাবারের পরিবর্তে উদ্ভিদভিত্তিক বিকল্প গ্রহণ করে, তাহলে এই ঘাটতিতে পড়ার হার বেড়ে ৮০ শতাংশ হতে পারে।
ক্যালসিয়ামের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। কিশোরীদের মধ্যে অপর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম গ্রহণের হার ৫৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। ক্যালসিয়াম হাড় ও দাঁতের গঠনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আর ভিটামিন বি১২ স্নায়ুতন্ত্র ও রক্তকণিকার স্বাভাবিক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে।
গর্ভাবস্থায় আয়োডিনের প্রয়োজন বেশি
আয়োডিন থাইরয়েড হরমোন তৈরিতে প্রয়োজনীয়। এই হরমোন শরীরের বিপাকপ্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও মস্তিষ্কের বিকাশে ভূমিকা রাখে। গর্ভাবস্থায় ভ্রূণের মস্তিষ্কের বিকাশের জন্যও আয়োডিন গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় শরীরে এর চাহিদা বেড়ে যায়।
গবেষণার প্রধান লেখক ও ইউনিভার্সিটি অব সারের জনস্বাস্থ্য পুষ্টিবিষয়ক সহযোগী অধ্যাপক সারাহ বাথ বলেন, অনেকেই আয়োডিনের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন নন। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে দুগ্ধজাত খাবার আয়োডিনের অন্যতম প্রধান উৎস। কিন্তু প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান যোগ করা না হলে উদ্ভিদভিত্তিক বিকল্পে এর পরিমাণ খুবই কম থাকে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, পুরোপুরি খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন না করলেও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কেউ যদি দুগ্ধজাত খাবারের ২০ থেকে ৩৫ শতাংশ উদ্ভিদভিত্তিক বিকল্প দিয়ে প্রতিস্থাপন করেন, তাহলে ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরীদের মধ্যে অপর্যাপ্ত আয়োডিন গ্রহণের হার ৫৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬৫ শতাংশ হতে পারে। ১৯ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের ক্ষেত্রে এই হার ৩২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪২ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
পুষ্টি নিশ্চিত করতে বাধ্যতামূলক সংযোজনের প্রস্তাব
পরিবেশগত টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে মাংস ও দুগ্ধজাত খাবার কম খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক কমিটিও এ ধরনের খাদ্যাভ্যাস উৎসাহিত করছে। তবে গবেষকদের আশঙ্কা, পুষ্টির বিষয়টি বিবেচনায় না রেখে প্রাণিজ খাবার কমানোর উদ্যোগ কিশোরী ও নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে।
গবেষণার সহলেখক কেটি নিকল বলেন, পরিবেশ রক্ষার লক্ষ্য অর্জনের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে। উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্যের দিকে ঝোঁক যেন পুষ্টির ঘাটতি তৈরি না করে, সে জন্য খাদ্যনীতিতে পরিবর্তন প্রয়োজন।
গবেষকেরা উদ্ভিদভিত্তিক দুধের পাশাপাশি রুটির মতো কিছু খাবারে আয়োডিন বাধ্যতামূলকভাবে যোগ করার প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁদের মতে, এ ক্ষেত্রে সরকারের নীতিগত উদ্যোগ জরুরি। কারণ উদ্ভিদভিত্তিক বিকল্প পণ্যে আয়োডিন, ক্যালসিয়াম, রিবোফ্লাভিন ও ভিটামিন বি১২-এর পরিমাণ দুগ্ধজাত খাবারের সমতুল্য নয়।
দুধের বিকল্প হিসেবে উদ্ভিদভিত্তিক পানীয় বেছে নেওয়ার প্রবণতা বাড়লেও পুষ্টির সমতা নিশ্চিত না হলে বিশেষ করে কিশোরী ও তরুণীদের খাদ্যতালিকায় গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি দেখা দিতে পারে—গবেষণার মূল সতর্কবার্তা এটিই।












