আপনার শরীরে এমন কোনো জিন আছে কি না, যা নির্ধারণ করে দিতে পারে আপনি অল্প বয়সেই গুরুতর রোগে আক্রান্ত হবেন কিংবা স্বাভাবিকের চেয়ে কম দিন বাঁচবেন—এমন তথ্য জানার সুযোগ পেলে আপনি কি পরীক্ষা করাতে চাইবেন? নাকি ভবিষ্যতের ভয়াবহ সম্ভাবনা জেনেও বর্তমান জীবনকে স্বাভাবিক রাখতে চাইবেন?
এমন কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হয়েছিলেন যুক্তরাজ্যের লরা সাইডস। তাঁর বাবা চল্লিশের কোঠায় থাকতেই বিরল ধরনের অল্প বয়সে শুরু হওয়া আলঝেইমার রোগে আক্রান্ত হন। পরে চিকিৎসকদের কাছ থেকে লরা জানতে পারেন, বাবার রোগের জন্য দায়ী একই জিন তাঁর শরীরেও থাকতে পারে। অর্থাৎ, তাঁরও এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ।
বিষয়টি শুধু একটি চিকিৎসা পরীক্ষা করানোর সিদ্ধান্ত ছিল না। এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল নিজের ভবিষ্যৎ, জীবনযাপনের পরিকল্পনা এবং অজানা এক আশঙ্কার মুখোমুখি হওয়ার মানসিক প্রস্তুতি।
বাবার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক
ছোটবেলা থেকেই বাবার সঙ্গে লরার সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। দুজনের স্বভাবেও মিল ছিল বলে জানান তিনি। তাঁর বাবা ছিলেন একজন সাধারণ চিকিৎসক (জিপি)। লরার ভাষায়, বাবা ছিলেন অসাধারণ স্নেহশীল এবং যত্নশীল মানুষ।
কিন্তু বাবার আলঝেইমারের লক্ষণ ক্রমেই গুরুতর হয়ে উঠলে পরিবারের জীবনে বড় পরিবর্তন আসে। বাবার দেখাশোনার জন্য লরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা ছেড়ে দেন।
বাবার সঙ্গে কাটানো সেই সময়ের স্মৃতি এখনো তাঁর কাছে বিশেষভাবে মূল্যবান। একসঙ্গে বাতিঘর দেখতে যাওয়া, বিভিন্ন ধরনের পানীয়ের বোতলের ঢাকনা সংগ্রহ করা—এমন ছোট ছোট আনন্দে ভরে থাকত তাঁদের সময়।
বাবাকে গোসল করিয়ে দেওয়া, তাঁর পছন্দের গান বাজানো এবং মাথায় গরম পানি ঢেলে দেওয়ার মতো সাধারণ কাজগুলোও তাঁদের সম্পর্কের বিশেষ অংশ হয়ে উঠেছিল। লরার কাছে অসুস্থ বাবার যত্ন নেওয়ার সময়টুকু কেবল দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা ছিল না, বরং বাবার সঙ্গে কাটানো জীবনের এক স্মরণীয় অধ্যায়।
২১ বছর বয়সে বাবার দেখাশোনার দায়িত্ব নেওয়া লরা একসময় হাসপাতালের একটি চিকিৎসা-সাক্ষাতে নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে পারেন।
৫০ শতাংশ ঝুঁকির মুখে লরা
চিকিৎসক তাঁকে জানান, বাবার অল্প বয়সে শুরু হওয়া আলঝেইমারের যে বিশেষ ধরন, সেটি উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়ার সম্ভাবনা তাঁর ৫০ শতাংশ। রোগটির এই বিশেষ ধরনকে ‘লন্ডন ভ্যারিয়েন্ট’ বলা হয়।
এই তথ্য শোনার পর লরার মনে প্রথম যে চিন্তাটি এসেছিল, তা হলো—এ যেন মুদ্রা ছুড়ে ভাগ্য নির্ধারণের মতো। একদিকে রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা, অন্যদিকে স্বাভাবিক জীবন পাওয়ার সম্ভাবনা।
তবে তখন বাবার অসুস্থতা ও তাঁর দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়ে এতটাই ব্যস্ত ছিলেন লরা যে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে ভাবার সুযোগ পাননি। বিষয়টি মনের গভীরে চাপা দিয়ে রাখেন তিনি।
বাবার রোগের অভিজ্ঞতা তাঁকে একদিকে আলঝেইমারের বাস্তবতা সম্পর্কে কাছ থেকে জানার সুযোগ দিয়েছিল, অন্যদিকে নিজের জীবনেও একই পরিণতি নেমে আসতে পারে—এমন আশঙ্কা তৈরি করেছিল।
জীবন বদলে দেওয়া সিদ্ধান্ত
জেনেটিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিজের শরীরে ওই রোগের ঝুঁকিপূর্ণ জিন রয়েছে কি না, তা জানার সুযোগ তৈরি হয়েছিল লরার সামনে। কিন্তু এমন পরীক্ষার ফলাফল শুধু একটি চিকিৎসাবিষয়ক তথ্য নয়; তা একজন মানুষের মানসিক অবস্থা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে দিতে পারে।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, লরা তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন বিবিসি রেডিও ৪-এর ‘লাইফ চেঞ্জিং’ পডকাস্টে। উপস্থাপক চিকিৎসক সিয়ান উইলিয়ামসের সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি জানিয়েছেন, পরীক্ষা করানোর সিদ্ধান্ত এবং তার ফলাফল কীভাবে তাঁর পরবর্তী জীবনকে প্রভাবিত করেছে।
তবে প্রকাশিত প্রতিবেদনের এই অংশে পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফল কিংবা পরবর্তী জীবনের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়নি।












