২৩ বছর পর আবার সাফ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ। নিজেদের মাঠে আয়োজিত এবারের প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা জয়ের প্রত্যাশা অমূলক নয়। হামজা চৌধুরী, শমিত সোমসহ প্রবাসে বেড়ে ওঠা একাধিক ফুটবলারের অন্তর্ভুক্তি জাতীয় দলকে আগের চেয়ে শক্তিশালী করেছে। তবে প্রশ্ন হলো, সাফ জয়ের পর বাংলাদেশের ফুটবল কোথায় যেতে চায়? শুধু দক্ষিণ এশিয়ার সেরা হওয়াই কি দেশের ফুটবলের চূড়ান্ত লক্ষ্য, নাকি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করারও কোনো পরিকল্পনা রয়েছে?
৫ নভেম্বর ঢাকায় শুরু হওয়া সাফ চ্যাম্পিয়নশিপকে ঘিরে বাংলাদেশের প্রত্যাশা এখন মূলত শিরোপাকেন্দ্রিক। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতি তাবিথ আউয়ালও ২০০৩ সালের পর প্রথমবারের মতো শিরোপা জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ জানিয়েছেন। কিন্তু প্রতিবেশী দেশগুলোর ফুটবল পরিকল্পনা বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিযোগিতায় সাফল্যের পাশাপাশি তারা আরও বড় লক্ষ্য সামনে রেখে এগোতে চাইছে।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা
ভারতের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। আমন্ত্রণ পেয়েও তারা গত সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত আসিয়ান কাপে অংশ নেয়নি। পরিবর্তে পানামা, ব্রাজিল ও উরুগুয়ের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ খেলার ব্যবস্থা করেছে।
পানামার সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করলেও পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের কাছে ৪-০ এবং দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ের কাছে ৬-১ গোলে হেরেছে ভারত। কিন্তু এই ফলাফলকে তারা কেবল পরাজয় হিসেবে দেখছে না। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেলার অভিজ্ঞতাকে ভারতীয় ফুটবলের উন্নতির সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচনা করছেন কোচ খালিদ জামিল।
ভারত এবার সাফ চ্যাম্পিয়নশিপেও মূল জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের পাঠায়নি। প্রতিযোগিতার জন্য তারা জাতীয় দলের নিয়মিত খেলোয়াড়দের বাইরে থাকা ফুটবলার ও নতুন প্রতিভাদের নিয়ে দল গঠন করেছে। অন্যদিকে, ফিফার চলতি আন্তর্জাতিক বিরতিতে মূল দল নিয়ে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ খেলার পরিকল্পনা করেছে তারা।
নয়বারের সাফ চ্যাম্পিয়ন ভারতের কাছে আঞ্চলিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের বিষয়টি নতুন নয়। তাই তাদের মনোযোগ এখন আন্তর্জাতিক ফুটবলে অবস্থান উন্নত করার দিকে। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের চেয়ে ৪২ ধাপ এগিয়ে থাকা ভারত এই লক্ষ্য সামনে রেখে নিজেদের প্রস্তুতি সাজাচ্ছে।

শ্রীলঙ্কা ও ভুটানের লক্ষ্যও আরও বড়
শুধু ভারত নয়, তুলনামূলক পিছিয়ে থাকা শ্রীলঙ্কা ও ভুটানের পরিকল্পনাতেও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য গুরুত্ব পাচ্ছে।
শ্রীলঙ্কার কোচ আবদুল্লাহ আল মুতাইরি জানিয়েছেন, সাফ চ্যাম্পিয়ন হলে চুক্তি অনুযায়ী তিনি বড় অঙ্কের বোনাস পাবেন। তারপরও তাঁর প্রধান লক্ষ্য শিরোপা জয় নয়; বরং ২০৩২ সালের এশিয়ান কাপের মূল পর্বে প্রথমবারের মতো শ্রীলঙ্কাকে নিয়ে যাওয়া।
চার বছরের চুক্তির আওতায় এশিয়ান কাপকে কেন্দ্র করেই তিনি পরিকল্পনা সাজিয়েছেন। আসিয়ান কাপে খেলার আমন্ত্রণ পেলেও দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির কথা বিবেচনা করে শ্রীলঙ্কা সেখানে অংশ নেয়নি।
ভুটানের কোচ গ্যারি মাইকেল ফিলিপসও আঞ্চলিক প্রতিযোগিতাকে ভবিষ্যৎ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, সাফ কোনো এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন বা বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব নয়। এটি মূলত আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ।
তবে ভুটানের কাছে এই প্রতিযোগিতার গুরুত্ব রয়েছে। কোচ ফিলিপস নতুন ও উদীয়মান খেলোয়াড়দের যাচাই করার পাশাপাশি পরবর্তী এশিয়ান কাপ ও বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের প্রস্তুতিতে সাফকে কাজে লাগাতে চান।
অর্থাৎ, আঞ্চলিক পর্যায়ে শিরোপার লড়াই থাকলেও ভারত, শ্রীলঙ্কা ও ভুটান নিজেদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় আন্তর্জাতিক ফুটবলকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
বাংলাদেশের ফুটবলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কোথায়?
বাংলাদেশের অবস্থান এখানে কিছুটা ভিন্ন। জাতীয় দলের প্রধান লক্ষ্য এখন সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জয়। কিন্তু আগামী চার-পাঁচ বছরে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে কোথায় পৌঁছাতে চায় বাংলাদেশ? এশিয়ান কাপের মূল পর্বে খেলার কোনো বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা আছে কি? আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশগ্রহণ এবং মানসম্মত খেলোয়াড় তৈরির জন্য বাফুফের দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা কী?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শুধু জাতীয় দলের ফলাফল দেখলে চলবে না। দেশের ফুটবলের সামগ্রিক কাঠামোর দুর্বলতাগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।
দেশের ঘরোয়া লিগের অনিয়মিত সূচি, ক্লাবগুলোর আর্থিক ও প্রশাসনিক সংকট, খেলোয়াড়দের দীর্ঘ সময় প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলের বাইরে থাকা, মানসম্মত একাডেমির অভাব এবং বয়সভিত্তিক ফুটবলের দুর্বলতা বড় বাধা হয়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় তৈরির ধারাবাহিক ব্যবস্থাও গড়ে ওঠেনি।
ফলে জাতীয় দলের জন্য ভালো খেলোয়াড় পাওয়া এবং তাদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার উপযোগী করে তোলার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
গত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে অনুষ্ঠিত প্রথম আসিয়ান কাপেও বাংলাদেশের এই সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়েছে। তুলনামূলক শক্তিশালী মালয়েশিয়ার কাছে ৩-০ এবং সিঙ্গাপুরের কাছে ১-০ গোলে হারের পর ইন্দোনেশিয়ার কাছে ৯-২ গোলের বড় ব্যবধানে পরাজিত হয় বাংলাদেশ।
টুর্নামেন্ট শেষে কোচ থমাস ডুলি স্বীকার করেন, শারীরিক সক্ষমতা, কৌশলগত দক্ষতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং ঘরোয়া লিগের মানের দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ফুটবলে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে।
তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, বাংলাদেশের সমস্যা শুধু জাতীয় দলের কৌশল বা খেলোয়াড় নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে দেশের সামগ্রিক ফুটবল কাঠামোর দুর্বলতাও জড়িত।
সাফ জয় যেন শেষ লক্ষ্য না হয়
২৩ বছর পর সাফ শিরোপা জিততে পারলে বাংলাদেশের ফুটবলে নতুন উদ্দীপনা তৈরি হবে। সমর্থকদের মধ্যে ফিরতে পারে আত্মবিশ্বাস, বাড়তে পারে খেলাটির প্রতি আগ্রহ। কিন্তু একটি আঞ্চলিক শিরোপাকে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের বিকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
ভারত, শ্রীলঙ্কা ও ভুটানের উদাহরণ দেখাচ্ছে, আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় ভালো করার চেষ্টা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বড় লক্ষ্য নির্ধারণ—দুটি কাজ একসঙ্গেই করা সম্ভব।
বাংলাদেশেরও এখন প্রয়োজন এমন একটি বাস্তবসম্মত ফুটবল রোডম্যাপ, যেখানে সাফ জয়ের পাশাপাশি এশিয়ান কাপের যোগ্যতা অর্জন, ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে উন্নতি, বয়সভিত্তিক দল শক্তিশালী করা এবং মানসম্মত ঘরোয়া ফুটবল নিশ্চিত করার লক্ষ্য থাকবে।
শুধু একটি প্রতিযোগিতায় শিরোপা জয়ের পরিকল্পনা দিয়ে দেশের ফুটবলের দীর্ঘদিনের দুরবস্থা কাটানো সম্ভব নয়। সাফ জয় হতে পারে নতুন যাত্রার শুরু, চূড়ান্ত গন্তব্য নয়।
মাঠের সাফল্য ধরে রাখতে হলে বাংলাদেশের ফুটবলে কাঠামোগত পরিবর্তন, নিয়মিত প্রতিযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি খেলোয়াড় উন্নয়ন পরিকল্পনা জরুরি।












