চীনে ফুটবল এখন আর শুধু খেলার মাঠের বিষয় নয়। শহরের মানুষের মধ্যে ঐক্য তৈরি, স্থানীয় পরিচয় তুলে ধরা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরানোর নতুন মাধ্যম হয়ে উঠেছে প্রাদেশিক পর্যায়ের অপেশাদার ফুটবল লিগ। পেশাদার ফুটবলের দুর্নীতি ও হতাশার বিপরীতে এসব প্রতিযোগিতা সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি করেছে নতুন উদ্দীপনা। স্থানীয় দলকে সমর্থন দিতে হাজার হাজার মানুষ মাঠে আসছেন। কেউ পতাকা হাতে, কেউ ঢাকঢোল বাজিয়ে, আবার কেউ প্রিয় দলের স্লোগানে মাতিয়ে তুলছেন পুরো স্টেডিয়াম।
সম্প্রতি চীনের হুনান প্রদেশের ইয়িয়াং শহরে এমনই এক ফুটবল ম্যাচ ঘিরে দেখা যায় উৎসবের পরিবেশ। শরতের এক শীতল সন্ধ্যায় প্রায় ২৬ হাজার দর্শকে পূর্ণ স্টেডিয়ামে প্রবেশ করেন প্রাচীন চীনের কিংবদন্তি সেনাপতি গুয়ান ইউর সাজে এক ব্যক্তি। কালো ঘোড়ায় চড়ে মাঠ প্রদক্ষিণের পর দর্শকদের উল্লাস শুরু হয়। এরপর গ্যালারি থেকে একসঙ্গে ধ্বনি ওঠে, ‘ইয়িয়াংকে জিততেই হবে।’
শেষ পর্যন্ত হুনান প্রদেশের রাজধানী চাংশার শক্তিশালী দলের কাছে ১-০ গোলে হেরে যায় ইয়িয়াং। ম্যাচ শেষে স্থানীয় খেলোয়াড়দের কমলা জার্সি কাদায় মাখা, মোজা ছেঁড়া। পরাজয়ের হতাশায় অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। কিন্তু মাঠের এই হার দর্শকদের উৎসাহে ভাটা ফেলেনি।
চীনে ছড়িয়ে পড়া প্রাদেশিক ফুটবল লিগগুলোর এটাই বিশেষত্ব। খেলোয়াড়দের দক্ষতা সব সময় উঁচু মানের নয়। পাস মিস হয়, গোলের সুযোগ নষ্ট হয়, এমনকি একটি গোলের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করতেও কখনো দীর্ঘ সময় লাগে। কিন্তু দর্শকদের আবেগে কোনো ঘাটতি নেই। স্থানীয়দের রসিকতা, হুনানের ‘শিয়াংচাও’ লিগ নাকি বিশ্বকাপের চেয়েও ভালো।
অর্থনীতির পাশাপাশি মানুষের মনেও প্রভাব
শহরভিত্তিক অপেশাদার ফুটবল প্রতিযোগিতার সূচনা হয় ২০২৫ সালের বসন্তে চীনের জিয়াংসু প্রদেশে। পরে এই উদ্যোগ অনুসরণ করে প্রায় ২০টি প্রদেশে একই ধরনের লিগ চালু হয়।
স্থানীয় প্রশাসন শুরুতে এসব প্রতিযোগিতাকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর উপায় হিসেবে দেখেছিল। তবে সময়ের সঙ্গে এর সামাজিক প্রভাবও স্পষ্ট হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ধীরগতির অর্থনীতি, আবাসন খাতের সংকট এবং কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা মানুষের জন্য ফুটবল হয়ে উঠেছে আনন্দ ও একসঙ্গে সময় কাটানোর উপলক্ষ।
হুনানের ইয়িয়াং শহরের স্টেডিয়ামের বাইরের চিত্র ছিল অনেকটা মেলার মতো। স্থানীয় খাবারের দোকান, মসলাদার স্যুপ, দুর্গন্ধযুক্ত টোফু এবং চা দিয়ে তৈরি বিশেষ পানীয় বিক্রি হচ্ছিল। কোথাও বিনা মূল্যে বিতরণ করা হচ্ছিল স্থানীয় মরিচের আচার। সমর্থকেরা আগে থেকেই এসে ঢোল বাজাচ্ছিলেন, বড় পতাকা ওড়াচ্ছিলেন এবং নিজেদের দলের পক্ষে স্লোগান দিচ্ছিলেন।
প্রতিপক্ষ দলের সমর্থকদের সঙ্গেও ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে খেলা দেখতে আসার পরিবেশ তৈরি করতে বিরতির সময়ের সাংস্কৃতিক পরিবেশনাতেও রাখা হয়েছিল চীনা ঐতিহ্যের ছাপ।
এই আয়োজনের অর্থনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। ইয়িয়াং শহরের আশপাশে আবাসন খাতের মন্দার চিহ্ন স্পষ্ট। বন্ধ রেস্তোরাঁ, অসমাপ্ত ভবন এবং খালি ফ্ল্যাট শহরের অর্থনৈতিক দুরবস্থার কথা মনে করিয়ে দেয়। এমন পরিস্থিতিতে ফুটবল লিগের সঙ্গে যুক্ত উদ্যোক্তারা মনে করছেন, খেলাকে কেন্দ্র করে মানুষের যাতায়াত ও কেনাকাটা বাড়ানো সম্ভব।
এর আগে রাতের বাজার, কনসার্টসহ বিভিন্ন আয়োজনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর চেষ্টা করেছিল স্থানীয় প্রশাসন। কিন্তু ফুটবল তুলনামূলকভাবে বেশি মানুষকে আকৃষ্ট করেছে। স্থানীয় দর্শকদের পাশাপাশি অন্য শহর থেকেও মানুষ খেলা দেখতে আসছেন। ফলে খাবারের দোকান, পরিবহন, হোটেল এবং স্থানীয় পণ্যের বিক্রিতে নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
নিজের শহরের প্রতি টান ফিরছে
এই লিগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্থানীয় পরিচয় ও শহরের প্রতি মানুষের আবেগের পুনর্জাগরণ।
চীনে কয়েক দশক ধরে কাজের সন্ধানে গ্রাম ও ছোট শহর ছেড়ে বড় শহরে যাওয়ার প্রবণতা ছিল। এর ফলে বহু মানুষ নিজেদের জন্মস্থান ও শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। এখন অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর অনেকেই নতুন করে নিজেদের স্থানীয় পরিচয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইছেন।
ফুটবল সেই সুযোগ তৈরি করেছে।
ইয়িয়াংয়ের একটি দোকানের কর্মী ঝাংয়ের ভাষায়, মাঠে খেলতে নামা মানুষগুলো যেন তাঁর নিজের পরিবারের সদস্য। বহু বছর চাংশায় কাজ করলেও তিনি কখনো রাজধানী শহরের দলকে সমর্থন করতে পারেননি। তাঁর মতে, চাংশার সুযোগ-সুবিধা অন্য শহরগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। তাই ইয়িয়াংয়ের জয় তাঁর কাছে নিজের শহরের সম্মানের বিষয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইয়িয়াংয়ের প্রভাবক ঝৌ মেইমেইও স্থানীয় পরিচয়ের এই দিকটি তুলে ধরছেন। তাঁর মতে, অন্য শহরের দর্শকদের স্বাগত জানানোর মাধ্যমে ইয়িয়াং নিজের আতিথেয়তা ও সংস্কৃতি তুলে ধরতে পারছে। তবে প্রতিযোগিতায় জয়ের আকাঙ্ক্ষাও প্রবল। কারণ স্থানীয় মানুষ চান, তাঁদের শহর সম্মান অর্জন করুক।
প্রথম মৌসুমে হুনান লিগে এমন আবেগের একটি বড় উদাহরণ ছিল ইয়ংঝৌ। চাংশার তুলনায় অনেক দরিদ্র এই শহর শেষ পর্যন্ত লড়াই করে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। তাদের সাফল্য দেখিয়েছে, অর্থনৈতিক অবস্থান বা শহরের আকারই সব সময় মানুষের ফুটবল-আবেগ নির্ধারণ করে না।
পেশাদার ফুটবলের বিপরীতে স্বচ্ছ প্রতিযোগিতা
চীনের পেশাদার ফুটবল দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, ম্যাচ পাতানো এবং প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ। দেশটির সুপার লিগের প্রতি অনেক দর্শকের আস্থাও কমেছে।
প্রাদেশিক অপেশাদার লিগগুলো এই জায়গায় ভিন্ন অভিজ্ঞতা দিচ্ছে। এখানে বড় অঙ্কের অর্থের চেয়ে খেলোয়াড় ও সমর্থকদের আবেগ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইয়িয়াংয়ের এক দর্শকের কথায়, এসব খেলায় বড় অর্থ নেই, আছে শুধু জেতার জন্য মানুষের লড়াই।
অনেকে আশা করছেন, তৃণমূল পর্যায়ে ফুটবলের এই জনপ্রিয়তা একসময় জাতীয় দলকেও শক্তিশালী করতে পারে। ২০০২ সালের পর চীন আর বিশ্বকাপের মূল পর্বে উঠতে পারেনি। তবে প্রাদেশিক লিগের খেলোয়াড়েরা জাতীয় পর্যায়ের উন্নয়ন কর্মসূচিতে সরাসরি যুক্ত হওয়ার মতো পর্যায়ে নেই। কারণ জাতীয় দলের খেলোয়াড় তৈরির প্রক্রিয়া অনেক আগে থেকেই শুরু করতে হয়।
তারপরও এসব প্রতিযোগিতা তরুণদের ফুটবলের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে পারে। মাঠে দর্শকের ভিড় এবং স্থানীয় দলের প্রতি মানুষের ভালোবাসা নতুন প্রজন্মকে খেলাটির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার অনুপ্রেরণা দিচ্ছে।
অপেশাদারত্ব ধরে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ
প্রাদেশিক লিগগুলোর জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে আয়োজকেরা কিছু নিয়ম চালু করেছেন। হুনানে প্রতিটি দলের হয়ে যেকোনো সময়ে মাঠে অন্তত তিনজন উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী খেলতে হবে। খেলোয়াড়দের সংশ্লিষ্ট শহরের সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে হবে। এর প্রমাণ হিসেবে স্থানীয় পারিবারিক নিবন্ধন বা বসবাসের পরিচয়পত্রও গ্রহণ করা হয়।
টিকিটের দামও রাখা হয়েছে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে। ইয়িয়াংয়ের ম্যাচে প্রতিটি টিকিটের দাম ছিল মাত্র ৯ দশমিক ৯ ইউয়ান, যা প্রায় দেড় ডলারের সমান। টিকিটের চাহিদা এত বেশি ছিল যে প্রায় ৯০ হাজার মানুষ লটারির মাধ্যমে টিকিট পাওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন। পরে কালোবাজারি ঠেকাতে মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তির প্রবেশব্যবস্থা চালু করা হয়, যাতে মূল টিকিটপ্রাপ্ত ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ সেটি ব্যবহার করতে না পারেন।
তবে এই লিগগুলোর পরিচালনায় স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা বেশ বড়। আমলারা ম্যাচ আয়োজন, বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান যাচাই এবং বাণিজ্যিক চুক্তি পরিচালনা করেন। ফলে প্রতিযোগিতার স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের মাত্রা সীমিত রাখা জরুরি।
এখানেই ভবিষ্যতের ঝুঁকি। চীনের শহরগুলো যেমন বিনিয়োগ আকর্ষণে একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে, তেমনি ফুটবল লিগের অবস্থানকেও শহরের সাফল্য মাপার সূচক হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। কোনো দল পয়েন্ট তালিকার নিচের দিকে থাকলে তা স্থানীয় প্রশাসনের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। তখন ভালো খেলোয়াড় আনা কিংবা প্রশিক্ষণে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের চাপ বাড়বে। এতে অপেশাদার প্রতিযোগিতার মূল চরিত্র বদলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ছোট উদ্যোক্তাদের সামনে বড় প্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগিতা
প্রাদেশিক ফুটবল লিগে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহও বাড়ছে। জিয়াংসু লিগে এখন হাইনেকেন, কোকা-কোলা ও অ্যাডিডাসের মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড পৃষ্ঠপোষক হিসেবে যুক্ত হয়েছে।
অন্যদিকে ইয়িয়াংয়ের প্রধান পৃষ্ঠপোষকদের একজন স্থানীয় শুকনো ছোট মাছ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। ঝাল সস দিয়ে তৈরি এসব মাছের প্যাকেট দর্শকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়েছে। অনেকে পণ্যটির নমুনা সংগ্রহের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীর সঙ্গে ছবি তুলতেও ভিড় করেছেন।
এ ধরনের আয়োজন ছোট স্থানীয় ব্যবসার জন্য বড় সুযোগ তৈরি করছে। ফুটবলকে ঘিরে স্থানীয় খাবার, পানীয় ও পণ্যের পরিচিতি বাড়ছে। শহরের বাইরে থেকেও মানুষ এসব পণ্যের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন।
তবে বড় প্রতিষ্ঠানের প্রবেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতার ধরনও বদলাতে পারে। অর্থের প্রভাব বাড়লে ছোট উদ্যোক্তারা পৃষ্ঠপোষকতার বাজারে পিছিয়ে পড়তে পারেন। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক স্বার্থ ফুটবলের স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দকেও প্রভাবিত করতে পারে।
চীনের প্রাদেশিক ফুটবল লিগের ভবিষ্যৎ তাই শুধু মাঠের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে না। এর সাফল্য নির্ধারণ করবে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ, শহরের প্রতি আবেগ এবং সাধারণ মানুষের জন্য প্রতিযোগিতাটিকে উন্মুক্ত রাখার সক্ষমতা। আপাতত ছোট শহর ও স্থানীয় ব্যবসাগুলো এই ফুটবল জোয়ারে লাভবান হচ্ছে। কিন্তু বড় অর্থের প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে সেই স্বতঃস্ফূর্ত পরিবেশ কতটা অক্ষুণ্ন থাকবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
চীনের এই অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, ফুটবল শুধু জাতীয় গৌরব কিংবা পেশাদার ক্রীড়া ব্যবসার বিষয় নয়। সঠিক পরিবেশ পেলে একটি স্থানীয় খেলা অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে, সামাজিক সম্পর্ক জোরদার করতে এবং মানুষের হারিয়ে যাওয়া শহুরে পরিচয় নতুন করে জাগিয়ে তুলতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
চীনের প্রাদেশিক ফুটবল লিগের এই সাফল্যের পেছনে তাই গোলের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে মানুষের অংশগ্রহণ।












