ইন্টারনেটের সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত সাফল্যগুলোর একটি উইকিপিডিয়া এ বছর ২৫ বছরে পা দিয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই সময়ে অনলাইন বিশ্বকোষটি একাধিক বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। পাঠক ও স্বেচ্ছাসেবী সম্পাদক কমছে, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিরোধের কেন্দ্র হয়ে উঠছে এটি। এর পাশাপাশি এআইয়ের দ্রুত বিস্তারও উইকিপিডিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
পঞ্চদশ শতকে চীনের মিং সাম্রাজ্যের এক সম্রাটের নির্দেশে তৈরি হয়েছিল ইয়ংলে বিশ্বকোষ। প্রায় ২৩ হাজার পাণ্ডুলিপির খণ্ডে লেখা এই গ্রন্থ ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তথ্যভান্ডার। প্রায় ৬০০ বছর ধরে সেই রেকর্ড অক্ষুণ্ন ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় একটি বিশৃঙ্খল অফিস থেকে যাত্রা শুরু করা উইকিপিডিয়া মাত্র ছয় বছরের মধ্যে সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়।
বর্তমানে উইকিপিডিয়ায় ৩০০টির বেশি ভাষায় প্রায় ৩০ বিলিয়ন শব্দের তথ্য রয়েছে। শুধু লাতিন ভাষার সংস্করণেই প্রবন্ধের সংখ্যা এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার চেয়ে বেশি।
মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগে তৈরি এই অনলাইন বিশ্বকোষ এখন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসূত্র। একই সঙ্গে এটি মানুষের জ্ঞান, আগ্রহ, বিশ্বাস ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিরও প্রতিফলন।
একটি বিশ্বকোষের ধারণা থেকে উইকিপিডিয়া
উইকিপিডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা জিমি ওয়েলসের জীবনে বিশ্বকোষের সঙ্গে পরিচয় শুরু হয়েছিল শৈশবে। তাঁর বয়স যখন মাত্র তিন বছর, তখন মা তাঁকে ওয়ার্ল্ড বুক এনসাইক্লোপিডিয়ার একটি সেট কিনে দিয়েছিলেন। ডাকযোগে পাঠানো নতুন স্টিকার দিয়ে পরিবারটি প্রতিবছর বিশ্বকোষটি হালনাগাদ করত।
বড় হয়ে ব্যবসার নতুন ধারণা খুঁজতে গিয়ে ওয়েলস ভাবলেন, অনলাইনে একটি বিশ্বকোষ তৈরি করা গেলে সেটি আর কখনো পুরোনো হয়ে পড়বে না। এই চিন্তা থেকেই সহকর্মী ল্যারি স্যাঙ্গারের সঙ্গে ২০০০ সালে তিনি নুপিডিয়া প্রতিষ্ঠা করেন।
তবে নুপিডিয়ার তথ্য যাচাই ও সম্পাদনার প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত দীর্ঘ। প্রতিটি নিবন্ধ প্রকাশের আগে সাত ধাপের যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হতো। ফলে পাঁচ মাসে তারা মাত্র একটি নিবন্ধ অনুমোদন করতে পেরেছিল। সেটি ছিল সংগীতের একটি বিশেষ ধারা ‘অ্যাটোনালিটি’ নিয়ে।
এত ধীরগতিতে কাজ এগোতে থাকায় ওয়েলস ও স্যাঙ্গার নতুন পথ বেছে নেন। তাঁরা এমন একটি বিশ্বকোষ তৈরির উদ্যোগ নেন, যেখানে সাধারণ মানুষও সরাসরি তথ্য যোগ করতে এবং নিবন্ধ সম্পাদনা করতে পারবেন। এভাবেই জন্ম নেয় উইকিপিডিয়া।
এআইয়ের সামনে অস্তিত্বের প্রশ্ন
উইকিপিডিয়ার ২৫ বছরের যাত্রা যেমন অসাধারণ সাফল্যের গল্প, তেমনি সামনে রয়েছে কঠিন বাস্তবতা। এর পাঠক ও স্বেচ্ছাসেবী সম্পাদক কমে যাওয়ার বিষয়টি বিশেষ উদ্বেগের। কারণ, সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণই এই বিশ্বকোষের প্রধান শক্তি।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মেরুকরণ। কোন তথ্য প্রকাশ করা হবে, কোনো বিষয় কীভাবে উপস্থাপন করা হবে এবং বিতর্কিত ঘটনা সম্পর্কে কোন বক্তব্য গ্রহণযোগ্য হবে—এসব প্রশ্নে উইকিপিডিয়া ক্রমেই বিরোধের কেন্দ্রে চলে আসছে।
সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ হতে পারে এআই। এআই এখন নিজেই বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও উপস্থাপন করতে পারে। ফলে মানুষ তথ্য খুঁজতে আগের মতো সরাসরি উইকিপিডিয়ায় যাবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
অস্ট্রেলীয় সাংবাদিক রিচার্ড কুকের নতুন বই দ্য লাস্ট বেস্ট প্লেস অন দ্য ইন্টারনেট-এ উইকিপিডিয়ার এই সাফল্য ও সংকট বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তাঁর পর্যবেক্ষণ, উইকিপিডিয়া মানুষের হাতে লেখা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকোষ। ভবিষ্যতে এর চেয়ে বড় কোনো বিশ্বকোষ তৈরি হলেও তাতে এআইয়ের সহায়তা থাকবে।
অর্থাৎ, মানুষের সম্মিলিত জ্ঞানের ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি উইকিপিডিয়া হয়তো মানবসভ্যতার হাতে লেখা সবচেয়ে বড় বিশ্বকোষ হিসেবেই থেকে যাবে। তবে তথ্যের জগতে নিজের প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখতে হলে আগামী দিনে তাকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।












