কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বিশ্ব প্রতিযোগিতায় চীন দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। দেশটির প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো একের পর এক উন্নত এআই মডেল তৈরি করছে। তবে এই অগ্রগতির পেছনে কতটা নিজস্ব গবেষণা আর কতটা মার্কিন প্রযুক্তির অনুকরণ—তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, চীনের এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর সাফল্যের একটি বড় অংশ নির্ভর করছে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর তৈরি উন্নত মডেল থেকে শেখার ওপর।
এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘ডিস্টিলেশন’। সহজভাবে বললে, একটি এআই মডেলের তৈরি উত্তর, বিশ্লেষণ ও তথ্য ব্যবহার করে আরেকটি এআই মডেলকে প্রশিক্ষণ দেওয়াই ডিস্টিলেশন। এতে শুরু থেকে দীর্ঘ সময় ধরে প্রশিক্ষণ না দিয়েও তুলনামূলক কম খরচে উন্নত সক্ষমতার মডেল তৈরি করা সম্ভব হয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ব্যয়বহুল এআই মডেল থেকে আয় করতে চায়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য, এআই প্রযুক্তিতে চীনের চেয়ে এগিয়ে থাকা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বলেছেন, যে পক্ষ এআই প্রতিযোগিতায় জিতবে, ভবিষ্যতের নেতৃত্বও তাদের হাতে থাকবে।
কীভাবে কাজ করে ডিস্টিলেশন
সাধারণত বড় ভাষাভিত্তিক এআই মডেলকে প্রথমে ইন্টারনেটে থাকা বিপুল পরিমাণ লেখা থেকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এতে ভাষা বোঝা, তথ্য বিশ্লেষণ এবং উত্তর তৈরির দক্ষতা তৈরি হয়। কিন্তু ডিস্টিলেশন পদ্ধতিতে একটি মডেলকে অন্য একটি উন্নত মডেলের তৈরি উত্তর অনুকরণ করতে শেখানো হয়।
মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নত মডেল জটিল প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, যুক্তি বিশ্লেষণ এবং গাণিতিক সমস্যা সমাধানে যে দক্ষতা অর্জন করেছে, সেগুলো চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য মূল্যবান প্রশিক্ষণ উপকরণ হয়ে উঠছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে প্রশিক্ষণের চ্যালেঞ্জও বাড়ছে। ইন্টারনেটের সহজলভ্য লেখা থেকে শেখার সুযোগ অনেকটাই কাজে লাগানো হয়ে গেছে। ফলে তারা এখন বেশি নির্ভর করছে ‘রিইনফোর্সমেন্ট লার্নিং’ বা শক্তিবর্ধক শিক্ষণ পদ্ধতির ওপর।
এই পদ্ধতিতে একটি মডেলকে নির্দিষ্ট লক্ষ্য দেওয়া হয়। যেমন, জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধান করা। এরপর মডেলটি নিজে বিভিন্ন পদ্ধতি পরীক্ষা করে সঠিক সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করে।
২০২৪ সালের শুরুর দিকে মার্কিন এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর কম্পিউটিং সক্ষমতার মাত্র ২০ ভাগের এক ভাগ এ ধরনের প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হতো। এখন তাদের মোট কম্পিউটিং সক্ষমতার অর্ধেকেরও বেশি এ কাজে ব্যয় হচ্ছে।
চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো এই ব্যয়বহুল প্রশিক্ষণের ফলাফল নিজেদের মডেল তৈরিতে কাজে লাগাতে পারছে। ফলে তাদের মডেলগুলো তুলনামূলক কম সময়ে উন্নত দক্ষতা অর্জন করছে।
কম খরচে দ্রুত উন্নতির উদাহরণ ডিপসিক
চীনা প্রতিষ্ঠান ডিপসিকের একটি গবেষণায় ডিস্টিলেশনের কার্যকারিতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। গবেষণায় প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে শক্তিশালী মডেলের তৈরি আট লাখ উদাহরণ ব্যবহার করে একটি ছোট মডেলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
এরপর জনপ্রিয় একটি গণিত পরীক্ষায় ছোট মডেলটির সাফল্যের হার ১৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৬ শতাংশে পৌঁছায়। চলতি বছরের জুলাইয়ে প্রকাশিত ওই গবেষণা দেখিয়েছে, উন্নত মডেলের তৈরি তথ্য ব্যবহার করে অপেক্ষাকৃত ছোট মডেলের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।
তবে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত এআই মডেলের সমপর্যায়ে যেতে আরও অনেক বেশি প্রশিক্ষণ-তথ্য প্রয়োজন। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো যে ব্যাপক পরিসরে ডিস্টিলেশন করছে, তারও কিছু প্রমাণ পাওয়া গেছে।
গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, পাঁচটি চীনা প্রতিষ্ঠান মাত্র পাঁচ মাসে অ্যানথ্রপিকের এআই মডেল থেকে ১৮ কোটির বেশি বার্তা সংগ্রহ করেছে। চীনের কিছু এআই মডেলের উত্তরের সঙ্গে মার্কিন মডেলগুলোর উত্তরের পরিমাপযোগ্য মিলও পাওয়া গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চীনা মডেল নিজেদের ক্লড বা চ্যাটজিপিটি বলেও পরিচয় দিয়েছে।
নিজস্ব সক্ষমতা থাকলেও সীমাবদ্ধতা চিপে
তবে চীনের এআই অগ্রগতিকে পুরোপুরি মার্কিন প্রযুক্তির অনুকরণ বলে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। দেশটিতে নিজস্ব গবেষণা ও দক্ষ জনশক্তির শক্তিশালী ভিত্তি রয়েছে।
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় এআই গবেষকদের অর্ধেকেরও বেশি চীনা বংশোদ্ভূত। বিশ্বের অন্যতম প্রধান এআই গবেষণা সম্মেলন নিউরআইপিএসে উপস্থাপিত গবেষণাপত্রের ভিত্তিতে এই হিসাব করা হয়েছে।
তবে দক্ষ গবেষক থাকলেই এআই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকা সম্ভব নয়। বর্তমানে উন্নত কম্পিউটার চিপই এআই প্রযুক্তির অগ্রগতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রত্যেকটির হাতে তাদের সব চীনা প্রতিদ্বন্দ্বীর সম্মিলিত সক্ষমতার চেয়েও বেশি উন্নত চিপ রয়েছে।
এই প্রযুক্তিগত ঘাটতি পূরণে ডিস্টিলেশন চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা করছে।
গবেষকদের ধারণা, এআই সক্ষমতার দিক থেকে চীনের সেরা মডেলগুলো এখনো যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ মডেলগুলোর চেয়ে প্রায় তিন থেকে ছয় মাস পিছিয়ে। ডিস্টিলেশন না থাকলে এই ব্যবধান প্রায় দ্বিগুণ হতে পারত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কতটা উদ্বেগের
ডিস্টিলেশনের বিস্তার যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একদিকে বাণিজ্যিক, অন্যদিকে কৌশলগত উদ্বেগ তৈরি করছে। মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল অর্থ ব্যয় করে যে উন্নত মডেল তৈরি করছে, সেগুলোর সক্ষমতা অন্য দেশের প্রতিষ্ঠান কম খরচে নিজেদের মডেলে যুক্ত করতে পারলে তাদের ব্যবসায়িক সুবিধা কমে যেতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ডিস্টিলেশনের কারণে চীন সহজেই যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাবে। কারণ, উন্নত মডেল তৈরি করতে শুধু ভালো প্রশিক্ষণ-তথ্য নয়, বিপুল কম্পিউটিং সক্ষমতা, উন্নত চিপ, গবেষণা এবং নিজস্ব উদ্ভাবনও প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে ডিস্টিলেশন চীনের এআই অগ্রগতিকে দ্রুততর করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত নেতৃত্বের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এই প্রতিযোগিতায় কে এগিয়ে থাকবে, তা নির্ভর করবে শুধু অন্যের তৈরি প্রযুক্তি থেকে শেখার ওপর নয়, বরং কে কত দ্রুত নিজস্ব প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে নতুন সক্ষমতা তৈরি করতে পারে তার ওপর।
এআই প্রযুক্তিতে চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতার নতুন মাত্রা নিয়ে এই প্রতিবেদনটি প্রকাশযোগ্যভাবে সাজানো হয়েছে।












