কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে ঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। ডেটা সেন্টার নির্মাণ, চিপ উৎপাদন এবং কম্পিউটিং সক্ষমতা বাড়াতে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল অর্থ ধার করছে। কিন্তু এ খাতে ঋণের চাপ তৈরি হলে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি থেকে রক্ষা করার কথা যে আর্থিক বিমাব্যবস্থার, সেটি আদৌ কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
এই বিমাব্যবস্থার নাম ক্রেডিট ডিফল্ট সোয়াপ (সিডিএস)। কোনো ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে সিডিএসের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীর ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কথা। ঋণের ঝুঁকি কমাতে কিংবা ঋণখেলাপির আশঙ্কা থেকে মুনাফা করতে এই আর্থিক চুক্তি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বাস্তবে ঋণসংকট দেখা দিলে সিডিএস থেকে ক্ষতিপূরণ পাওয়া সব সময় সহজ হয় না।
এর প্রমাণ মিলেছে অতীতের বিভিন্ন আর্থিক সংকটে। ২০০৭ থেকে ২০০৯ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের সময় সিডিএস ব্যাপক আলোচনায় আসে। পরে ইউরোপের ঋণসংকটেও এই ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সামনে আসে।
২০১১ সালে গ্রিস সরকার ঋণ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিলেও প্রথম দফায় তা সিডিএসের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার শর্ত পূরণ করেনি। পরের বছর অবশ্য চুক্তিগুলো কার্যকর হয়। কিন্তু তত দিনে অনেক বিনিয়োগকারীর আস্থা নষ্ট হয়ে যায়।
২০১৪ সালে পর্তুগালের ব্যাংক এসপিরিতু সান্তোর সংকটেও একই ধরনের বিতর্ক দেখা দেয়। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক দুর্বল ব্যাংকটিকে ভাগ করে দুটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে। আন্তর্জাতিক সোয়াপ ও ডেরিভেটিভস অ্যাসোসিয়েশন সিদ্ধান্ত দেয়, পুরোনো ব্যাংকের সিডিএস চুক্তি তুলনামূলক শক্তিশালী নতুন প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। ফলে পুরোনো ব্যাংকের বন্ডধারীদের অনেকে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েন।
ঋণসংকটে আবার আলোচনায় সিডিএস
অতীতের এসব অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও সিডিএসের বাজার আবার চাঙা হচ্ছে। ফ্রান্সের সরকারি ঋণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় দেশটির পাঁচ বছর মেয়াদি ঋণখেলাপি বিমার খরচ গত ১৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রেও প্রযুক্তি খাতের ঋণঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণে বিপুল বিনিয়োগ করা ক্লাউড কম্পিউটিং প্রতিষ্ঠান ওরাকলের ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে সুরক্ষা কেনার খরচ গত ১২ মাসে চার গুণ হয়েছে।
অর্থাৎ, বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে বাজারে সংশয় তৈরি হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে ঋণের পরিমাণ আরও বাড়তে থাকলে সিডিএসের ওপর নির্ভরশীল বিনিয়োগকারীরাও বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
তবে আগের সংকটগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে সিডিএসের কিছু নিয়মে পরিবর্তন আনা হয়েছে। ২০১৪ সালে চুক্তির শর্ত সংশোধন করে স্পষ্ট করা হয়, ইউরোর পরিবর্তে অন্য মুদ্রায় কোনো দেশের সরকারি ঋণ রূপান্তর করা হলে সেটিও ঋণখেলাপির ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হবে।
একইভাবে, কোনো ঋণগ্রহীতা পুরোনো বন্ড বা দায় জোর করে পরিবর্তন করে ঋণদাতাদের জন্য কম সুবিধাজনক নতুন শর্ত চাপিয়ে দিলে সেটিও সিডিএসের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কারণ হতে পারে।
ঋণ পুনর্গঠনের নতুন কৌশলে জটিলতা
তবে পুরোনো সমস্যার কিছু সমাধান হলেও নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। গত ১২ বছরে আন্তর্জাতিক সোয়াপ ও ডেরিভেটিভস অ্যাসোসিয়েশনের নিয়মে বড় ধরনের পরিবর্তন না এলেও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ পুনর্গঠনের কৌশল অনেক বদলে গেছে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে দেউলিয়া হওয়ার আগেই প্রতিষ্ঠানগুলো জটিল পদ্ধতিতে ঋণ পুনর্বিন্যাস করছে। এসব উদ্যোগকে বলা হয় লায়াবিলিটি ম্যানেজমেন্ট এক্সারসাইজ বা এলএমই। এর মাধ্যমে দীর্ঘ আদালত-প্রক্রিয়ায় না গিয়ে ঋণের শর্ত পরিবর্তন করা হয়।
২০২৪ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রচলিত ঋণখেলাপির ঘটনার চেয়ে এ ধরনের ঋণ পুনর্গঠনের ঘটনা বেশি দেখা যাচ্ছে।
ফলে সিডিএসের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। ২০২৪ সালে ফরাসি টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান অল্টিস ফ্রান্স ঋণ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার পর বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিপূরণ পেতে কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হয়। একই বছরের জুলাইয়ে ইউরোপীয় প্যাকেজিং প্রতিষ্ঠান আরডাগ গ্রুপের ঋণ পুনর্গঠনও সিডিএসধারীদের অনিশ্চয়তায় ফেলে।
প্রথমে মনে হয়েছিল, আরডাগের ঋণ পুনর্গঠন সিডিএসের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার শর্ত পূরণ করবে না। এতে চুক্তিগুলোর বাজারমূল্যও কমে যায়। শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিপূরণ পেলেও দীর্ঘ অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তা সিডিএসের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করে।
এআই খাতের ঋণঝুঁকি আরও জটিল
এআই খাতের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও গভীর হতে পারে। কারণ, এই খাতের অধিকাংশ বড় প্রতিষ্ঠান উত্তর আমেরিকায় অবস্থিত, যেখানে ঋণ পুনর্গঠনের ঘটনা সব সময় সিডিএসের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার শর্তের মধ্যে পড়ে না।
চিপ উৎপাদন, ডেটা সেন্টার নির্মাণ এবং এআই অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো এখন প্রচলিত ব্যাংকঋণের বাইরে নানা জটিল অর্থায়ন পদ্ধতি ব্যবহার করছে।
এসব ঋণের বিপরীতে জামানত হিসেবে রাখা হচ্ছে ডেটা সেন্টারের ভাড়া থেকে ভবিষ্যৎ আয় এবং গ্রাহকদের কাছ থেকে কম্পিউটিং সক্ষমতা সরবরাহের বিনিময়ে পাওয়ার প্রতিশ্রুত অর্থ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নিজেরাই বিপুল ঋণ নিয়ে গ্রাহকদের অর্থায়ন করছে।
এ ধরনের জটিল আর্থিক সম্পর্কের কারণে কোনো প্রতিষ্ঠান সংকটে পড়লে তার ঋণ পুনর্গঠন কীভাবে হবে, তা আগেভাগে বোঝা কঠিন। ফলে সিডিএসের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার বিষয়টিও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
অবশ্য সিডিএসের সমর্থকদের যুক্তি, ঋণখেলাপি হলে এই ব্যবস্থা এখনো সুরক্ষা দিতে পারে। বড় বিনিয়োগকারীদের অনেকেই দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিয়ে এসব চুক্তিতে বিনিয়োগ করেন। সাময়িক বাজার অস্থিরতাও তারা সামাল দিতে পারেন।
কিন্তু এখানেই সিডিএসের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। এই ব্যবস্থা চালুর প্রধান লক্ষ্য ছিল ঋণের ঝুঁকি কমানো এবং ঋণ পরিশোধ বন্ধ হলে নির্দিষ্ট নিয়মে ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা। অথচ এখন ক্ষতিপূরণ পেতে বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘ আইনি লড়াই এবং জটিল ঋণ পুনর্গঠনের হিসাব বুঝতে হচ্ছে।
ফলে সিডিএস আর সাধারণ অর্থে ঋণঝুঁকির বিমা থাকছে না; বরং তা অনেক ক্ষেত্রে বড় বিনিয়োগকারীদের জন্য জটিল ও ব্যয়বহুল ঝুঁকির বাজিতে পরিণত হচ্ছে। এআই খাতে ঋণের চাপ বাড়তে থাকলে এই দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হতে পারে। ঋণসংকটের সময় সুরক্ষা দেওয়ার কথা যে আর্থিক ব্যবস্থার, সেটিই তখন বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
এআই খাতের ঋণঝুঁকি ও ক্রেডিট বিমার কার্যকারিতা নিয়ে বিশ্লেষণ।












