যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে আরব-আমেরিকান ও মুসলিম প্রার্থীদের একাধিক ঐতিহাসিক বিজয় দেশটির রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। মিশিগান থেকে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মিসরীয় বংশোদ্ভূত আবদুল এল-সায়েদ সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর। একই নির্বাচনে অন্তত সাতজন মুসলিম প্রার্থী কংগ্রেসে জয় পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে একজন সিনেটর এবং ছয়জন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য।
গত ৪ নভেম্বর প্রকাশিত দ্য নিউ আরবের এক প্রতিবেদনের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (টিবিএস)।
এবারের নির্বাচনে মুসলিম ও আরব বংশোদ্ভূত প্রার্থীদের জয় এসেছে এমন এক রাজনৈতিক পরিবেশে, যখন নির্বাচনী প্রচারে তাঁদের বিরুদ্ধে ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য ও আক্রমণাত্মক প্রচারণা দেখা গেছে। এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁদের সাফল্য যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী রাজনীতিতে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান প্রতিনিধিত্বের দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।
সিনেটে প্রথম মুসলিম প্রতিনিধি
৪২ বছর বয়সী চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আবদুল এল-সায়েদ মিশিগানের সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করেছেন। নির্বাচনী প্রচারে তিনি স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং রাজনীতিতে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রভাব সীমিত করার প্রতিশ্রুতি দেন।
ইসরায়েল ও মিসরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তারও সমালোচনা করেন তিনি। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের পক্ষ থেকে মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের অভিযোগ তোলা হলে তা প্রত্যাখ্যান করেন এল-সায়েদ।
নিউ জার্সির ১২তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টে রিপাবলিকান গ্রেগ মেলেকে হারিয়ে জয় পেয়েছেন মিসরীয় বংশোদ্ভূত চিকিৎসক আদম হামাওয়ি। এর মধ্য দিয়ে রাজ্যটির ইতিহাসে প্রথম মুসলিম কংগ্রেস সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সাবেক সার্জন হামাওয়ি এর আগে গাজায় স্বেচ্ছাসেবী চিকিৎসক হিসেবে কাজ করেছেন। ইসরায়েলি হামলায় আহত ফিলিস্তিনিদের চিকিৎসা দিয়েছেন তিনি। আহতদের মধ্যে শিশুরাও ছিল।
পঞ্চমবারের মতো জয় রাশিদা ও ইলহানের
মিশিগানের ১২তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে পঞ্চমবারের মতো প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ডেমোক্র্যাট রাশিদা তালাইব। মিনেসোটার পঞ্চম ডিস্ট্রিক্টে পঞ্চম মেয়াদ নিশ্চিত করেছেন সোমালি বংশোদ্ভূত ইলহান ওমর।
গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত এই দুই আইনপ্রণেতা।
নিউইয়র্কের ১৩তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ের। তিনি কংগ্রেসে নির্বাচিত প্রথম লাতিনা মুসলিম নারী।
এ ছাড়া ইন্ডিয়ানার সপ্তম ডিস্ট্রিক্ট থেকে আন্দ্রে কারসন এবং ক্যালিফোর্নিয়ার ১২তম ডিস্ট্রিক্ট থেকে লতিফা সাইমন প্রতিনিধি পরিষদে নিজেদের আসন ধরে রেখেছেন।
রাজ্য আইনসভাতেও আরব ও মুসলিমদের জয়
কংগ্রেসের বাইরেও বিভিন্ন রাজ্যের আইনসভা নির্বাচনে আরব-আমেরিকান ও মুসলিম প্রার্থীরা সাফল্য পেয়েছেন।
নিউইয়র্কের ১২তম স্টেট সিনেট ডিস্ট্রিক্টে জয় পেয়েছেন ফিলিস্তিনি-আমেরিকান সংগঠক আবের কাওয়াস। মিশিগানের দ্বিতীয় স্টেট সিনেট ডিস্ট্রিক্টে নির্বাচিত হয়েছেন লেবানিজ-আমেরিকান ডেমোক্র্যাট আব্বাস আলাউইয়েহ।
ইলিনয়ের ২৬তম স্টেট সিনেট ডিস্ট্রিক্টে রিপাবলিকান প্রার্থী ডারবি হিলসকে হারিয়েছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত মুসলিম ডেমোক্র্যাট নাবিলা সৈয়দ। তাঁর জয়ের ফলে আসনটি রিপাবলিকানদের হাতছাড়া হয়ে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে গেছে।
কলোরাডোর ইমান জোদেহ এবং জর্জিয়ার রুয়া রোমানও রাজ্য আইনসভায় নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করেছেন। টেক্সাসে পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত আইনপ্রণেতা সালমান ভোজানি ও সুলেমান লালানি পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন।
অন্যদিকে ইলিনয় থেকে নির্বাচিত আরব-আমেরিকান রিপাবলিকান ড্যারিন লাহুডও প্রতিনিধি পরিষদে নিজের আসন ধরে রেখেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ও রাজ্য আইনসভায় এসব জয় দেশটির রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে আরব ও মুসলিম বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি আরও বিস্তৃত হওয়ার চিত্র তুলে ধরেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে মুসলিম প্রতিনিধিত্ব: নতুন অধ্যায়
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মুসলিম প্রার্থীদের জয় শুধু কয়েকটি আসন অর্জনের ঘটনা নয়; বরং দেশটির জাতীয় ও রাজ্য পর্যায়ের রাজনীতিতে তাঁদের অংশগ্রহণের বিস্তারেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে সিনেটে প্রথম মুসলিম সদস্য নির্বাচিত হওয়া এই প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক।












