হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ জশুয়া ওংকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির আদালত। চীনের বিরুদ্ধে বিদেশি শক্তির সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগে হংকংয়ের বিতর্কিত জাতীয় নিরাপত্তা আইনে তাঁকে এই সাজা দেওয়া হয়েছে।
৩০ বছর বয়সী ওং ইতিমধ্যে বিভিন্ন আন্দোলন ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে প্রায় ছয় বছর কারাগারে কাটিয়েছেন। আগামী বছরের জানুয়ারিতে তাঁর মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নতুন মামলায় ১০ বছরের কারাদণ্ড হওয়ায় তাঁকে আরও দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকতে হবে। নতুন সাজার দুই মাস দুই দিন আগের সাজার সঙ্গে একসঙ্গে কার্যকর হবে বলে আদালত জানিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার আদালতে রায় ঘোষণার সময় ওংয়ের পরনে ছিল গাঢ় নীল রঙের লম্বা হাতার শার্ট, খাকি প্যান্ট ও কালো ফ্রেমের চশমা। আগের প্রকাশ্য উপস্থিতির তুলনায় তাঁকে বেশ শীর্ণ দেখাচ্ছিল। আদালতকক্ষে উপস্থিত জনতার দিকে মাথা নেড়ে অভিবাদন জানান তিনি। বিচারকের সাজা ঘোষণার যুক্তি শোনার সময় মাঝেমধ্যে নোটও নেন।
রায় শুনতে আদালতের বাইরে বহু মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন আদালতকক্ষে প্রবেশের সুযোগ পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেন। এ সময় আদালত এলাকায় পুলিশের ব্যাপক উপস্থিতি ছিল।
বিদেশি শক্তির সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ
রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, ওং নির্বাসিত গণতন্ত্রপন্থী নেতা নাথান লসহ অন্য কয়েকজন আন্দোলনকর্মীর সঙ্গে মিলে চীনের বিরুদ্ধে বিদেশি নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ আরোপের জন্য আন্তর্জাতিক মহলে তদবির করেছিলেন।
২০২০ সালের জুলাই থেকে নভেম্বরের শেষ ভাগ পর্যন্ত এসব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় বলে আদালতে জানানো হয়েছে।

ওং ও নাথান ল ছিলেন ডেমোসিস্তো নামের একটি বিলুপ্ত গণতন্ত্রপন্থী রাজনৈতিক দলের সহপ্রতিষ্ঠাতা। জাতীয় নিরাপত্তা আইনের আওতায় বিদেশি শক্তির সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগে ওংয়ের বিরুদ্ধে গত বছর নতুন মামলা করা হয়। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি ওই অভিযোগে দোষ স্বীকার করেন।
এর আগে ২০১৯ সালের সরকারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া এবং পুলিশের সদর দপ্তরের বাইরে বিক্ষোভে ভূমিকার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়। ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে কয়েকটি অভিযোগে দোষ স্বীকার করেছিলেন তিনি।
পরবর্তী সময়ে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নিরাপত্তা আইনে রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের অভিযোগে আরও ৪৬ জনের সঙ্গে ওংকেও অভিযুক্ত করা হয়। ৪৭ জনের এই মামলাটি হংকংয়ের জাতীয় নিরাপত্তা আইনের আওতায় সবচেয়ে বড় বিচারিক কার্যক্রম হিসেবে পরিচিত।
কিশোর বয়সেই আন্দোলনে যুক্ত হন ওং
১৯৯৬ সালের অক্টোবরে জন্ম নেওয়া জশুয়া ওংয়ের রাজনৈতিক সক্রিয়তা শুরু হয় কৈশোরে। ছোটবেলায় তাঁর ডিসলেক্সিয়া ধরা পড়ে। এ কারণে পড়াশোনায় কিছুটা সমস্যায় পড়লেও সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে অল্প বয়স থেকেই নিজের অবস্থান প্রকাশ করতেন।
২০১১ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি সহপাঠীদের নিয়ে ‘স্কলারিজম’ নামে একটি গণতন্ত্রপন্থী শিক্ষার্থী সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।
পরের বছর হংকংয়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বাধ্যতামূলক দেশপ্রেমমূলক শিক্ষা চালুর সরকারি পরিকল্পনার বিরুদ্ধে সংগঠনটি বড় আন্দোলন গড়ে তোলে। এতে এক লাখের বেশি মানুষ অংশ নেন। আন্দোলনের মুখে সরকার ওই পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়।
২০১৪ সালে ‘আমব্রেলা মুভমেন্ট’ নামে পরিচিত নাগরিক অবাধ্যতা আন্দোলনে সামনের সারিতে ছিলেন ওং। ওই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তিনি হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।
২০১৬ সালে নাথান ল ও অ্যাগনেস চাউয়ের সঙ্গে মিলে তিনি ডেমোসিস্তো প্রতিষ্ঠা করেন। তবে নিজেকে আন্দোলনের একক নেতা হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন না ওং। ২০১৯ সালে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, আন্দোলনে অনেকেই সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেন এবং নেতৃত্বের ধরন হওয়া উচিত ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া নয়, বরং তৃণমূল থেকে গড়ে ওঠা।

জাতীয় নিরাপত্তা আইনে সংকুচিত হয়েছে রাজনৈতিক পরিসর
২০২০ সালে চীন হংকংয়ে জাতীয় নিরাপত্তা আইন কার্যকর করে। এর আগে ২০১৯ সালে বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে হংকংয়ে ব্যাপক গণতন্ত্রপন্থী বিক্ষোভ হয়েছিল। ওই আন্দোলনের পরই নতুন আইনটি প্রণয়ন করা হয়।
আইনটির সমালোচকদের অভিযোগ, এর বিস্তৃত প্রয়োগের মাধ্যমে রাজনৈতিক বিরোধিতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করা হয়েছে। শত শত আন্দোলনকর্মী ও সাধারণ হংকংবাসী এই আইনের আওতায় গ্রেপ্তার হয়েছেন।
অন্যদিকে হংকং কর্তৃপক্ষের দাবি, শহরের স্থিতিশীলতা রক্ষায় আইনটি প্রয়োজনীয়। তাঁদের বক্তব্য, এই আইনের কারণে হংকংয়ের স্বায়ত্তশাসন দুর্বল হয়নি।
২০২০ সালে জাতীয় নিরাপত্তা আইন কার্যকরের পর ডেমোসিস্তো বিলুপ্ত হয়ে যায়। নাথান ল যুক্তরাজ্যে চলে গিয়ে বিদেশ থেকে আন্দোলন চালিয়ে যান। অন্যদিকে ওং হংকংয়ে থেকে আইনসভা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তা আইনের বিরোধিতার অবস্থানের কারণে কর্তৃপক্ষ তাঁকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করে।
মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এর আগে ওংয়ের বিরুদ্ধে নতুন মামলাকে কর্তৃপক্ষের প্রভাবশালী ভিন্নমতাবলম্বীদের প্রতি ভীতির প্রকাশ হিসেবে উল্লেখ করেছিল। সংস্থাটির মতে, তাঁদের দীর্ঘদিন কারাগারে আটকে রাখতে কর্তৃপক্ষ কত দূর যেতে পারে, এই মামলা তারই ইঙ্গিত।
হংকংয়ে জাতীয় নিরাপত্তা আইনের আওতায় এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কঠোর সাজাটি পেয়েছেন সাবেক গণমাধ্যম ব্যবসায়ী জিমি লাই। বিদেশি শক্তির সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগে তাঁকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
কারাগারে যাওয়ার আগে ২০২০ সালের নভেম্বরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হংকংবাসীর উদ্দেশে লেখা এক বার্তায় ওং বলেছিলেন, হংকংয়ের রাজনীতি নিয়ে তাঁর খুব বেশি আস্থা না থাকলেও সেখানকার মানুষের ওপর তাঁর পূর্ণ বিশ্বাস রয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতার চাপ নাগরিক সমাজের সহনশীলতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেললেও হংকংয়ের মানুষ শেষ পর্যন্ত নিজেদের পথ খুঁজে নেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছিলেন।













