যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর রিপাবলিকান পার্টিকে বড় ধরনের রাজনৈতিক ধাক্কা দিয়েছেন ভোটাররা। মঙ্গলবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পথে এগিয়ে গেছে। নির্বাচনী ফলাফলের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, রিপাবলিকানদের কাছ থেকে অন্তত আটটি আসন ছিনিয়ে নিয়ে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করেছে ডেমোক্র্যাটরা। অন্যদিকে সিনেটে সাতটি রিপাবলিকান আসনে জয় পেয়েছে দলটি, যা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় চারটি আসনের চেয়ে বেশি।
কয়েক কোটি ভোটারের এই রায়কে ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রতি অসন্তোষের প্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্বাচনের আগে জনমত জরিপেও ডেমোক্র্যাটদের ভালো ফলের ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। তবে ফলাফলে তাদের সাফল্যের ব্যাপ্তি প্রত্যাশার চেয়েও বেশি হয়েছে।
অর্থনীতি ও ইরান যুদ্ধের প্রভাব
নির্বাচনে ভোটারদের প্রধান উদ্বেগের জায়গা ছিল দ্রব্যমূল্য, জ্বালানি খরচ এবং জীবনযাত্রার ব্যয়। ট্রাম্প প্রশাসন ডেমোক্র্যাটদের বিপজ্জনক উগ্রপন্থী ও কমিউনিস্ট হিসেবে তুলে ধরে ভোটারদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সেই প্রচারণা প্রত্যাশিত প্রভাব ফেলতে পারেনি।
বরং মুদি পণ্যের দাম, পেট্রল এবং বাড়ির জ্বালানি ব্যয়ের মতো দৈনন্দিন বিষয়গুলো ভোটারদের কাছে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধও রিপাবলিকানদের জন্য বড় নির্বাচনী চাপ তৈরি করেছে। সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের ব্যয় আরও বেড়েছে। বিশেষ করে মেইনের মতো শীতপ্রধান অঙ্গরাজ্যে বাড়ি গরম রাখার জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন, ইরান যুদ্ধ রিপাবলিকান প্রার্থীদের নির্বাচনী ক্ষতির একটি কারণ ছিল। তবে তাঁর দাবি, ভোটাররা ইরান পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাঁর নেওয়া পদক্ষেপের গুরুত্বও বুঝেছেন।
রিপাবলিকান ঘাঁটিতেও ডেমোক্র্যাটদের জয়
ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য শুধু প্রচলিত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনী এলাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। রিপাবলিকানদের শক্তিশালী হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন এলাকাতেও দলটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।
টেক্সাসের সীমান্তবর্তী লাতিনো-অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন বেড়েছে। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এসব এলাকার অনেক ভোটার ট্রাম্পকে সমর্থন করেছিলেন। কানসাসের কৃষিপ্রধান এলাকাতেও একই ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে।
কানসাসের সিওয়ার্ড কাউন্টিতে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিল্টন রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শালের চেয়ে ১৩ পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন। অথচ ২০২৪ সালে ওই কাউন্টিতে ট্রাম্প ৩৯ পয়েন্টের ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন।
এদিকে মেইনে দীর্ঘদিনের রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্সকে হারিয়েছেন ডেমোক্র্যাট ট্রয় জ্যাকসন। ১৯৯৬ সাল থেকে সিনেটে থাকা কলিন্সের পরাজয়কে ডেমোক্র্যাটদের অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। পঞ্চম প্রজন্মের কাঠশিল্পী পরিবারের সন্তান জ্যাকসন নির্বাচনী প্রচারে শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতিকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
টেক্সাসে ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন
সিনেট নির্বাচনে টেক্সাসে ডেমোক্র্যাটদের জয় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। দলটির প্রার্থী জেমস টালারিকো রিপাবলিকান কেন প্যাক্সটনকে পরাজিত করেছেন। এর মধ্য দিয়ে ১৯৮৮ সালের পর প্রথমবার টেক্সাস থেকে কোনো ডেমোক্র্যাট সিনেটে যাওয়ার সুযোগ পেলেন।
জয়ের পর সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে টালারিকো বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা গভীর সমস্যার মধ্যে রয়েছে। তাঁর মতে, ধনকুবেরদের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার কারণে সাধারণ মানুষ নিজেদের বিভেদের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
মুসলিম প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদের জয়
মিশিগানে মিশরীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক আবদুল এল-সাইয়েদের জয়ও নির্বাচনের অন্যতম আলোচিত ঘটনা। ৪২ বছর বয়সী সাবেক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা এল-সাইয়েদ যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম হিসেবে ইতিহাস গড়েছেন।
তাঁর প্রচারণার মূল বিষয় ছিল শ্রমজীবী মানুষের ব্যয় কমানো, স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা এবং সাধারণ পরিবারের অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা। নির্বাচনী প্রচারে তাঁকে বর্ণবাদী ও ইসলামবিদ্বেষী আক্রমণের মুখেও পড়তে হয়েছে। ট্রাম্পসহ কয়েকজন রিপাবলিকান নেতা তাঁর দেশপ্রেম ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।
তাঁর বিরুদ্ধে শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নেওয়া এবং ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলা নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের অভিযোগও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হয়েছিল। তবে রয়টার্সের তথ্য যাচাইয়ে দেখা যায়, শরিয়াহ আইন নিয়ে প্রচারিত ভিডিওতে এল-সাইয়েদ আসলে ওই আইনের বাস্তবায়নের প্রস্তাবের সমালোচনা করেছিলেন। অন্যদিকে স্ট্রিমার হাসান পাইকারের পুরোনো মন্তব্য ভুলভাবে তাঁর নামে প্রচার করা হয়েছিল।
ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া ও নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা
নির্বাচনে পরাজয়ের ধাক্কা স্বীকার করলেও ট্রাম্প ফলাফলকে নিজের বিরুদ্ধে সরাসরি রায় হিসেবে দেখতে রাজি হননি। ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, নির্বাচনের ফল মেনে নিচ্ছেন এবং ডেমোক্র্যাটদের অভিনন্দন জানাচ্ছেন। তবে তাঁর দাবি, তিনি নিজে ব্যালটে না থাকায় রিপাবলিকানরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সিনেটে ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার বলেছেন, প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও দলটি সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে। তাঁর মতে, প্রার্থী বাছাই এবং সাধারণ পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয়কে কেন্দ্র করে প্রচারণা চালানোই সাফল্যের অন্যতম কারণ।
নতুন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলেও ট্রাম্পের ভেটো ক্ষমতা বহাল থাকবে। প্রেসিডেন্টের ভেটো অতিক্রম করতে প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সম্ভাবনা ডেমোক্র্যাটদের নেই।
তবে কৃত্রিমবুদ্ধিমত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যাংকিং, ক্রিপ্টোকারেন্সি, প্রতিরক্ষা ব্যয় এবং সরকারি অর্থনীতি নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর কংগ্রেসের নজরদারি বাড়তে পারে। বিশেষ করে ডেটা সেন্টার নির্মাণ ও কৃত্রিমবুদ্ধিমত্তা খাতের নিয়ন্ত্রণে ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারের ফিউচার সূচকেও পতন দেখা গেছে। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ফিউচার ১ দশমিক ২ শতাংশ এবং নাসডাক ফিউচার ২ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়। প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন রিপাবলিকানরা পড়েছে নতুন রাজনৈতিক চাপে।












