যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন কেবল কংগ্রেসের ক্ষমতার সমীকরণ নির্ধারণ করবে না, দেশটির রাজনীতিতে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের লড়াইয়েরও সূচনা করবে। বিশেষ করে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির জন্য এই নির্বাচন হতে যাচ্ছে নিজেদের রাজনৈতিক আদর্শ, পররাষ্ট্রনীতি এবং আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে অবস্থান নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। ২০২৪ সালে কমলা হ্যারিসের নির্বাচনী পরাজয়ের পর দলটির ভেতরে যে আত্মসমালোচনা শুরু হয়েছিল, আগামী দুই বছরে তা আরও গভীর বিতর্কে রূপ নিতে পারে।
এই বিতর্কের গুরুত্ব শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৯ সালে নতুন কোনো ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব নিলে তাঁকে এমন এক আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, যা স্নায়ুযুদ্ধের সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ সময়ের পর অন্যতম কঠিন। দুর্বল হয়ে পড়া আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, মিত্রদের সঙ্গে আস্থার সংকট, চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব, রাশিয়ার আগ্রাসী অবস্থান এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত—সব মিলিয়ে ওয়াশিংটনের সামনে রয়েছে জটিল কৌশলগত বাস্তবতা।
ডেমোক্র্যাটদের সামনে তাই মূল প্রশ্ন শুধু রিপাবলিকানদের কাছ থেকে ক্ষমতা পুনরুদ্ধার নয়; ক্ষমতায় ফিরলে যুক্তরাষ্ট্রকে কোন পথে পরিচালিত করা হবে, সেটিও আগেভাগে নির্ধারণ করা। দলটির ভেতরে এ নিয়ে দুটি বড় চিন্তাধারা রয়েছে। মধ্যপন্থীরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি পুনর্গঠন, মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার এবং প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর মোকাবিলাই প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। অন্যদিকে প্রগতিশীলরা মনে করেন, সামরিক প্রতিযোগিতার পরিবর্তে বৈশ্বিক সহযোগিতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস এবং জলবায়ু ও প্রযুক্তিগত ঝুঁকি মোকাবিলায় বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
তবে এই বিভাজন নতুন নয়। বরং দুই শিবিরের ভেতরেও এখন গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য তৈরি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ, ইসরায়েল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, চীন এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি নিয়ে এসব বিতর্কের নিষ্পত্তি না হলে ২০২৯ সালে নতুন প্রশাসনের প্রথম বছর নীতিনির্ধারণের পরিবর্তে অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ সামলাতেই কেটে যেতে পারে।
বাইডেনের পর কোন পথে ডেমোক্র্যাটরা
স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর থেকে বিল ক্লিনটন, বারাক ওবামা ও জো বাইডেন—তিন ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্টই কোনো না কোনোভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রীয় ভিত্তি হিসেবে দেখেছেন। কিন্তু বাইডেনের সময় সেই ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার পরিবর্তে বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন কৌশল গ্রহণের প্রবণতাই বেশি দেখা গেছে।
‘আমেরিকা ফিরে এসেছে’ স্লোগান তুলে ক্ষমতায় এলেও বাইডেন মুক্তবাণিজ্য ও বিশ্বায়নের পুরোনো ধারণায় পুরোপুরি ফিরে যাননি। চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, রাশিয়ার আগ্রাসন এবং মহামারির মতো বৈশ্বিক সংকট তাঁকে শিল্পনীতি, সরবরাহব্যবস্থার নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে মনোযোগী করে তোলে। একই সঙ্গে বেইজিং ও মস্কোর বিরুদ্ধে তাঁর প্রশাসন আগের কয়েকটি ডেমোক্র্যাট সরকারের তুলনায় কঠোর অবস্থান নিয়েছিল।
মধ্যপন্থী ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে এখন মূল বিতর্ক হলো, যুক্তরাষ্ট্র কি আগের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা পুনর্গঠন করতে পারবে, নাকি দীর্ঘস্থায়ী ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নতুন কৌশল তৈরি করতে হবে। দুই পক্ষের মধ্যে বিশ্লেষণগত মতপার্থক্য থাকলেও নীতিগত জায়গায় যথেষ্ট মিল রয়েছে। উভয়েই সামরিক সক্ষমতা আধুনিকায়ন, প্রতিরক্ষা শিল্পের ভিত্তি শক্তিশালী করা, মিত্রদের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানো এবং প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী কূটনৈতিক যোগাযোগের পক্ষে।
তবে একটি বাস্তবতা তাঁরা স্বীকার করেন: ২০২৯ সালের যুক্তরাষ্ট্র ২০২১ সালের যুক্তরাষ্ট্রের মতো থাকবে না। ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক আন্দোলন রিপাবলিকান পার্টিতে দীর্ঘদিন প্রভাব বিস্তার করবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা ভবিষ্যতে আবারও পররাষ্ট্রনীতির আকস্মিক পরিবর্তনের আশঙ্কা করবে। কোনো ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট সামরিক শক্তি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন করতে পারলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির স্থায়িত্ব নিয়ে আন্তর্জাতিক আস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।
প্রগতিশীলদের সমালোচনা আরও মৌলিক। তাঁদের মতে, গত ২৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির বড় ব্যর্থতা ছিল বৈশ্বিক আধিপত্য বজায় রাখার চেষ্টা। ওয়াশিংটন যখন নিজের স্বার্থ অনুযায়ী আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ করেছে, তখন নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁদের যুক্তি, আন্তর্জাতিক নিয়ম যদি সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য না হয়, তাহলে সেই ব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
প্রগতিশীলদের একটি বড় অংশ প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক খাতের বৃহৎ করপোরেশনগুলোর প্রভাব নিয়েও উদ্বিগ্ন। তাঁদের মতে, এসব প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ অতিরিক্ত সামরিক ব্যয়, অপ্রয়োজনীয় বিদেশি হস্তক্ষেপ এবং শ্রমজীবী মানুষের পরিবর্তে বহুজাতিক কোম্পানিকে সুবিধা দেওয়া অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করেছে।
তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রকে একক বৈশ্বিক আধিপত্যের পরিবর্তে বহুমেরুকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় সীমিত হলেও কার্যকর ভূমিকা রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন। তাঁদের দৃষ্টিতে জলবায়ু পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অনিয়ন্ত্রিত বিকাশ এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য ভবিষ্যতের বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি। এসব মোকাবিলায় চীনের সঙ্গে সংঘাত বাড়ানোর পরিবর্তে সহযোগিতার পথ খোঁজা প্রয়োজন।
এ ছাড়া প্রগতিশীলদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে অবস্থান করা পররাষ্ট্রনীতির সংযমপন্থীরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক সামরিক প্রতিশ্রুতি অতিরিক্ত বিস্তৃত হয়ে পড়েছে। সব অঞ্চলে প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা দেশটিকে অপ্রয়োজনীয় সংঘাতে জড়িয়ে ফেলছে। তাঁদের প্রস্তাব হলো, জাতীয় স্বার্থের জন্য অপরিহার্য কয়েকটি বিষয়ে মনোযোগ দিয়ে বিদেশে সামরিক উপস্থিতি কমানো এবং কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
ইসরায়েল প্রশ্নে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা
ডেমোক্র্যাটদের পররাষ্ট্রনীতিতে সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসতে পারে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক নীতিতে। গাজা যুদ্ধের সময় ইসরায়েলের ওপর যথেষ্ট চাপ প্রয়োগ করতে না পারার কারণে বাইডেন প্রশাসনের বিরুদ্ধে দলের ভেতরেই তীব্র সমালোচনা তৈরি হয়েছিল। সাবেক প্রশাসনের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাও স্বীকার করেছেন, ইসরায়েলের ওপর আরও কার্যকর চাপ প্রয়োগ করা সম্ভব ছিল।
মধ্যপন্থীদের একটি বড় অংশ এখন মনে করে, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নীতি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে ক্রমেই বিরোধ তৈরি করছে। ইরানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান, গাজায় অতিরিক্ত সামরিক শক্তি প্রয়োগ এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে দুর্বল করার প্রচেষ্টাকে তাঁরা এর উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
এই অবস্থান থেকে মধ্যপন্থীদের কেউ কেউ ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য আরও সক্রিয় মার্কিন উদ্যোগের প্রস্তাব দিচ্ছেন। সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা রহম ইমানুয়েল এমন একটি আঞ্চলিক উদ্যোগের কথা বলেছেন, যেখানে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ওয়াশিংটনের সমর্থনের বিনিময়ে আরব দেশগুলো ইসরায়েলকে পূর্ণাঙ্গ স্বীকৃতি দেবে এবং অঞ্চলজুড়ে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক সম্প্রসারিত হবে।
এ ধরনের উদ্যোগের অংশ হিসেবে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের ভূখণ্ড কার্যত সংযুক্ত করে নেওয়ার প্রচেষ্টা বন্ধ করতে চাপ প্রয়োগ, সহিংস বসতি স্থাপনকারীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং অবৈধ বসতি নির্মাণে অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। এমনকি ইসরায়েলকে বিশেষ প্রতিরক্ষা ভর্তুকি দেওয়ার পরিবর্তে অন্য মিত্রদের মতো নিজেদের অর্থে অস্ত্র কেনার ব্যবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে।
বাইডেনের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার সাবেক ডেপুটি জন ফাইনার আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার পক্ষে। তাঁর মতে, নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকুন বা না থাকুন, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলতে ইসরায়েলের ওপর ধারাবাহিক চাপ বজায় রাখতে হবে। বসতি সম্প্রসারণে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা এবং অস্ত্র বিক্রির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার শর্ত আরোপের বিষয়টিও তিনি সমর্থন করেন।
তবে সব মধ্যপন্থী একই মাত্রায় চাপ প্রয়োগ করতে চান না। কেউ কেউ ইসরায়েলের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক বজায় রাখার গুরুত্বকে বেশি বিবেচনা করেন। তাঁদের মতে, সহিংস বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু বসতি নির্মাণে অর্থায়নকারী ব্যাংকগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের মতো পদক্ষেপ সম্পর্ককে অপ্রয়োজনীয়ভাবে জটিল করতে পারে।
প্রগতিশীলরা মধ্যপন্থীদের এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানালেও তাঁদের অনেকের মনে সংশয় রয়েছে, বাস্তবে ক্ষমতায় গেলে এসব প্রতিশ্রুতি কতটা কার্যকর হবে। তাঁদের মধ্যে আরও কঠোর অবস্থানের সমর্থকও আছেন। কেউ ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র, বিশেষ করে আয়রন ডোম ব্যবস্থার সরবরাহ অব্যাহত রাখার পক্ষে; কেউ আবার নতুন প্রশাসনের প্রথম দিনেই ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি তুলছেন। অন্য একটি অংশ দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানকে অকার্যকর মনে করে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করা একক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণাকে সমর্থন করছে।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি নিয়েও দুই শিবিরের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। মধ্যপন্থীরা সামরিক উপস্থিতি কমাতে চান, কিন্তু অঞ্চলটি থেকে পুরোপুরি সরে যাওয়ার পক্ষে নন। তাঁদের কেউ সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির সম্ভাবনাও বিবেচনা করেন, যদি তা ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়। প্রগতিশীলদের একটি বড় অংশ অবশ্য উপসাগরীয় মিত্রদের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক সীমিত করা এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারের পক্ষে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে নতুন রাজনৈতিক বিভাজন
ডেমোক্র্যাটদের ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এমন একটি বিষয় হয়ে উঠতে পারে, যা প্রচলিত মধ্যপন্থী-প্রগতিশীল বিভাজনকে নতুনভাবে প্রভাবিত করবে।
মধ্যপন্থীদের একটি প্রভাবশালী অংশ মনে করে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা যেমন ব্যাপক, তেমনি এর নিরাপত্তাঝুঁকিও বড়। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র পিছিয়ে পড়লে সামরিক, অর্থনৈতিক ও সাইবার নিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হতে পারে। তাই একদিকে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে, অন্যদিকে উন্নত এআই ব্যবস্থার বিকাশে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
এই গোষ্ঠী চীনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি রপ্তানির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা, মিত্রদের সঙ্গে অভিন্ন নীতিমালা তৈরি এবং উন্নত এআই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কার্যকর নজরদারির পক্ষে। একই সঙ্গে এআই নিরাপত্তা নিয়ে বেইজিংয়ের সঙ্গে আলোচনাও প্রয়োজন বলে তারা মনে করে।
তবে মধ্যপন্থীদের মধ্যেও মতপার্থক্য রয়েছে। বাইডেন প্রশাসনের অর্থ বিভাগ ও বাণিজ্য বিভাগের কিছু কর্মকর্তা মনে করতেন, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ দিয়ে চীনকে দীর্ঘদিন প্রযুক্তিগতভাবে পিছিয়ে রাখা সম্ভব নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব শিল্প ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো বেশি জরুরি। অন্য একটি অংশ দুই দেশের মধ্যে উন্নত এআই মডেলের বিকাশ সীমিত করার বিষয়ে সমঝোতার সম্ভাবনা খুঁজতে চায়।
প্রগতিশীলদের অবস্থানও একরকম নয়। কেউ মনে করেন, এআই নিয়ে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি অতিরঞ্জিত এবং বিদ্যমান আইন দিয়েই ঝুঁকির অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। অন্যরা প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশকে বিপজ্জনক মনে করে নতুন তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ স্থগিত, উন্নত এআই গবেষণায় সাময়িক বিরতি এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণের দাবি তুলছেন।
বার্নি স্যান্ডার্স ও রো খান্নার মতো নেতারা চীনের সঙ্গে একটি বাধ্যতামূলক চুক্তির মাধ্যমে বিপজ্জনক এআই প্রযুক্তির বিকাশ সীমিত করার প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁদের যুক্তিতে, এ ক্ষেত্রে স্নায়ুযুদ্ধের সময় পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে।
এই বিতর্কের বিশেষ গুরুত্ব হলো, এআই নিরাপত্তা কোনো একক দেশের সমস্যা নয়। ভবিষ্যতে সাইবার হামলা, অর্থনৈতিক অস্থিরতা কিংবা প্রযুক্তির ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলার ঝুঁকি বাড়লে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়কেই আলোচনায় বসতে হতে পারে। ফলে ২০২৮ সালের নির্বাচনে এআই প্রশ্নটি শুধু প্রযুক্তি বা অর্থনীতির বিষয় থাকবে না; এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতারও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠবে।
চীন, বাণিজ্য ও জলবায়ু নিয়ে পুরোনো বিরোধ
ডেমোক্র্যাটদের সবচেয়ে পুরোনো ও গুরুত্বপূর্ণ মতবিরোধগুলোর একটি হলো চীনকে ঘিরে। মধ্যপন্থীরা দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান কৌশলগত ও অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করেন। প্রযুক্তি, উৎপাদন ও সামরিক সক্ষমতায় চীনের অগ্রগতি তাঁদের উদ্বিগ্ন করছে। তাই তাঁরা মনে করেন, তাইওয়ানের আত্মরক্ষার সক্ষমতা বাড়ানো, এশীয় মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
তবে তাঁরা সরাসরি সংঘাত চান না। বাইডেন প্রশাসনের অনুসৃত ‘নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা’ নীতির মূল ধারণা ছিল, প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলবে, কিন্তু কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে তা যুদ্ধের পর্যায়ে পৌঁছাতে দেওয়া হবে না। মধ্যপন্থীদের মধ্যে এখন বিতর্ক হচ্ছে, এই নীতিকে আরও শক্তিশালী করা হবে, নাকি অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগের ফলে সংঘাতের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।
প্রগতিশীলরা মনে করেন, চীনকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার প্রবণতা দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস আরও বাড়াচ্ছে। তাঁদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ও এআই নিরাপত্তার মতো বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সহযোগিতা অপরিহার্য। অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর করা এবং উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে উত্তেজনা কমানো সম্ভব।
তবে প্রগতিশীলদের সবাই চীনের প্রতি একই মনোভাব পোষণ করেন না। দলটির নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অনেকে চীনের অন্যায্য বাণিজ্যনীতি, উৎপাদন খাতে আধিপত্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়া নিয়ে মধ্যপন্থীদের মতোই উদ্বিগ্ন। আবার প্রগতিশীল চিন্তাবিদদের একটি অংশ মনে করেন, চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে শিল্পনীতি তৈরি না করে বৈষম্য কমানো, কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন সম্প্রসারণে শিল্পনীতিকে কাজে লাগানো উচিত।
এই মতপার্থক্য বাণিজ্যনীতিতেও প্রভাব ফেলবে। ট্রাম্প প্রশাসনের মিত্র দেশগুলোর ওপর আরোপ করা শুল্ক নতুন ডেমোক্র্যাট প্রশাসন কীভাবে মোকাবিলা করবে, তা নিয়ে এখনো স্পষ্ট ঐকমত্য নেই। কেউ ক্ষমতায় এসেই এসব শুল্ক প্রত্যাহার করতে চান। তাঁদের মতে, শুল্কের বোঝা শেষ পর্যন্ত মার্কিন ভোক্তাদের ওপরই পড়ে। অন্যরা নির্দিষ্ট শিল্প রক্ষায় কিছু শুল্ক বজায় রাখতে চান। আবার একটি অংশ মনে করে, চীনের অতিরিক্ত উৎপাদনক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা মোকাবিলায় ইউরোপসহ মিত্রদের সঙ্গে সমঝোতার অংশ হিসেবে শুল্কনীতি নতুন করে সাজানো উচিত।
জলবায়ু নীতিতেও চীনের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। প্রগতিশীলরা মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় চীনের সঙ্গে সহযোগিতা অপরিহার্য। বৈদ্যুতিক গাড়ি ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তির মতো খাতে চীনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কাজে লাগানো যেতে পারে। মধ্যপন্থীরা অবশ্য চীনের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ানোর ঝুঁকি দেখেন। তাঁরা তুলনামূলকভাবে নির্ভরযোগ্য মিত্রদের নিয়ে পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তির উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার পক্ষে।
জলবায়ু নীতির অগ্রাধিকার নিয়েও দুই শিবিরের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। মধ্যপন্থীরা কর্মসংস্থান, জীবনযাত্রার ব্যয় ও জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে জলবায়ু বিনিয়োগকে যুক্ত করতে চান। কেউ কেউ প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার এবং নতুন জ্বালানি অবকাঠামো নির্মাণের অনুমোদনপ্রক্রিয়া সহজ করার পক্ষেও। প্রগতিশীলরা মনে করেন, শুধু পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ যথেষ্ট নয়; তেল ও গ্যাসের উৎপাদন এবং সরবরাহ কমানোর নীতিও প্রয়োজন।
ক্ষমতায় যাওয়ার আগে সিদ্ধান্ত জরুরি
ডেমোক্র্যাটদের এই বিতর্কের গভীরে রয়েছে একটি মৌলিক রাজনৈতিক প্রশ্ন: আন্তর্জাতিক শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি ও ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে কীভাবে ব্যবহার করা উচিত, নাকি সামরিক আধিপত্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে নিরাপত্তা অর্জনই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে দলটির সামনে আগামী দুই বছর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নির্বাচনে জয়ী হওয়া আর কার্যকর পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন করা এক বিষয় নয়। নির্বাচনের আগে মতপার্থক্য স্পষ্ট না হলে ক্ষমতায় গিয়ে প্রশাসনের ভেতরেই নীতিগত সংঘাত তৈরি হতে পারে।
এর ঐতিহাসিক উদাহরণ রয়েছে জিমি কার্টারের প্রশাসনে। ১৯৭৭ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর কার্টার এমন এক আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে নিক্সন ও কিসিঞ্জার আমলের সমঝোতাভিত্তিক সম্পর্ক ক্রমেই চাপের মুখে পড়ছিল। তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জবিগনিউ ব্রেজিনস্কি সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পক্ষে ছিলেন। অন্যদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইরাস ভ্যান্স কূটনীতি ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। প্রশাসনের ভেতরের এই মতবিরোধ মস্কো নিয়ে একটি সুসংহত নীতি গ্রহণকে বারবার বাধাগ্রস্ত করেছিল।
২০২৯ সালে এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি আরও বড় সংকট তৈরি করতে পারে। তখন যুক্তরাষ্ট্রকে দুর্বল হয়ে পড়া মিত্রজোট, তাইওয়ানের ওপর চীনের বাড়তে থাকা চাপ, প্রতিপক্ষ দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা এবং ইরান ও ইউক্রেনের সম্ভাব্য সংঘাতের মতো বিষয়গুলো মোকাবিলা করতে হতে পারে। আগামী দুই বছরে নতুন সংকটও তৈরি হতে পারে।
তবে ডেমোক্র্যাটদের জন্য ইতিবাচক বিষয় হলো, মধ্যপন্থী ও প্রগতিশীলদের মধ্যে মতপার্থক্যের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য ঐকমত্যও রয়েছে। উভয় পক্ষই যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সক্ষমতা পুনর্গঠন, ন্যাটো ও এশীয় মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা, ইউক্রেনে ন্যায্য শান্তি প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান এবং বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্ব স্বীকার করে। অপ্রয়োজনীয় সামরিক হস্তক্ষেপ এড়িয়ে চলার প্রশ্নেও দুই শিবিরের মধ্যে মিল রয়েছে।
সব বিষয়ে দলীয় ঐকমত্য তৈরি করা সম্ভব নয়, এমনকি তা প্রয়োজনীয়ও নয়। বরং কোন নীতির পক্ষে কারা অবস্থান করছেন, সেই বিতর্ক ভোটারদের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা জরুরি। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন তাই ডেমোক্র্যাটদের জন্য শুধু প্রার্থী বাছাইয়ের প্রতিযোগিতা নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ভূমিকা নতুন করে নির্ধারণের সুযোগ।
প্রকৃত পরীক্ষা হলো, দলটি নির্বাচনের আগেই নিজেদের মতপার্থক্যকে একটি সুসংহত নীতিগত কাঠামোয় আনতে পারে কি না। তা না হলে ২০২৯ সালে হোয়াইট হাউসে নতুন প্রেসিডেন্ট এলেও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি দিকনির্দেশনার বদলে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের মধ্যে আটকে যেতে পারে। আর বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে সেই বিলম্বের মূল্য দিতে হতে পারে শুধু যুক্তরাষ্ট্রকেই নয়, তার মিত্র ও প্রতিদ্বন্দ্বীসহ পুরো বিশ্বকেও।
মতামতের আরও লেখা
প্রবৃদ্ধি আছে, কাজ নেই: বাংলাদেশে দারিদ্র্য বাড়ার অঙ্কটা কোথায় ভুল
নাভি পিল্লাইয়ের নোবেল: শক্তির যুগে ছোট দেশের ভরসা আন্তর্জাতিক আইন
তেলের দাম ১১০ ডলার: উপসাগরের আগুন কীভাবে পৌঁছায় বাংলাদেশের রান্নাঘরে
মিয়ানমারে বড় শক্তির নতুন হিসাব, রোহিঙ্গা প্রশ্নে বাংলাদেশ 







