যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। দলটি কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি দুই বছর কঠিন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে। নতুন সংখ্যাগরিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি ও কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ঘোষণা দিয়েছেন ডেমোক্র্যাট নেতারা।
নির্বাচনের ফলাফলে রিপাবলিকানদের একসময়কার শক্ত ঘাঁটিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে। টেক্সাসসহ কয়েকটি রক্ষণশীল অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাটদের জয় দলটির সাফল্যকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করেছে। ভোটারদের মধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং ট্রাম্পের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে অসন্তোষ এই ফলাফলে বড় ভূমিকা রেখেছে।
সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা
সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা অন্তত ৫৪টি আসন পেয়েছে, যেখানে রিপাবলিকানদের আসন ৪৪টি। প্রতিনিধি পরিষদে দলটি অন্তত ৩০টি আসন বাড়িয়েছে। আলাস্কা ও মিসিসিপির দুটি সিনেট আসনের ফল তখনো চূড়ান্ত হয়নি। ওই দুই আসনেও ডেমোক্র্যাটরা জিতলে সিনেটে তাদের আসনসংখ্যা ৫৬-এ পৌঁছাতে পারে।
২০২৭ সালের জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেসের কার্যক্রম শুরু হলে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্প প্রশাসন, তাঁর পরিবার ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের কর্মকাণ্ড তদন্তের উদ্যোগ নিতে পারে। বড় আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও প্রশাসনের কাছ থেকে ছাড় আদায়ের সুযোগ পাবে তারা। সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় প্রেসিডেন্টের মনোনীত গুরুত্বপূর্ণ পদপ্রার্থীদের অনুমোদন আটকে দেওয়ার ক্ষমতাও থাকবে দলটির। সুপ্রিম কোর্টে কোনো বিচারপতির পদ শূন্য হলে নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রেও এই ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফ্রিস বলেছেন, নতুন সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রধান লক্ষ্য হবে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, প্রতিনিধি পরিষদ আর ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠানের মতো কাজ করবে না।
টেক্সাসসহ রিপাবলিকান ঘাঁটিতে বড় ধাক্কা
নির্বাচনে সবচেয়ে বড় চমক এসেছে টেক্সাসে। কয়েক দশক ধরে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা অঙ্গরাজ্যটিতে ডেমোক্র্যাটরা ১৯৮৮ সালের পর প্রথমবারের মতো সিনেট আসন জিতেছে। একই সঙ্গে তিন মেয়াদের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটকেও হারিয়েছে তারা।
কানসাসে প্রায় এক শতাব্দী পর প্রথমবারের মতো ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। দক্ষিণ ক্যারোলাইনাতেও ট্রাম্পের সমর্থন পাওয়া প্রার্থীকে হারিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প যে অঙ্গরাজ্যে প্রায় ১৮ শতাংশ ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন, সেখানে এই ফল রিপাবলিকানদের জন্য বড় ধাক্কা।
মিশিগানে ডেমোক্র্যাট আবদুল এল-সাইয়েদ সিনেট আসনে জয়ী হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হয়েছেন। জর্জিয়ায় কিশা ল্যান্স বটমস প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী হিসেবে অঙ্গরাজ্যটির গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন। নিউ মেক্সিকোতে ডেব হাল্যান্ড প্রথম আদিবাসী নারী হিসেবে গভর্নর হওয়ার ইতিহাস গড়েছেন।
জীবনযাত্রার ব্যয় ও ইরান যুদ্ধের প্রভাব
নির্বাচনী প্রচারে ডেমোক্র্যাটরা মূল্যস্ফীতি, দুর্নীতি ও ট্রাম্পের নীতির সমালোচনাকে সামনে এনেছিল। তাদের অভিযোগ ছিল, আমদানির ওপর উচ্চ শুল্ক আর ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে সাধারণ মানুষের ব্যয় বেড়েছে। ট্রাম্পের পরিবারের আর্থিক লাভ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিল দলটি।
অন্যদিকে রিপাবলিকানরা ডেমোক্র্যাটদের সামাজিক নীতির সমালোচনা করে তাদের চরমপন্থী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছিল। তবে ভোটের ফল বলছে, সামাজিক ইস্যুর চেয়ে অর্থনৈতিক চাপ ও দৈনন্দিন ব্যয় নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
ট্রাম্প স্বীকার করেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ক্ষতির অন্যতম কারণ। তবে যুদ্ধের সিদ্ধান্তের পক্ষে নিজের অবস্থান বজায় রেখেছেন তিনি। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও পরাজয়ের জন্য যুদ্ধকে দায়ী করেছেন। তাঁর ভাষ্য, এই যুদ্ধের কারণে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানো কতটা যৌক্তিক ছিল, তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে।
ট্রাম্পের প্রথম প্রতিক্রিয়া হোয়াইট হাউসের বলরুম নিয়ে
নির্বাচনে বড় পরাজয়ের পর ট্রাম্পের প্রথম প্রকাশ্য কর্মসূচিতে রাজনৈতিক ফলাফলের চেয়ে হোয়াইট হাউসে নির্মাণাধীন বলরুমই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। সাংবাদিকদের ডেকে তিনি প্রকল্পটির অগ্রগতি দেখান। সমালোচনার জবাবে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতীক হিসেবে হোয়াইট হাউসকে নিখুঁত ও সুন্দর রাখা প্রয়োজন। তাঁর কাছে এ ধরনের কাজ স্বস্তিদায়ক।
নির্বাচন নিয়ে সংক্ষিপ্ত মন্তব্যে ট্রাম্প বলেন, ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করতে তাঁর আপত্তি নেই, তবে তারা বাধা সৃষ্টি করলে তাঁর হাতে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে।
এদিকে প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন জানিয়েছেন, আগামী বছর তিনি আর রিপাবলিকান দলের নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন না। এতে দলটির নেতৃত্বেও পরিবর্তনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব নেওয়ার আগে রিপাবলিকানদের হাতে অবশ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে। ডিসেম্বরের পর কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থায়ন অব্যাহত রাখতে প্রয়োজনীয় বিল পাস করাতে হবে। এই সময়টিতে তারা নিজেদের অগ্রাধিকার বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে পারে। তবে জানুয়ারিতে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে কংগ্রেসের সংঘাত বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের এই জয় ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের রাজনৈতিক ভারসাম্য বদলে দিয়েছে। কংগ্রেসের দুই কক্ষেই বিরোধী দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় আগামী দুই বছর আইন প্রণয়ন, প্রশাসনিক তদন্ত ও গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টকে কঠিন দর-কষাকষির মুখে পড়তে হতে পারে।












