পাকিস্তানে নারী-পুরুষ উভয়ের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর নির্ধারণ করে ২০২৫ সালে আইন সংশোধনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে জাতিসংঘ। তবে দেশটিতে বাল্যবিবাহের উচ্চ হার, ঋণের দায়ে শ্রমিকদের জোরপূর্বক কাজ করানো এবং বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা।
বুধবার পাকিস্তানের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারবিষয়ক দ্বিতীয় পর্যায়ক্রমিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা শেষে এসব বিষয় তুলে ধরে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারবিষয়ক কমিটি।
কমিটির সদস্য ও পাকিস্তানবিষয়ক টাস্কফোর্সের বিশেষজ্ঞ মাইকেল উইন্ডফুর ২০২৫ সালে শিশু বিবাহ নিরোধ আইন, ১৯২৯ সংশোধনের প্রশংসা করেন। সংশোধিত আইনে নারী ও পুরুষ উভয়ের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর করা হয়েছে।
তবে শুধু আইন সংশোধন করলেই বাল্যবিবাহ বন্ধ হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। পাকিস্তানে এখনো বিপুলসংখ্যক শিশু বধূ রয়েছে উল্লেখ করে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে নেওয়া পদক্ষেপগুলো কতটা কার্যকর হয়েছে, সে বিষয়ে তথ্য চান তিনি।
ইটভাটাসহ বিভিন্ন খাতে বন্ধুশ্রম
কমিটির আরেক বিশেষজ্ঞ ও পাকিস্তানবিষয়ক টাস্কফোর্সের সদস্য লাজারি বুজিদ বলেন, পাকিস্তানের কৃষি খাতে এখনো বন্ধুশ্রমের প্রচলন রয়েছে। অনানুষ্ঠানিক খাতের পাশাপাশি ইট তৈরির কাজেও এ ধরনের শ্রমের ব্যবহার দেখা যায়।
তিনি অভিযোগ করেন, ঋণের দায়ে শ্রমিকদের জোর করে কাজ করানোর মাধ্যমে তৈরি ইট নির্মাণ প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি সংস্থাগুলো কিনছে বলে খবর রয়েছে। এ ধরনের শ্রমব্যবস্থা বন্ধে পাকিস্তান সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তা জানতে চান তিনি।
বন্যার পর পুনর্বাসন নিয়ে প্রশ্ন
২০২২ ও ২০২৫ সালের ভয়াবহ বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পাকিস্তান কী পদক্ষেপ নিয়েছে, সে বিষয়েও জানতে চান মাইকেল উইন্ডফুর। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের আবাসন পুনর্নির্মাণ, জমি ও সম্পদে তাদের প্রবেশাধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
জবাবে পাকিস্তানের আইন ও বিচারবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এবং দেশটির প্রতিনিধিদলের প্রধান ব্যারিস্টার আকিল মালিক বলেন, ২০১৭ সাল থেকে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার বাস্তবায়নে বিভিন্ন আইন, নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
তিনি জানান, ইসলামাবাদ, বেলুচিস্তান, পাঞ্জাব ও সিন্ধুতে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী নারী-পুরুষ উভয়ের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব আইনে শিশু বয়সে, অল্প বয়সে ও জোরপূর্বক বিয়ে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
বন্ধুশ্রম প্রসঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিনিধিদল জানায়, দেশটির সংবিধানে দাসত্ব ও সব ধরনের জোরপূর্বক শ্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ১৯৯২ সালের বন্ধুশ্রম ব্যবস্থা বিলোপ আইনেও এ প্রথা বাতিল করা হয়েছে।
প্রতিনিধিদলের তথ্য অনুযায়ী, পাঞ্জাবে দুই লাখ ১০ হাজারের বেশি ইটভাটা শ্রমিকের তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছে। বিভিন্ন জেলায় নজরদারি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। গত বছর শ্রম পরিদর্শকেরা দুই হাজার ৯০০ জনের বেশি জোরপূর্বক শ্রমের শিকার ব্যক্তিকে শনাক্ত করেছেন।
বন্যা পুনর্বাসন প্রসঙ্গে প্রতিনিধিদল জানায়, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর জন্য জাতীয় জরুরি কার্যক্রম কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় বন্যা সুরক্ষা কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। এর লক্ষ্য ঝুঁকিতে থাকা মানুষ, ৮০ লাখ একর কৃষিজমি এবং ২২ লাখ আবাসন সুরক্ষা দেওয়া।
২০২২ সালের বন্যায় পাকিস্তানে ২১ লাখ বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছিল। এর মধ্যে ছয় লাখ বাড়ি পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। বাকি বাড়িগুলোর পুনর্নির্মাণকাজ চলছে বলে জানায় প্রতিনিধিদল।
আইন ও বাস্তবায়নের ব্যবধান
সমাপনী বক্তব্যে পাকিস্তানবিষয়ক টাস্কফোর্সের প্রধান ও কমিটির বিশেষজ্ঞ জুলিয়েতা রসি বলেন, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার বাস্তবায়নে পাকিস্তানের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ এবং দেশটির সামনে থাকা বড় চ্যালেঞ্জগুলো প্রতিনিধিদল তুলে ধরেছে। তবে আইনগত অগ্রগতির সঙ্গে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখনো ব্যবধান রয়েছে।
কমিটির চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণে এসব তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হবে জানিয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন, পাকিস্তান সরকার আন্তরিকতার সঙ্গে সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করবে।
জবাবে আকিল মালিক বলেন, সাংবিধানিক নিশ্চয়তা এবং বাস্তবে অধিকার প্রতিষ্ঠার মধ্যকার ব্যবধান কমাতে কাজ করছে সরকার। বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও প্রথম পর্যালোচনার পর থেকে পাকিস্তান উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
কমিটির সহসভাপতি ও আলোচনার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আশরাফ আলী কনহে পাকিস্তানের প্রতিনিধিদলকে ধন্যবাদ জানান। প্রতিনিধিদলে দেশটির আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়, মানবাধিকার মন্ত্রণালয় এবং জেনেভায় জাতিসংঘ কার্যালয়ে নিযুক্ত স্থায়ী মিশনের প্রতিনিধিরা ছিলেন।












