রমজান সামনে রেখে দেশে ভোজ্যতেলের বাজারে নতুন করে অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে দাম বাড়ানোর পরও বাজারে সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। কোথাও কোথাও পাঁচ লিটারের সয়াবিন তেলের বোতল নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম আরও ১৪ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে ব্যবসায়ীরা। ফলে রমজানের আগে আবারও দাম বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ক্রেতারা।
রাজধানীর বাড্ডা, রামপুরা, মালিবাগ ও শান্তিনগরের বিভিন্ন মুদি দোকান ঘুরে দেখা গেছে, পাঁচ লিটারের সয়াবিন তেলের বোতল সব দোকানে পাওয়া যাচ্ছে না। যেসব দোকানে পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেও নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫ থেকে ২০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। পাঁচ লিটারের বোতলের গায়ে খুচরা মূল্য লেখা রয়েছে ১ হাজার টাকা।
উত্তর বাড্ডার এক ব্যবসায়ী জানান, বাজারে পাঁচ লিটারের বোতলের সরবরাহ কম। পাশাপাশি ডিলার পর্যায়ে খরচ বেড়ে যাওয়ায় খুচরা বিক্রেতাদের লাভও কমেছে। আগে পাঁচ লিটারের একটি বোতল বিক্রি করে ২০ থেকে ২৫ টাকা লাভ হতো। এখন তা কমে ৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ কারণে অনেক দোকানি বড় বোতল বিক্রিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
ব্যবসায়ীদের দাবি, ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী এক ও দুই লিটারের বোতল বেশি রাখছেন তারা। পাঁচ লিটারের বোতলের মজুত সীমিত থাকায় ক্রেতারা চাইলেও অনেক দোকানে তা পাচ্ছেন না।
তবে ক্রেতাদের অভিযোগ, সরবরাহের এই ঘাটতির সুযোগ নিয়ে বেশি দাম নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের খুচরা দাম ২০৪ টাকা। অন্যদিকে পাঁচ লিটারের বোতলের নির্ধারিত দাম ১ হাজার টাকা। অর্থাৎ বড় বোতল কিনলে ক্রেতার ২০ টাকা সাশ্রয় হওয়ার কথা। কিন্তু অনেক দোকানে বড় বোতল পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও পাওয়া গেলেও লিটারপ্রতি ২০৪ টাকা হিসাব করে দাম চাওয়া হচ্ছে।
রামপুরার মহানগর প্রকল্প এলাকার এক ক্রেতা জানান, পাঁচ লিটারের বোতল কিনতে গেলেও অনেক দোকানি নির্ধারিত দামের পরিবর্তে লিটারপ্রতি ২০৪ টাকা হিসাবে দাম নিচ্ছেন। এতে ক্রেতাদের বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে।
শান্তিনগরের আরেক ক্রেতার আশঙ্কা, রমজানের আগে দাম বাড়ানোর চাপ তৈরি করতেই বাজারে সরবরাহ কমিয়ে রাখা হতে পারে। তার মতে, কোনো পণ্যের সংকট দেখা দিলেই ব্যবসায়ীদের একাংশ দাম বাড়ানোর চেষ্টা শুরু করেন।
দাম বাড়ানোর প্রস্তাব ১৪ টাকা
ভোজ্যতেল উৎপাদন ও পরিশোধনকারী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিপণন কর্মকর্তাদের দাবি, প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম ১৪ টাকা বাড়ানোর সুপারিশ করে বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন বাণিজ্য ও শুল্ক কমিশনে চিঠি দিয়েছে।
গত ১৩ অক্টোবর পাঠানো ওই চিঠিতে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়। তবে কমিশন এখনো এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি।
ব্যবসায়ীদের দাবি, গত সেপ্টেম্বরে তারা আরও বেশি দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু সরকার প্রতি লিটারে মাত্র ৫ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। তখন পরবর্তী সময়ে আবার দাম সমন্বয়ের আশ্বাসে তারা ওই সিদ্ধান্ত মেনে নেন।
প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামাল ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রতি লিটার সয়াবিন তেল উৎপাদনে তাদের খরচ ২৩০ টাকার বেশি পড়ছে। অথচ বাজারে বিক্রি করতে হচ্ছে ২০৪ টাকায়। এতে লোকসান হচ্ছে বলে দাবি করছে কোম্পানিগুলো। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহেই তারা দাম বাড়াতে চেয়েছিল। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তাতে সাড়া দেয়নি।
গত ২৮ অক্টোবর এক সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির জানান, রমজানের আগে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। ভোক্তাদের স্বস্তির কথা বিবেচনা করেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কৃত্রিম সংকট তৈরির আশঙ্কা
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, রমজানের বেশ আগেই ভোজ্যতেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা চলছে। সরবরাহে ঘাটতি তৈরি করে দাম বাড়ানোর জন্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হতে পারে।
বাজার অর্থনীতিবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল বায়েস মনে করেন, ব্যবসায়ীদের চাপের মুখে সরকারের নতি স্বীকার করা উচিত নয়। রাষ্ট্রের স্বার্থ বিবেচনায় ভোক্তাদের অধিকার নিশ্চিত করাও জরুরি। সরকার দৃঢ় অবস্থানে থাকলে ব্যবসায়ীদের এই চাপ তৈরির চেষ্টা সফল হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশে বছরে ভোজ্যতেলের চাহিদা প্রায় ২৪ লাখ টন। এর প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। বিপুল পরিমাণ তেল আমদানির ক্ষেত্রে সরকার মূলত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভরশীল। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, এই নির্ভরতার সুযোগ নিয়ে কোনো কোনো ব্যবসায়ী বাজার ও ভোক্তাদের ওপর চাপ তৈরি করতে পারেন।
এদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাজারে ভোজ্যতেলের সংকট তৈরি এবং মজুতদারদের তৎপরতা ঠেকাতে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তেলসহ যেকোনো পণ্য কেনার সময় অতিরিক্ত দাম আদায় বা প্রতারণার শিকার হলে অধিদপ্তরের হটলাইনে অভিযোগ জানানোর আহ্বান জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
রমজানের আগে ভোজ্যতেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং নতুন করে মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, বাজারে সংকট দীর্ঘ হলে তার সরাসরি চাপ পড়বে সাধারণ মানুষের সংসার খরচে।
রমজানের আগে তেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব এবং সরবরাহ পরিস্থিতি—দুই বিষয়ই এখন ক্রেতাদের উদ্বেগের কারণ।
রমজানের আগে ভোজ্যতেলের সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে বাজারে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হতে পারে।












