মালয়েশিয়ার ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ সুবিধা পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ইর. গীতা রেমি ভিনসেন্ট। স্যাটেলাইটের জন্য প্রয়োজনীয় তরঙ্গসম্পদ সংরক্ষণ, নীতিমালা তৈরি এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বয়ের মতো নেপথ্যের কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি পেয়েছেন ২০২৬ সালের ‘উইমেন ইন টেক লিডারশিপ (রেগুলেটরি অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্স)’ পুরস্কার।
মালয়েশিয়ার স্যাটেলাইট যোগাযোগ প্রতিষ্ঠান মিস্যাটের স্পেকট্রাম অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স বিভাগের প্রধান গীতা সম্প্রতি পিআইকেওএম ডিজিটাল এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬-এ এই সম্মাননা পান।
তার মতে, প্রযুক্তি খাতের আলোচনায় সাধারণত নতুন উদ্ভাবন ও দৃশ্যমান সেবাগুলো বেশি গুরুত্ব পায়। কিন্তু এসব সেবা সচল রাখতে তরঙ্গসম্পদ ব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রক নীতিমালা এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সহযোগিতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, তরঙ্গসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রক কার্যক্রম সাধারণত পর্দার আড়ালে পরিচালিত হলেও মানুষের যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখার ক্ষেত্রে এগুলোর ভূমিকা মৌলিক।
নিয়ম মানা থেকে সহযোগিতার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি
গীতার কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে যখন তিনি উপলব্ধি করেন, প্রযুক্তিগত সাফল্য শুধু উদ্ভাবনের ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে নীতিমালা, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং সমাজের প্রয়োজনের সমন্বয়ও জরুরি।
স্যাটেলাইট, তরঙ্গসম্পদ ও যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে নিয়ন্ত্রক কার্যক্রম সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়। আগে যেখানে প্রধান প্রশ্ন ছিল কীভাবে নিয়ম মেনে চলতে হবে, সেখানে পরে গুরুত্ব পেতে শুরু করে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে কীভাবে সহযোগিতা বাড়ানো যায়।
গীতা বলেন, ‘আমরা কীভাবে নিয়ম মেনে চলব’—এই প্রশ্নের পরিবর্তে তিনি ভাবতে শুরু করেন, ‘আমরা কীভাবে একসঙ্গে কাজ করতে পারি।’
এই দৃষ্টিভঙ্গি তার কাজের ধরনেও পরিবর্তন আনে। ব্যবসায়িক লক্ষ্য, জাতীয় ডিজিটাল পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মধ্যে সমন্বয় তৈরিকে তিনি গুরুত্ব দিতে শুরু করেন।
তার মতে, নিয়ন্ত্রক নীতিমালা কেবল প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অনুসরণীয় কিছু নিয়ম নয়; সঠিকভাবে তৈরি হলে এটি নতুন উদ্ভাবন, বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির সুযোগও তৈরি করতে পারে।
স্যাটেলাইট তরঙ্গসম্পদ ও কক্ষপথের নিরাপত্তা
মালয়েশিয়ার স্যাটেলাইট যোগাযোগব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ সংরক্ষণে গীতার অন্যতম অবদান হলো তরঙ্গসম্পদ ও স্যাটেলাইটের কক্ষপথ ব্যবহারের অধিকার সুরক্ষায় নিয়ন্ত্রক কাঠামো এগিয়ে নেওয়া।
আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) বিশ্ব বেতার যোগাযোগ সম্মেলনে মালয়েশিয়ার অবস্থান তৈরিতে সহায়তা করেছেন তিনি। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হলো বর্তমান ও ভবিষ্যতের স্যাটেলাইট কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় তরঙ্গসম্পদ ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করা।
এই সম্পদের ওপর নির্ভর করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়। পাশাপাশি মোবাইল নেটওয়ার্কের বিস্তারে সেলুলার সংযোগের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যাকহল সুবিধা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে নির্ভরযোগ্য যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখতেও স্যাটেলাইট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
গীতার ভাষায়, এসব সম্পদের ব্যবহারের অধিকার নিশ্চিত করা মানে লাখো মানুষের দৈনন্দিন যোগাযোগব্যবস্থার নিরাপত্তা রক্ষা করা। একই সঙ্গে এটি মালয়েশিয়ার ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব ও যোগাযোগব্যবস্থার স্থিতিশীলতা জোরদার করে।
এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলেও নেতৃত্ব
গীতার কাজ শুধু মালয়েশিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ২০১৬ সাল থেকে তিনি এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় টেলিযোগাযোগ কমিউনিটির (এপিটি) স্যাটেলাইট নিয়ন্ত্রক বিষয়ক খসড়া প্রণয়ন দলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
বর্তমানে সংস্থাটির ওয়্যারলেস গ্রুপের অধীনে মহাকাশ, বিমান ও সামুদ্রিক যোগাযোগবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপের নেতৃত্বও দিচ্ছেন তিনি।
এসব দায়িত্বের মাধ্যমে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের মধ্যে নীতিগত আলোচনা, সমঝোতা এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখছেন।
ডিজিটাল বৈষম্য কমানোর লক্ষ্য
গীতার এই স্বীকৃতি এসেছে মিস্যাটের স্যাটেলাইট যোগাযোগে ৩০ বছরের পথচলার সময়। প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়ার যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ডিজিটাল সংযোগ সম্প্রসারণে কাজ করছে।
বিশেষ করে যেসব জনগোষ্ঠী এখনো পর্যাপ্ত যোগাযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত, তাদের কাছে সেবা পৌঁছে দিয়ে ডিজিটাল বৈষম্য কমানো প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম লক্ষ্য।
গীতার পুরস্কার তাই শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়; প্রযুক্তি খাতে তরঙ্গসম্পদ ব্যবস্থাপনা, নীতিনির্ধারণ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো তুলনামূলক কম দৃশ্যমান কাজের গুরুত্বও সামনে নিয়ে এসেছে।












