শীতকালীন সবজির বাম্পার ফলনেও স্বস্তি নেই কৃষকদের। বাজারে ফুলকপি, বাঁধাকপি ও মুলার সরবরাহ বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়েনি চাহিদা। ফলে প্রতিদিনই কমছে পাইকারি দাম। ঠাকুরগাঁওয়ে ফুলকপি বিক্রি করে উৎপাদন খরচ তো দূরের কথা, ফসল তোলার শ্রমিকের মজুরিও তুলতে পারছেন না অনেক কৃষক। অন্যদিকে বগুড়ার মহাস্থানগড়ে মুলার দাম এতটাই কমেছে যে পরিবহন ও শ্রমিকের খরচ না ওঠায় অবিক্রীত সবজি রাস্তায় ফেলে যাচ্ছেন চাষিরা।
কৃষকদের অভিযোগ, খুচরা বাজারে সবজির দাম তুলনামূলক বেশি থাকলেও উৎপাদক পর্যায়ে তার সুফল পাচ্ছেন না তাঁরা। উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত ব্যয় বেড়েছে, অথচ বিক্রির সময় দাম নির্ধারণে কৃষকদের কার্যকর কোনো ভূমিকা নেই।
ঠাকুরগাঁওয়ে মণপ্রতি ফুলকপি মাত্র ৪০০ টাকা
ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন এলাকায় এবার ফুলকপি ও বাঁধাকপির ভালো ফলন হয়েছে। কিন্তু উৎপাদন বেশি হওয়ায় পাইকারি বাজারে দাম নেমে এসেছে। স্থানীয় বাজারে ৪৩ কেজিতে এক মণ ফুলকপি বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৪০০ টাকায়। অর্থাৎ প্রতি কেজির দাম পড়ছে প্রায় ৯ টাকা ৩০ পয়সা।
অথচ কৃষকদের দাবি, খুচরা বাজারে একই ফুলকপি ও বাঁধাকপি প্রতি কেজি ৩০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তাঁদের মতে, উৎপাদক পর্যায়ে প্রতি কেজি অন্তত ১৫ থেকে ২০ টাকা পাওয়া গেলে লোকসানের চাপ কিছুটা কমত।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার বেগুনবাড়ি এলাকার কৃষক মনসুর আলী এবার দুই বিঘা জমিতে ফুলকপি চাষ করেছেন। জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে উৎপাদন পর্যন্ত তাঁর ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। কিন্তু বর্তমান বাজারদরে ফসল বিক্রি করে সর্বোচ্চ ৮০ হাজার টাকার মতো পাওয়ার আশা করছেন তিনি।
মনসুর আলীর ভাষ্য, মণপ্রতি ৪০০ টাকা দামে ফুলকপি বিক্রি করলে শ্রমিকের মজুরিও ওঠে না। আরেক কৃষক শাহাবুদ্দিন জানান, প্রতিদিন ৫০০ টাকা মজুরিতে শ্রমিক নিয়ে জমি থেকে ফুলকপি তুলতে হচ্ছে। কিন্তু বিক্রির দাম এত কম যে ফসল কাটবেন, নাকি জমিতেই রেখে দেবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
সংরক্ষণাগার না থাকায় বিপাকে কৃষক
কৃষকদের মতে, স্থানীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত সংরক্ষণাগার ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প না থাকায় মৌসুমে উৎপাদিত সবজি দ্রুত বিক্রি করতে হয়। একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ সবজি বাজারে আসায় দাম কমে গেলেও অপেক্ষা করে ভালো দামে বিক্রির সুযোগ থাকে না।
ঠাকুরগাঁও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাজেদুল ইসলাম বলেন, অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে আগাম ফুলকপি ও বাঁধাকপির চাষ হয়েছে। একসঙ্গে বেশি সবজি বাজারে আসায় দাম কমেছে। তাঁর আশা, সরবরাহ স্বাভাবিক হলে এবং শীত বাড়লে দাম কিছুটা বাড়তে পারে।
মহাস্থানগড়ে মুলির মণ ২০০ থেকে ৪০০ টাকা
বগুড়ার বৃহত্তম পাইকারি সবজির বাজার মহাস্থানগড়েও শীতকালীন সবজির দাম কমছে। বুধবার সকালে বাজারে প্রতি মণ ফুলকপি বিক্রি হয়েছে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়। প্রতিটি বাঁধাকপির দাম ছিল ১৫ থেকে ২০ টাকা। মুলার মণ বিক্রি হয়েছে মাত্র ২০০ থেকে ৪০০ টাকায়।
এ ছাড়া প্রতি মণ মিষ্টিকুমড়া বিক্রি হয়েছে ১ হাজার টাকায়। প্রতিটি লাউয়ের দাম ছিল ১৫ থেকে ২০ টাকা। শিমের মণ ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা, শসার মণ ১ হাজার টাকা এবং বেগুনের মণ ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। পটোলের মণ ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা, করলার মণ ১ হাজার ৬০০ টাকা এবং কাঁচা মরিচের মণ ১ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। বরবটি প্রতি কেজি ৪০ টাকা এবং ধনেপাতা ১০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
লোকসান এড়াতে পারছেন না মুলাচাষিরা
মহাস্থানগড়ের পাইকারি বাজারের আড়তদার ও কৃষক রহেদুল ইসলাম তিন বিঘা জমিতে মুলা চাষ করেছেন। বাজারে প্রতিদিন দাম কমতে থাকায় এবার তাঁর প্রায় ৩০ হাজার টাকা লোকসান হতে পারে।
মোকামতলা উপজেলার শঙ্করপুর গ্রামের কৃষক জাহেদুর রহমান দুই মণ মুলা বিক্রির জন্য বাজারে এনেছিলেন। কিন্তু দাম এত কম ছিল যে বিক্রির অর্থ দিয়ে ভ্যানভাড়া ও শ্রমিকের মজুরি মেটানো সম্ভব হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত দেড় মণ মুলা বিক্রি করতে পারলেও বাকি মুলার ক্রেতা না পেয়ে সেগুলো রাস্তার পাশে ফেলে যেতে বাধ্য হন।
বগুড়া সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইসমত জাহান বলেন, এবার আলুর দাম কম থাকায় মানুষ তুলনামূলক কম সবজি কিনছেন। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হওয়ায় শীতকালীন সবজির ফলন ভালো হয়েছে। সরবরাহ বৃদ্ধি ও চাহিদা কম থাকার কারণে বাজারে সবজির দাম কমেছে।












