দীর্ঘদিন সুস্থভাবে বাঁচতে নিয়মিত ব্যায়ামের বিকল্প নেই। হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বাড়ানো কিংবা পেশির শক্তি ধরে রাখার গুরুত্ব অনেকেই জানেন। তবে দীর্ঘায়ু ও সুস্থতার ক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় সমান গুরুত্বপূর্ণ—শরীরের ভারসাম্য এবং দ্রুত নড়াচড়ার সক্ষমতা। এমনকি এক পায়ে ৩০ সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকতে পারাও দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার সম্ভাবনার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উঠে এসেছে নতুন এক গবেষণায়।
৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী ১৩ হাজারের বেশি মানুষের ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, ভারসাম্য ও চলাফেরার দক্ষতা দীর্ঘায়ুর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পূর্বাভাস। শুধু হৃদ্যন্ত্রের সক্ষমতা কিংবা পেশির শক্তি নয়, বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরের স্থিতিশীলতা ধরে রাখাও সুস্থ জীবনের জন্য জরুরি।
২০২৬ সালের ১০ আগস্ট জামা নেটওয়ার্ক ওপেন সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণাটিতে বয়স্ক মানুষের শারীরিক সক্ষমতার চারটি দিক পরীক্ষা করা হয়। এগুলো হলো হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসের কর্মক্ষমতা, পেশির শক্তি, শরীরের ভারসাম্য ও ক্ষিপ্রতা এবং নমনীয়তা।
গবেষণায় কী পাওয়া গেল
গবেষণায় অংশ নেন ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী ১৩ হাজার ৪২৩ জন মানুষ, যাঁরা নিজেদের বাড়িতে বা স্বাভাবিক পরিবেশে বসবাস করছিলেন। ২০১৫ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে তাঁদের শারীরিক সক্ষমতা যাচাই করা হয়। পরবর্তী সাত বছর তাঁদের স্বাস্থ্যগত অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হয়। এই সময়ে ১ হাজার ৬৩১ জনের মৃত্যু হয়।
গবেষকেরা কয়েকটি সহজ শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীদের সক্ষমতা পরিমাপ করেন। দুই মিনিট এক জায়গায় দাঁড়িয়ে হাঁটার মাধ্যমে হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসের কর্মক্ষমতা যাচাই করা হয়। ৩০ সেকেন্ডে কতবার হাতের ওজন তোলা যায় এবং কতবার চেয়ার থেকে ওঠা-বসা করা যায়, তা দিয়ে পেশির শক্তি মাপা হয়।
ভারসাম্য যাচাই করা হয় এক পায়ে সর্বোচ্চ ৩০ সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকার পরীক্ষায়। পাশাপাশি চেয়ার থেকে উঠে আট ফুট দূরে গিয়ে ঘুরে আবার ফিরে বসার মাধ্যমে চলাফেরার ক্ষিপ্রতা পরীক্ষা করা হয়। নমনীয়তা যাচাইয়ে পিঠের পেছনে হাত পৌঁছানো এবং বসে পায়ের আঙুলের দিকে হাত বাড়ানোর মতো পরীক্ষাও ছিল।
ফলাফলে দেখা যায়, হৃদ্যন্ত্রের সক্ষমতা, পেশির শক্তি এবং ভারসাম্য ও ক্ষিপ্রতার সম্মিলিত পরীক্ষায় যাঁরা সবচেয়ে ভালো করেছেন, তাঁদের মৃত্যুঝুঁকি সবচেয়ে কম নম্বর পাওয়া ব্যক্তিদের তুলনায় ৬১ শতাংশ কম ছিল।
তবে দীর্ঘায়ুর সঙ্গে সবচেয়ে শক্তিশালী সম্পর্ক পাওয়া গেছে ভারসাম্য ও ক্ষিপ্রতার পরীক্ষায়। এরপর রয়েছে শরীরের নিচের অংশের পেশির শক্তি এবং হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসের কর্মক্ষমতা। অন্যদিকে, নমনীয়তার পরীক্ষার ফলাফলের সঙ্গে আয়ুষ্কালের উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।
বয়স বাড়লে ভারসাম্য কেন জরুরি
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের ভারসাম্য ও চলাফেরার নিয়ন্ত্রণ কমে যেতে পারে। এর ফলে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে পড়ে যাওয়া আঘাত এবং আঘাতজনিত মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ।
পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভেঙে গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এমন আঘাতের পরবর্তী এক বছরের মধ্যে মৃত্যুঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
হার্ভার্ড-সংশ্লিষ্ট ব্রিগহাম অ্যান্ড উইমেনস হাসপাতালের ফিজিক্যাল থেরাপিস্ট ক্রিস্টিনা ডানলিয়ার মতে, ভারসাম্য বাড়ানোর ব্যায়াম সম্পর্কে সচেতনতা বাড়লেও অনেকেই সমস্যা স্পষ্ট হওয়ার আগে এ বিষয়ে গুরুত্ব দেন না। প্রায়ই পড়ে যাওয়া বা চলাফেরায় অস্থিতিশীলতা দেখা দেওয়ার পর মানুষ বিষয়টি নিয়ে ভাবতে শুরু করেন।
সহজ কিছু অভ্যাসেই বাড়তে পারে ভারসাম্য
ভারসাম্য বাড়ানোর জন্য শুরুতেই কঠিন ব্যায়াম করার প্রয়োজন নেই। যাঁরা এক পায়ে দাঁড়াতে পারেন না, তাঁরা প্রথমে দুই পায়ের ওপর ভর সামান্য ডানে-বাঁয়ে স্থানান্তরের অনুশীলন করতে পারেন। শক্ত চেয়ার বা টেবিল ধরে গোড়ালি উঁচু করার ব্যায়ামও সহায়ক হতে পারে।
দৈনন্দিন কাজের মধ্যেও ভারসাম্যের অনুশীলন যুক্ত করা যায়। যেমন দাঁত ব্রাশ করার সময় কিংবা পানি গরম হওয়ার অপেক্ষায় এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করা। তবে প্রয়োজনে ধরে রাখার জন্য পাশে শক্ত কোনো অবলম্বন রাখা জরুরি।
এক পায়ে দাঁড়ানোর অনুশীলনে প্রথমে দুই পা পাশাপাশি রেখে সোজা হয়ে দাঁড়াতে হবে। প্রয়োজন হলে চেয়ার বা টেবিল ধরে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। এরপর ডান হাঁটু ভাঁজ করে পা মেঝে থেকে কয়েক ইঞ্চি ওপরে তুলতে হবে। এভাবে পাঁচ থেকে ৩০ সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকার পর পা নামিয়ে অন্য পায়ে একই অনুশীলন করতে হবে। প্রতিটি পায়ে আরও এক বা দুইবার এটি করা যেতে পারে।
তবে আগে থেকেই ভারসাম্যের সমস্যা থাকলে নিজে নিজে ব্যায়াম শুরু না করে ফিজিক্যাল থেরাপিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
তাই চি, যোগব্যায়াম ও নাচের উপকারিতা
ভারসাম্য, পেশির শক্তি এবং শারীরিক সহনশীলতা বাড়াতে তাই চি বিশেষভাবে কার্যকর। ধীরগতির ছন্দময় নড়াচড়া ও গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের সমন্বয়ে তৈরি এই অনুশীলন বয়স্কদের ভারসাম্য উন্নত করতে সহায়তা করে।
যোগব্যায়াম ও নাচেরও একই ধরনের উপকারিতা রয়েছে। এমনকি নিয়মিত হাঁটা এবং সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামাও শরীরের ভারসাম্য ধরে রাখতে সাহায্য করে।
গবেষকেরা অবশ্য সতর্ক করেছেন, এই ফলাফল থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে এসব পরীক্ষায় ভালো করলেই আয়ু বাড়বে। কারণ অংশগ্রহণকারীদের শারীরিক সক্ষমতা একবারই পরীক্ষা করা হয়েছিল। তা ছাড়া যাঁরা গবেষণায় অংশ নিতে আগ্রহী হয়েছেন, তাঁরা সাধারণ মানুষের তুলনায় আগে থেকেই বেশি সুস্থ হয়ে থাকতে পারেন।
তারপরও গবেষণাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছে—দীর্ঘদিন সুস্থ থাকতে শুধু হৃদ্যন্ত্র ও পেশির যত্ন নিলেই হবে না, শরীরের ভারসাম্য এবং স্বাভাবিকভাবে চলাফেরার ক্ষমতাও ধরে রাখতে হবে।
দীর্ঘায়ু ও সুস্থতার জন্য ভারসাম্য রক্ষার অনুশীলন তাই দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তোলার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।












