সুন্দরবনে বাঘ গণনা হয় ক্যামেরা ফাঁদ আর পায়ের ছাপ মিলিয়ে। ২০২৩-২৪ সালের জরিপে বাংলাদেশের সুন্দরবনে ১২৫টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার (Panthera tigris tigris) পাওয়া গেছে। এর আগের জরিপে সংখ্যা ছিল ১১৪টি।
এই লেখায় জানুন, বাঘ ঠিক কীভাবে গোনা হয়, আগের সংখ্যাগুলো কত ছিল আর এই হিসাব কেন জরুরি।
এক নজরে
- বাঘের সংখ্যা: ১২৫টি (২০২৩-২৪ সালের জরিপ)
- আগের গণনা: ২০১৫ সালে ১০৬টি, ২০১৮ সালে ১১৪টি
- ঘনত্ব: প্রতি ১০০ বর্গকিলোমিটারে গড়ে ২.৬৪টি
- পদ্ধতি: এক হাজারের বেশি ক্যামেরা ও পায়ের ছাপ
- এলাকা: খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা, চার ভাগে ভাগ করে
- ফল ঘোষণা: ২০২৪ সালের অক্টোবরে, পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান
- বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবন: ৬,০১৭ বর্গকিলোমিটার
সুন্দরবনে বাঘ গণনা কীভাবে হয়?
সুন্দরবনের ঘন জঙ্গলে বাঘ চোখে দেখে গোনা প্রায় অসম্ভব। বাঘ একা চলে আর লুকিয়ে থাকতে ভালোবাসে। বনের ভেতরে আছে অসংখ্য খাল, কাদা আর জোয়ারের পানি। তাই বিজ্ঞানীরা ক্যামেরা ফাঁদের ওপর ভরসা করেন।
বাঘের চলাচলের পথে গাছে বা খুঁটিতে ক্যামেরা লাগানো হয়। বাঘ পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে নিজে থেকেই ছবি উঠে যায়। ২০২৩-২৪ সালের জরিপে এক হাজারের বেশি ক্যামেরা বসানো হয়েছিল। কাজ শুরু হয় ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে।
ক্যামেরার পাশাপাশি বনে বাঘের পায়ের ছাপও খুঁজে দেখা হয়। পুরো এলাকাকে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা মিলিয়ে চার ভাগে ভাগ করা হয়েছিল। এতে প্রতিটি অংশ একই নিয়মে দেখা যায়।
ক্যামেরা ফাঁদ কী আর কেন কাজে লাগে?
ক্যামেরা ফাঁদ হলো এমন ক্যামেরা, যা বন্যপ্রাণী পাশ দিয়ে গেলে নিজে থেকে ছবি তোলে। কাছে কোনো মানুষ থাকতে হয় না। তাই লাজুক ও রাতে চলা প্রাণীর ছবিও পাওয়া যায়। বাঘ সাধারণত একা চলে আর রাতেও শিকার করে, কাজেই এই পদ্ধতি তার জন্য বেশ মানানসই।
পায়ের ছাপ থেকেও অনেক তথ্য মেলে। কোন পথে বাঘ চলাচল করে, কোন এলাকায় তার আনাগোনা বেশি, তা বোঝা যায়। ক্যামেরা আর ছাপ মিলিয়ে দেখলে হিসাব আরও শক্ত হয়।
ছবি থেকে বাঘের সংখ্যা কীভাবে ঠিক হয়?
প্রতিটি বাঘের গায়ের ডোরাকাটা দাগ আলাদা, অনেকটা মানুষের আঙুলের ছাপের মতো। বিশেষজ্ঞরা ছবি মিলিয়ে দেখেন কোন ছবিতে কোন বাঘ। একই বাঘ কয়েকটি ক্যামেরায় ধরা পড়লেও তাকে একবারই গোনা হয়। এভাবে আলাদা আলাদা বাঘের তালিকা তৈরি হয়।
শাবকদের মোট সংখ্যায় ধরা হয় না। ২০২৩-২৪ সালের জরিপে বেশ কিছু শাবকের ছবি উঠেছে। কিন্তু শাবকের মৃত্যুহার বেশি বলে তাদের যোগ করা হয়নি।
সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা কত?
২০২৩-২৪ সালের জরিপে বাঘ পাওয়া গেছে ১২৫টি। ফলাফল ঘোষণা করা হয় ২০২৪ সালের অক্টোবরে। ঘোষণা দেন তৎকালীন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
আগের গণনার সঙ্গে মেলালে ছবিটা পরিষ্কার হয়। ২০১৫ সালে বাঘ ছিল ১০৬টি, ২০১৮ সালে ১১৪টি, আর ২০২৩-২৪ সালে ১২৫টি। ২০১৮ সালের চেয়ে ১১টি বেশি, অর্থাৎ প্রায় ৯.৬৫ শতাংশ বৃদ্ধি। ২০১৫ সালের চেয়ে বেশি ১৯টি, যা প্রায় ১৭.৯২ শতাংশ।
ঘনত্বের হিসাবে জরিপ এলাকায় প্রতি ১০০ বর্গকিলোমিটারে গড়ে ২.৬৪টি বাঘ পাওয়া গেছে। ঘনত্ব মানে নির্দিষ্ট এলাকায় গড়ে কতগুলো বাঘ থাকে, সেই হিসাব।
রয়েল বেঙ্গল টাইগার সম্পর্কে দ্রুত কিছু তথ্য
এই বাঘের বৈজ্ঞানিক নাম Panthera tigris tigris। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা আইইউসিএনের হিসাবে এটি বিপন্ন প্রজাতি। বাংলাদেশের জাতীয় পশুও এই বাঘ।
পুরুষ বাঘ লেজসহ প্রায় ৩ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। পুরুষের ওজন সাধারণত ১৮০ থেকে ২৮০ কেজি, আর স্ত্রী বাঘ তার চেয়ে হালকা। বাঘিনী একসঙ্গে দুই থেকে চারটি শাবক দিতে পারে। বাঘ মাংসাশী, আর হরিণ ও বন্য শূকর তার প্রধান শিকার।
সুন্দরবন বাঘের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
বিশ্ব বন্যপ্রাণী তহবিল (ডব্লিউডব্লিউএফ) বলছে, সুন্দরবন পৃথিবীর একমাত্র উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বাঘ আবাস। ইউনেস্কোর বর্ণনায়ও এটি রয়েল বেঙ্গল টাইগারের একমাত্র ম্যানগ্রোভ আবাস।
বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবনের আয়তন ৬,০১৭ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে ৪,৮৩২ বর্গকিলোমিটার বনভূমি আর ১,১৮৫ বর্গকিলোমিটার জলাভূমি। এখানকার বাঘ ভালো সাঁতারও জানে, যা নদী-খালের এই বনে টিকে থাকতে সাহায্য করে।
বাঘ সম্পর্কে মূল তথ্য জানতে পড়তে পারেন আমাদের রয়েল বেঙ্গল টাইগার বিষয়ক লেখা। সুন্দরবনের আরেক বাসিন্দা সম্পর্কে পড়ুন সুন্দরবনের গোখরার জীবন।
বাংলাদেশের জন্য বাঘ গণনা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাঘ খাদ্যশৃঙ্খলের একদম ওপরের শিকারি। তাই বাঘের সংখ্যা ভালো থাকা মানে বনের হরিণ, শূকরসহ পুরো খাদ্যশৃঙ্খল কাজ করছে। জাতীয় পশুর টিকে থাকা তাই পুরো বনের সুস্থতার একটি চিহ্ন।
কত বাঘ আছে না জানলে সংরক্ষণ কাজ করছে কি না বোঝা যায় না। সংখ্যা বাড়লে বোঝা যায় বনরক্ষার কাজ ফল দিচ্ছে। সংখ্যা কমলে আগেভাগে সতর্ক হওয়ার সুযোগ মেলে। তাই সুন্দরবনে বাঘ গণনা শুধু একটি সংখ্যা জানার কাজ নয়, এটি বন রক্ষার পরিকল্পনারও ভিত্তি।
বাঘের বড় হুমকি হলো আবাস হারানো, অবৈধ শিকার আর মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত। এসব নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে নিয়মিত জরিপ করা দরকার। সুন্দরবনের আরেক শিকারি প্রাণী নিয়ে পড়তে পারেন মেছো বিড়ালের জীবন।
সাধারণ প্রশ্ন
সুন্দরবনে কয়টি বাঘ আছে?
২০২৩-২৪ সালের জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশের সুন্দরবনে ১২৫টি বাঘ আছে। এই সংখ্যায় শাবক ধরা হয়নি।
বাঘের দাগ দেখে কি আলাদা বাঘ চেনা যায়?
হ্যাঁ। প্রতিটি বাঘের ডোরাকাটা দাগ আলাদা। বিশেষজ্ঞরা ক্যামেরার ছবি মিলিয়ে একেকটি বাঘ আলাদা করে চেনেন।
শাবক কেন গণনায় ধরা হয় না?
কারণ শাবকের মৃত্যুহার বেশি। বড় হওয়ার আগেই অনেক শাবক বাঁচে না, তাই তাদের যোগ করলে সংখ্যা বাস্তবের চেয়ে বেশি দেখাতে পারে।
আগের জরিপে বাঘের সংখ্যা কত ছিল?
২০১৫ সালে ১০৬টি এবং ২০১৮ সালে ১১৪টি। তারপর ২০২৩-২৪ সালের জরিপে সংখ্যা দাঁড়ায় ১২৫টিতে।
সর্বশেষ হালনাগাদ: ৫ নভেম্বর ২০২৬












