যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধাক্কা খাওয়ার পর প্রশাসনের নীতিতে পরিবর্তনের বদলে আরও কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও অভিবাসনবিরোধী কঠোর নীতির অন্যতম রূপকার স্টিফেন মিলারকে হোয়াইট হাউসের নতুন চিফ অব স্টাফ নিয়োগ দিয়েছেন তিনি। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) ঘোষিত এ সিদ্ধান্ত সোমবার থেকে কার্যকর হবে।
মিলারের এ নিয়োগকে শুধু প্রশাসনিক রদবদল হিসেবে দেখছেন না হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা। তাঁদের মতে, নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পরও ট্রাম্প তাঁর বিতর্কিত নীতিগুলো থেকে সরে আসতে চান না। বরং এসব নীতি বাস্তবায়নে সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও অনুগত সহযোগীদের আরও বেশি ক্ষমতা দিচ্ছেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিলার এমন এক সময়ে হোয়াইট হাউসের প্রধান প্রশাসনিক দায়িত্ব নিচ্ছেন, যখন ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার পথে এবং ট্রাম্প প্রশাসনকে একাধিক তদন্তের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। কংগ্রেসের দুই কক্ষেই বিরোধীদের প্রভাব বাড়লে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে নিজের কর্মসূচি বাস্তবায়নে ট্রাম্পের বাধা বাড়বে। ফলে নির্বাহী ক্ষমতার ওপর তাঁর নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে।
ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিলারকে তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত উপদেষ্টাদের একজন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে বিদায়ী চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলসের কাজের প্রশংসা করেছেন তিনি। তবে নতুন নিয়োগের মধ্য দিয়ে প্রশাসনের রাজনৈতিক ও নীতিগত অবস্থানে আরও আক্রমণাত্মক মনোভাবের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
অভিবাসন নীতির কঠোর রূপকার মিলার
৪১ বছর বয়সী স্টিফেন মিলার ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ থেকেই তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী। দ্বিতীয় মেয়াদে তিনি ওয়াইলসের অধীনে উপপ্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও অভিবাসনসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ নীতি নির্ধারণে তাঁর প্রভাব ছিল ব্যাপক।
ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী কঠোর অভিযান পরিচালনায় মিলার অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন। প্রতিদিন তিন হাজার অভিবাসীকে গ্রেপ্তারের লক্ষ্য নির্ধারণের পেছনেও তাঁর ভূমিকা ছিল। এই লক্ষ্য পূরণ করতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহর ও জনপদে মুখোশধারী অভিবাসন কর্মকর্তাদের অভিযান চালাতে দেখা গেছে।
অভিযানে শুধু অপরাধে জড়িত ব্যক্তিরাই নয়, দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন এমন অনেক অভিবাসীও গ্রেপ্তার হয়েছেন, যাঁদের কোনো অপরাধের রেকর্ড নেই। এ নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
রয়টার্স ও ইপসোসের সাম্প্রতিক জরিপেও অভিবাসন অভিযানের প্রতি জনসমর্থনের ঘাটতি স্পষ্ট। চলতি সপ্তাহের শুরুতে শেষ হওয়া জরিপে মাত্র ৩৬ শতাংশ উত্তরদাতা এ অভিযানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। বিপরীতে ৫৪ শতাংশ এর বিরোধিতা করেছেন।
ডেমোক্র্যাটদের পক্ষ থেকে মিলারের নীতির বিরুদ্ধে তদন্তের প্রস্তুতির কথাও জানানো হয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদের তদারকি ও সরকারি সংস্কারবিষয়ক কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য রবার্ট গার্সিয়া বলেছেন, অভিবাসন নীতি নিয়ে মিলারকে জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে।
নির্বাহী ক্ষমতা বাড়ানোর পক্ষে মিলার
ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ নীতিতে মিলারের প্রভাব শুধু অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ নয়। কেন্দ্রীয় সরকারি কাঠামো পুনর্গঠন, সরকারি কর্মীদের ছাঁটাই, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে প্রশাসনের বিরোধ এবং বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসূচি বন্ধের উদ্যোগেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
ট্রাম্পের প্রথম ও দ্বিতীয় মেয়াদে প্রশাসনের নীতিনির্ধারণে তাঁর ধারাবাহিক উপস্থিতি তাঁকে হোয়াইট হাউসের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একজন করে তুলেছে।
মিলার দীর্ঘদিন ধরে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা বিস্তারের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছেন। মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পর কংগ্রেসে ট্রাম্পের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলে নির্বাহী আদেশ ও প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে তাঁর কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে মিলারের নতুন দায়িত্ব বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ও যোগাযোগ কার্যক্রম নিয়েও অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। জনসমর্থন কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে তিনি প্রশাসনকে আরও আক্রমণাত্মক হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট একজন জানিয়েছেন।
পররাষ্ট্রনীতিতেও কঠোর অবস্থানের সমর্থক
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও মিলার ট্রাম্পের কঠোর অবস্থানের সমর্থক। ক্যারিবীয় অঞ্চল ও প্রশান্ত মহাসাগরে মাদক পরিবহনের সন্দেহে নৌযানগুলোর ওপর মার্কিন সামরিক হামলার পক্ষে তিনি প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। এসব হামলার বৈধতা নিয়ে আন্তর্জাতিক ও আইনগত প্রশ্ন উঠেছে।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলারও সমর্থন জানিয়েছেন তিনি। তেহরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করতে নৌ অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে বলে তাঁর অবস্থান ছিল। তবে ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবের কারণে নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ক্ষতির পরও তিনি একই অবস্থানে রয়েছেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সের চিফ অব স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মার্ক শর্ট মনে করেন, মিলারের নিয়োগের অর্থ হলো ট্রাম্প এমন একজনকে দায়িত্ব দিচ্ছেন, যিনি ব্যক্তিগতভাবে তাঁর প্রতি অত্যন্ত অনুগত এবং কংগ্রেসের সঙ্গে সংঘাতে যেতে প্রস্তুত।
তাঁর মতে, এ নিয়োগের মধ্য দিয়ে কংগ্রেসের সঙ্গে দ্বিদলীয় সমঝোতার ভিত্তিতে আইন প্রণয়নের সম্ভাবনা বাড়ার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে না।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও মিলারের পদোন্নতিকে স্বাগত জানিয়েছেন। ইরান যুদ্ধ নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের অভিশংসনের দাবির মুখে থাকা হেগসেথ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘দেশপ্রেমিকদের হাতে নিয়ন্ত্রণ।’ তাঁর মন্তব্য ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলে মিলারের নিয়োগ নিয়ে সমর্থনের প্রতিফলন।
প্রথম নারী চিফ অব স্টাফের বিদায়
সুসি ওয়াইলসের বিদায়ের মধ্য দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়েরও অবসান ঘটছে। ৬৯ বছর বয়সী ওয়াইলস বৃহস্পতিবার রাতে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত জানান। তিনি হোয়াইট হাউস ছাড়লেও ট্রাম্পের রাজনৈতিক কার্যক্রমে যুক্ত থাকবেন বলে একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে হোয়াইট হাউসের প্রথম নারী চিফ অব স্টাফ ছিলেন ওয়াইলস। কয়েক দশকের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে দায়িত্ব পালন করা এই কর্মকর্তা ট্রাম্পের আগের কয়েকজন শীর্ষ সহযোগীর তুলনায় প্রশাসনে বেশি শৃঙ্খলা ও সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন বলে মনে করা হয়।
ট্রাম্পের অনেক সিদ্ধান্তের সঙ্গে প্রকাশ্যে বিরোধিতা না করলেও প্রশাসনের বিশৃঙ্খল কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। চলতি বছরের শুরুতে প্রাথমিক পর্যায়ের স্তন ক্যানসারের চিকিৎসা নেওয়ার সময়ও তিনি দায়িত্ব পালন অব্যাহত রেখেছিলেন।
তাঁর বিদায়ের পর প্রশাসনের ভেতরে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সমন্বয়ের ক্ষেত্রে কে একই ধরনের ভারসাম্য বজায় রাখবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত চারজন চিফ অব স্টাফ দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এত ঘন ঘন পরিবর্তনকে অস্বাভাবিক হিসেবে দেখা হয়। তাঁদের অনেকেই ট্রাম্পের অনির্দেশ্য সিদ্ধান্ত ও কাজের ধরন নিয়ন্ত্রণে সমস্যায় পড়েছিলেন।
এবার মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয়ের পর মিলারকে চিফ অব স্টাফ করার সিদ্ধান্ত প্রশাসনের ভবিষ্যৎ পথচলা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। কংগ্রেসে বিরোধীদের নিয়ন্ত্রণ, অভিবাসন নীতি নিয়ে তদন্ত এবং পররাষ্ট্রনীতির অর্থনৈতিক প্রভাব—সব মিলিয়ে ট্রাম্পের সামনে রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে সমঝোতার পরিবর্তে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত একজন সহযোগীকে প্রশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি করছে।












