পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব এবং আন্তর্জাতিক জোটের রাজনীতি পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে। চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও তাইওয়ানের সম্পর্ক এখন শুধু একটি দ্বীপের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রশ্ন নয়; বরং এশিয়ার আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য কোন দিকে যাবে, সেটিও এর ওপর নির্ভর করছে। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৭ সালে চীনের সামরিক আধুনিকায়নের নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে তাইওয়ানের ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন।
পশ্চিমা নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের অনেকে দীর্ঘদিন ধরে ২০২৭ সালকে তাইওয়ানকে ঘিরে সম্ভাব্য সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচনা করেছেন। কিন্তু সামরিক সক্ষমতা অর্জন আর সেই সক্ষমতা ব্যবহারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এক বিষয় নয়। বেইজিং কখন শক্তি প্রয়োগ করবে, তা নির্ভর করতে পারে তাইওয়ানের রাজনৈতিক গতিপথ এবং চীনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত হিসাবের ওপর।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে চীনবিষয়ক দায়িত্ব পালন করা সাবেক কর্মকর্তা জোনাথন জিনও মনে করেন, বেইজিংয়ের হিসাব বোঝার জন্য তাইওয়ানের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের দিকে নজর দেওয়া জরুরি। তবে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে আরেকটি দৃষ্টিভঙ্গিও সামনে এসেছে। বেইজিংয়ে দায়িত্ব পালন করা যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক এক নৌ-কূটনীতিকের মতে, দুই দেশ এমন এক নিয়ন্ত্রিত সহাবস্থানের দিকে এগোতে পারে, যেখানে প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু সরাসরি সংঘাত এড়ানোর চেষ্টা চলবে।
এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বড় প্রশ্নটি শুধু তাইওয়ানকে ঘিরে থাকবে না। বরং যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্ভাব্য সমঝোতায় জাপানের অবস্থান কী হবে, সেটিই পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তাকাইচির জাপান ও তাইওয়ান প্রশ্ন
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বে দেশটির নিরাপত্তা নীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানো, সামরিক সক্ষমতা সম্প্রসারণ এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিরাপত্তা অংশীদারত্ব জোরদার করা তাঁর নীতির প্রধান দিক। তাঁর অবস্থান হলো, তাইওয়ান প্রণালিতে সংঘাত শুরু হলে তা জাপানের বাণিজ্যপথ, জ্বালানি সরবরাহ ও জাতীয় নিরাপত্তাকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলবে।
এই অবস্থান সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের কৌশলগত ধারণার ধারাবাহিকতা। আবের মতে, তাইওয়ানকে ঘিরে কোনো জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে তা জাপানের নিরাপত্তার সংকটেও পরিণত হতে পারে।
তাইওয়ানের ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টি তাকাইচির অবস্থানকে ইতিবাচকভাবে দেখে। তাদের কাছে জাপানের সক্রিয় ভূমিকা চীনের চাপ মোকাবিলায় আঞ্চলিক প্রতিরোধব্যবস্থা শক্তিশালী করার সুযোগ। কিন্তু বেইজিং এই নীতিকে ভিন্নভাবে দেখে। চীনের অভিযোগ, জাপান আরও সক্রিয় সামরিক অবস্থান নিচ্ছে এবং তাইওয়ান প্রশ্নে চীনের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস নিয়েও দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে।
তাইওয়ানের নির্বাচন কেন গুরুত্বপূর্ণ
তাইওয়ানের রাজনীতিতে চীনের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে গভীর বিভাজন রয়েছে। কুওমিনতাং দলের রক্ষণশীল ‘ডিপ ব্লু’ অংশ চীনের সঙ্গে সংলাপ, সাংস্কৃতিক সম্পর্ক এবং দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতার পক্ষে। তাদের আশঙ্কা, তাইওয়ানকে বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখসারিতে পরিণত করলে দ্বীপটির নিরাপত্তা আরও ঝুঁকিপূর্ণ হবে।
অন্যদিকে, তাকাইচির সমর্থকদের যুক্তি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার না করলে চীনের চাপ মোকাবিলা করা কঠিন হবে। ফলে তাইওয়ানের সামনে দুটি ভিন্ন কৌশলগত পথ রয়েছে—বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা অথবা আঞ্চলিক নিরাপত্তা অংশীদারত্বের মাধ্যমে চীনের ওপর চাপ মোকাবিলা।
কুওমিনতাংয়ের নেতৃত্বে চেং লি-ওয়েনের উত্থান এই সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। চীনের সঙ্গে সংলাপ ও যোগাযোগ বাড়ানোর তাঁর আগ্রহ বেইজিংয়ে এমন প্রত্যাশা তৈরি করেছে যে, তাইওয়ানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভবিষ্যতে চীনের অনুকূলে যেতে পারে। তবে তাইওয়ানে সরাসরি চীনপন্থী নীতির সমর্থন সীমিত এবং কুওমিনতাংয়ের মধ্যেও মতপার্থক্য রয়েছে। ফলে বেইজিংয়ের প্রত্যাশা কতটা বাস্তবসম্মত, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
২০২৮ সালের নির্বাচনে কুওমিনতাং জয়ী হলে চীনের ধৈর্য, রাজনৈতিক চাপ ও অর্থনৈতিক যোগাযোগের কৌশল সফল হয়েছে বলে মনে হতে পারে। বিপরীতে, ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টি টানা চতুর্থবার ক্ষমতায় এলে বেইজিংয়ের নেতৃত্ব মনে করতে পারে, দীর্ঘদিনের চাপ প্রয়োগেও তাইওয়ানের রাজনৈতিক অবস্থান বদলানো সম্ভব হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্র-চীন সমঝোতায় জাপানের জায়গা কোথায়
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নিয়ন্ত্রিত সহাবস্থানের সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হলে জাপানের অবস্থান নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। সাবেক মার্কিন নৌ-কূটনীতিকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক এমন এক পর্যায়ে যেতে পারে, যেখানে দুই দেশ নিজেদের অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার পার্থক্য বজায় রেখেও সরাসরি সংঘাত এড়ানোর চেষ্টা করবে।
এই সম্ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতা চালিয়ে গেলেও চীন স্থিতিশীল সম্পর্কের কিছু ক্ষেত্র তৈরি করতে চাইতে পারে। একইভাবে, যুক্তরাষ্ট্রও চীনের সঙ্গে বিরোধের সব ক্ষেত্রকে সামরিক সংঘাতে পরিণত করতে আগ্রহী নাও হতে পারে।
কিন্তু তাকাইচির জাপান তাইওয়ানের নিরাপত্তাকে নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের কেন্দ্রীয় অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে। ফলে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে কোনো সমঝোতা হলে টোকিওর কৌশলগত অবস্থান তার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে চীনের শিয়াংশান ফোরামে এই মতপার্থক্যের প্রতিফলন দেখা যায়। জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইউকিও হাতোয়ামা তাকাইচির তাইওয়ানসংক্রান্ত বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, এতে চীন-জাপান সম্পর্কের অবনতি হয়েছে এবং ১৯৭২ সালের যৌথ ইশতেহার ও এক চীন নীতির প্রতি জাপানের অঙ্গীকার নিয়ে বেইজিংয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাঁর অবস্থান থেকে স্পষ্ট, জাপানের ভেতরেও তাইওয়ানকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার কেন্দ্র হিসেবে দেখার বিষয়ে ঐকমত্য নেই।
সংঘাতের চেয়ে বিপজ্জনক হতে পারে দীর্ঘস্থায়ী চাপ
২০২৮ সালের নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টি আবার জয়ী হলে চীন সরাসরি সামরিক অভিযান শুরু করবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ভিত্তি নেই। তবে বেইজিংয়ের চাপ প্রয়োগের কৌশল আরও কঠোর হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল স্যামুয়েল পাপারো ২০২৫ সালের হোনলুলু প্রতিরক্ষা ফোরামে সতর্ক করেছিলেন, তাইওয়ানের আশপাশে চীনের সামরিক তৎপরতাকে কেবল মহড়া হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এগুলো সম্ভাব্য জোরপূর্বক একীভূতকরণের প্রস্তুতির অংশ।
তবে চীনের জন্য সরাসরি আক্রমণ মানে বড় সামরিক ও কূটনৈতিক ঝুঁকি নেওয়া। সে কারণে যুদ্ধ শুরু না করেও তাইওয়ানের ওপর চাপ বাড়ানোর পথ বেছে নিতে পারে বেইজিং। সমুদ্রপথে চলাচলে বিধিনিষেধ, জাহাজ পরিদর্শন, পরিবহনব্যবস্থা বিঘ্নিত করা, অর্থনৈতিক চাপ এবং সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর মতো পদক্ষেপের মাধ্যমে দ্বীপটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হতে পারে।

এ ধরনের পদক্ষেপের বিপদ হলো, এগুলো একবারে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু না করলেও ধীরে ধীরে উত্তেজনা বাড়াতে পারে। প্রতিটি নতুন বিধিনিষেধ বা পাল্টা প্রতিক্রিয়া ভুল হিসাবের ঝুঁকি তৈরি করবে। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও তাদের আঞ্চলিক অংশীদারদের জন্য তাইওয়ানের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী চাপের মোকাবিলা করাও বড় নিরাপত্তা পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে।
২০২৮ সালেই কি নির্ধারিত হবে পূর্ব এশিয়ার ভবিষ্যৎ?
পূর্ব এশিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতার মূল প্রশ্ন এখন শুধু তাইওয়ানের ভবিষ্যৎ নয়; বরং গোটা অঞ্চলের ক্ষমতার কাঠামো কেমন হবে। তাকাইচির জাপান তাইওয়ানকে বৃহত্তর গণতান্ত্রিক নিরাপত্তাব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখতে চায়। কুওমিনতাংয়ের ডিপ ব্লু অংশ চীনের সঙ্গে সংলাপ ও সমঝোতার পক্ষে। শি জিনপিং আপাতত রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে চাইতে পারেন, আর ট্রাম্প প্রশাসন চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতার মধ্যেও কৌশলগত স্থিতিশীলতা ধরে রাখার চেষ্টা করতে পারে।
এই ভিন্নমুখী হিসাবের মধ্যে ২০২৮ সালের নির্বাচন চীনের ধৈর্য, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতা এবং জাপানের আঞ্চলিক ভূমিকার পরীক্ষা নেবে। তবে নির্বাচনের ফল একাই যুদ্ধ বা শান্তির সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করবে না। সামরিক সক্ষমতা, রাজনৈতিক হিসাব, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং আঞ্চলিক জোটের অবস্থানও সমান গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি তাই হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন যদি নিজেদের সম্পর্ককে তুলনামূলক স্থিতিশীল পর্যায়ে নিতে পারে, তাহলে সেই ব্যবস্থায় জাপানের জায়গা কোথায় হবে? টোকিও কি নিজের নিরাপত্তা স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে ওয়াশিংটন-বেইজিং সমঝোতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারবে, নাকি তাইওয়ানকে ঘিরে তার কঠোর অবস্থান নতুন বিভাজন তৈরি করবে?












