যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বড় পরাজয়ের পর নিজের রাজনৈতিক পরিচয় ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের অবস্থান শক্ত করতে শুরু করেছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে নিজেকে প্রস্তুত করার অংশ হিসেবে তিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার রাজনৈতিক চাপ থেকে দূরত্ব তৈরির চেষ্টা করছেন।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারের শেষ দিকে ভ্যান্সের বক্তব্যে এই পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আগে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি ও রাজনৈতিক অবস্থানকে সামনে রেখে প্রচার চালালেও এবার তিনি নিজের অগ্রাধিকার ও নীতিগত অবস্থানের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। বিশেষ করে অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ, পররাষ্ট্রনীতিতে সংযম এবং জননিরাপত্তার বিষয়গুলোকে সামনে এনেছেন।
মঙ্গলবারের নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে রিপাবলিকানরা। নির্বাচনে দলটির পরাজয়ের পেছনে ট্রাম্পের কমে যাওয়া জনপ্রিয়তা বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ, জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং অভিবাসনবিরোধী কঠোর নীতি নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ রিপাবলিকান প্রার্থীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
ট্রাম্পের নীতি থেকে দূরত্ব তৈরির চেষ্টা
নির্বাচনী প্রচারের শেষ পর্যায়ে ভ্যান্স ইরান যুদ্ধ ও ব্যাপক বহিষ্কার অভিযানসহ ট্রাম্পের আলোচিত নীতিগুলো এড়িয়ে গেছেন। পরিবর্তে তিনি জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির পুনর্মূল্যায়নের কথা বলেছেন।
ভ্যান্সের এই কৌশল ছিল পরিকল্পিত। তাঁর রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মতে, ভ্যান্স ও তাঁর উপদেষ্টারা মনে করেন, অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ, পররাষ্ট্রনীতিতে সংযম এবং জননিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোতে তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
৪২ বছর বয়সী ভ্যান্স এখনো ২০২৮ সালের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদে লড়ার ঘোষণা দেননি। ট্রাম্পও তাঁকে কিংবা অন্য কাউকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন জানাননি। তবে রিপাবলিকান শিবিরে ভ্যান্সকে সম্ভাব্য শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তাঁর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ট্রাম্পের সমর্থকগোষ্ঠীকে ধরে রাখা, একই সঙ্গে ট্রাম্পের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক অবস্থানের দায় থেকে নিজের পরিচয় আলাদা করা।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে প্রকাশ্য আপত্তি
নির্বাচনে পরাজয়ের পর বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে ভ্যান্স রিপাবলিকানদের ব্যর্থতার কারণ হিসেবে ইরান যুদ্ধকে সামনে আনেন। তিনি দ্রুত যুদ্ধ বন্ধ করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নতুন করে পর্যালোচনা এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনার কথা বলেন।
এটি ছিল প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে যুদ্ধ শেষ করার পক্ষে ভ্যান্সের অবস্থান নেওয়া। তাঁর এই বক্তব্য রিপাবলিকান শিবিরে নতুন রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ট্রাম্প অবশ্য যুদ্ধের পক্ষে নিজের অবস্থান বজায় রেখেছেন। জ্বালানির মূল্য বেড়ে যাওয়ায় নির্বাচনে এর প্রভাব পড়েছে বলে তিনি স্বীকার করলেও যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো অনুশোচনা নেই বলে জানিয়েছেন।
তবে হোয়াইট হাউস ও ভ্যান্সের যোগাযোগ দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, ভ্যান্সের বক্তব্য ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি বিরোধ তৈরি করার উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়নি। হোয়াইট হাউসের তৎকালীন চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলসও বক্তব্যটি প্রকাশের আগে বিষয়টি জানতেন বলে তাঁদের দাবি।
এদিকে শুক্রবার ট্রাম্প হোয়াইট হাউসের শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তন এনেছেন। সুসি ওয়াইলসকে সরিয়ে স্টিফেন মিলারকে নতুন চিফ অব স্টাফ করার সিদ্ধান্তকে প্রশাসনের কঠোর নীতিতে আরও জোর দেওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০২৮ সালের নেতৃত্বের লড়াইয়ে নতুন বিতর্ক
ভ্যান্সের বক্তব্যের পর রিপাবলিকান শিবিরে ২০২৮ সালের নির্বাচনে দলের রাজনৈতিক অবস্থান কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে আলোচনা বেড়েছে।
রিপাবলিকান কৌশলবিদ মাইকেল রিচির মতে, ভ্যান্সের বক্তব্য রক্ষণশীল রাজনীতিকদের ইরান যুদ্ধের যৌক্তিকতা এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের নীতিগত অবস্থান নিয়ে বিতর্কে বাধ্য করেছে। তাঁর মতে, বিষয়টি শুধু ট্রাম্পের কাছ থেকে ভ্যান্সের নিজেকে আলাদা করার চেষ্টা নয়; ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে ভবিষ্যৎ বিতর্কের বিষয় নির্ধারণের প্রচেষ্টাও।
তবে ভ্যান্সের জন্য পথটি সহজ নয়। মধ্যবর্তী নির্বাচনে যেসব অঙ্গরাজ্যে তিনি রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে প্রচার চালিয়েছেন, সেখানেও দলটির প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন। ফলে তাঁর নির্বাচনী কৌশল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা ইতিমধ্যে ২০২৮ সালের নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে। তাদের লক্ষ্য, ট্রাম্পের সঙ্গে ভ্যান্সের রাজনৈতিক সম্পর্ককে সামনে এনে তাঁকেও বর্তমান প্রশাসনের নীতির জন্য দায়ী করা।
ডেমোক্র্যাট কৌশলবিদ ইগর ভলস্কির মতে, ভ্যান্সের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে—একদিকে সাধারণ নির্বাচনে জয়ের উপযোগী রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করা, অন্যদিকে রিপাবলিকান দলের প্রাথমিক মনোনয়নপ্রক্রিয়ায় ট্রাম্পের সমর্থন ধরে রাখা।
রিপাবলিকান শিবিরে অন্যরাও হিসাব মেলাচ্ছেন
মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয়ের কারণ নিয়ে রিপাবলিকান দলের অন্য সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থীরাও নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন।
টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রুজ বলেছেন, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর বিষয়ে দল যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি। ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিসের মতে, পরাজিত প্রার্থীরা হিজড়া ও লিঙ্গপরিচয়সংক্রান্ত বিতর্কে অতিরিক্ত মনোযোগ দিয়েছেন। অথচ তথ্যকেন্দ্র ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো বিষয় নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এখনো এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো অবস্থান জানাননি।
নির্বাচনী প্রচারের শেষ দিকে ভ্যান্স ভোটারদের কাছে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ও দারিদ্র্যবিমোচন কর্মসূচিতে জালিয়াতি তদন্তের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। অভিবাসননীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গেও এসব বিষয় যুক্ত করেন তিনি। তবে ইরান যুদ্ধ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে প্রায় কোনো কথাই বলেননি। ট্রাম্পের নামও তাঁর বক্তব্যে খুব কম এসেছে।
উত্তর ক্যারোলাইনার শেষ দিকের এক নির্বাচনী সমাবেশে ভ্যান্স বলেন, তিনি চান তাঁর সন্তানরা এমন একটি দেশে পরিবার গড়ে তুলুক, যে দেশ প্রাণবন্ত, সমৃদ্ধ, স্বাধীন ও স্বচ্ছল। নিজের পরিবারের জন্য যে ভবিষ্যৎ চান, অন্য আমেরিকানদের জন্যও সেটিই চান।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ভ্যান্সের এই অবস্থান পরিবর্তন তাই শুধু নির্বাচনী পরাজয়ের প্রতিক্রিয়া নয়; ট্রাম্প-পরবর্তী রিপাবলিকান নেতৃত্বের লড়াইয়ে নিজের জায়গা তৈরির প্রাথমিক প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।












