ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকার রয়েছে। ইসরায়েলিরা যে নিরাপত্তা ভোগ করে, ফিলিস্তিনিদেরও একইভাবে নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার দিতে হবে। গাজা ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে অমানবিক ও অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেছেন স্লোভেনিয়ার প্রেসিডেন্ট নাতাশা পিরৎস মুসার।
৪ নভেম্বর মিসরের সংবাদমাধ্যম এক্সট্রা নিউজকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। ফিলিস্তিন পরিস্থিতিতে নিজের অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, এ প্রশ্নে তিনি মানবতার পক্ষে। গাজা কিংবা পশ্চিম তীরে যা ঘটছে, তার সঙ্গে মানবিকতার কোনো সম্পর্ক নেই।
তিনি বলেন, ফিলিস্তিনে একটি পুরো প্রজন্মের মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। হতাহতের সংখ্যা হৃদয়বিদারক, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, এসব মানুষের কী অপরাধ ছিল যে তাদের এমন পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে?
বিশ্বজুড়ে সংঘাত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্বোচ্চ
স্লোভেনিয়ার প্রেসিডেন্ট বলেন, এমন পরিস্থিতিতে কোনো মানুষ, বিশেষ করে কোনো রাজনীতিবিদ, নীরব থাকতে পারেন না। মানবতার পক্ষে কথা বলা সবার দায়িত্ব।
শান্তি ও সমৃদ্ধির কথা বারবার বলায় কখনো কখনো নিজেকেই তাঁর ‘মিস ইউনিভার্স’ প্রতিযোগীর মতো মনে হয় বলে রসিকতা করেন তিনি। তবে এই মূল্যবোধে তাঁর বিশ্বাস রয়েছে। তাঁর মতে, শান্তি ও সমৃদ্ধির কথা বলা বন্ধ করে দিলে মানুষের আর কী অবশিষ্ট থাকে?
তিনি বলেন, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের নিরাপদ পরিবেশে বসবাসের অধিকার রয়েছে। রাজনীতিবিদদের দায়িত্ব হলো সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা হচ্ছে না।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে বর্তমানে প্রায় ১০০টি সংঘাত চলছে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্বোচ্চ।
স্লোভেনিয়ার স্বাধীনতায় মিসরের ভূমিকার স্বীকৃতি
সাক্ষাৎকারে মিসর ও স্লোভেনিয়ার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়েও কথা বলেন নাতাশা পিরৎস মুসার। তিনি বলেন, যুগোস্লাভিয়া ভেঙে যাওয়ার সময় ৩৫ বছর আগে স্লোভেনিয়ার স্বাধীনতার পক্ষে মিসর যে অবস্থান নিয়েছিল, তা তাঁর দেশ কখনো ভুলবে না।
স্লোভেনিয়ার স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম আফ্রিকান ও আরব দেশ ছিল মিসর। ১৯৬১ সালে যুগোস্লাভিয়ার নেতা জোসিপ ব্রজ টিটো, মিসরের প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর উদ্যোগে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন প্রতিষ্ঠিত হয়। স্নায়ুযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন সামরিক বলয়ের বাইরে একটি তৃতীয় শক্তি গড়ে তোলাই ছিল এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
প্রেসিডেন্ট মুসার বলেন, যুগোস্লাভিয়ার সঙ্গে মিসরের ঐতিহাসিক সহযোগিতার স্মৃতি এখনো গুরুত্বপূর্ণ। তবে সাবেক যুগোস্লাভিয়ার উত্তরসূরি রাষ্ট্র হলেও স্লোভেনিয়া বর্তমানে একটি আধুনিক সংসদীয় গণতন্ত্র। দুই দেশের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বকে বর্তমান সম্পর্কের মধ্যেও প্রতিফলিত করতে চান তিনি।
বাণিজ্য ও প্রযুক্তিতে সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা
অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে সম্ভাবনা থাকলেও ভৌগোলিক দূরত্ব এবং স্লোভেনিয়ার ছোট বাজার কিছুটা বাধা বলে উল্লেখ করেন তিনি। দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ২১ লাখ, যা কায়রোর একটি জেলার জনসংখ্যার কাছাকাছি।
তবে বৃত্তাকার অর্থনীতি, টেকসই পর্যটন এবং বন্দর ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। স্লোভেনিয়ার বৃহত্তম আঞ্চলিক বন্দর কোপেরের সঙ্গে মিসরের বন্দরগুলোর প্রায় ৪০ বছরের সহযোগিতার সম্পর্ক রয়েছে।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মিসর ও স্লোভেনিয়ার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৩১ কোটি ইউরো। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই তা ২৪ কোটি ৭০ লাখ ইউরোতে পৌঁছেছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিনিময়, বিশেষ করে তরুণদের অংশগ্রহণ, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
স্লোভেনিয়ায় ইউনেসকোর পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেন্দ্র রয়েছে। দেশটির নিজস্ব প্রযুক্তি উদ্যোগ ও উদ্ভাবনকেন্দ্রকেও তিনি ছোট পরিসরের ‘সিলিকন ভ্যালি’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
এ ছাড়া জোজেফ স্টেফান ইনস্টিটিউটে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রায় ১ হাজার ১০০ বিজ্ঞানী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবোটিকস নিয়ে কাজ করছেন। শিল্প উৎপাদনে রোবোটিকস ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্লোভেনিয়ার অবস্থান বিশ্বে সপ্তম বলেও জানান তিনি।
পানি ব্যবস্থাপনাকেও দুই দেশের সহযোগিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেন স্লোভেনিয়ার প্রেসিডেন্ট। মিসর সফরের মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক সহযোগিতায় ইতিবাচক অগ্রগতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।












