ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহে বড় ধরনের ধাক্কা লাগলেও আশঙ্কার মতো অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটেনি। অনেক বিশ্লেষক যেখানে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ২০০ ডলারে পৌঁছানোর আশঙ্কা করেছিলেন, সেখানে দাম কিছু সময়ের জন্য ১২০ ডলারের কাছাকাছি উঠলেও পরে তা কমতে শুরু করে। এই পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক তেলের বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে চীন।
আমদানি কমিয়ে বাজারে চাপ কমিয়েছে বেইজিং
বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল আমদানিকারক দেশ হিসেবে চীন যুদ্ধ শুরুর পর দ্রুত বিদেশি তেল কেনা কমিয়ে দেয়। যুদ্ধের আগে দেশটি প্রতিদিন গড়ে ১ কোটি ১৬ লাখ ব্যারেল তেল আমদানি করলেও মে মাসে সেই পরিমাণ ৮০ লাখ ব্যারেলেরও নিচে নেমে আসে, যা গত আট বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হয়নি এবং তেলের দামও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে।
মজুত তেলই হয়ে উঠল প্রধান ভরসা
তেলের চাহিদা পূরণে চীন নিজেদের বিশাল মজুত ভাণ্ডার ব্যবহার করেছে। একই সঙ্গে দেশটি শোধনাগারগুলোর উৎপাদন কমিয়েছে এবং জ্বালানি ব্যবস্থায় কয়লা ও বিকল্প শক্তির ব্যবহার বাড়িয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অতিরিক্ত তেল কিনতে হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, চীনের এই পদক্ষেপ তেলের দামে আরও বড় উল্লম্ফন ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির সুফল
গত এক দশকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ব্যাপক বিনিয়োগের সুফল এখন পাচ্ছে চীন। দেশটি বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সৌর ও বায়ুশক্তি উৎপাদনকারী রাষ্ট্র। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক গাড়ির উৎপাদন ও ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তারা শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। ফলে পেট্রোল ও ডিজেলের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার চেয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ছিল চীনের প্রধান লক্ষ্য। সেই কৌশল এখন দেশটিকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংকটের ধাক্কা থেকে অনেকটাই সুরক্ষা দিচ্ছে।
রেল নেটওয়ার্কও কমিয়েছে তেলের ব্যবহার
চীন দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করেছে এবং পরিবহন খাতে বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবস্থা বাড়িয়েছে। এর ফলে সড়ক পরিবহনে জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা কমেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বহু বছরের পরিকল্পিত বিনিয়োগ এখন চীনের তেল ব্যবহার ধারাবাহিকভাবে কমিয়ে আনছে।
সামনের দিনেও থাকবে প্রভাব
তবে বিশাল মজুত থাকলেও তা অনির্দিষ্টকাল ব্যবহার করা সম্ভব নয়। যদি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে, তাহলে একসময় চীনকে আবার আন্তর্জাতিক বাজারে ফিরতে হবে। তখন নতুন করে তেলের চাহিদা বাড়তে পারে এবং দামও ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, আপাতত চীনের মজুত তেল ও বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থার কারণে বিশ্ববাজারে স্বস্তি রয়েছে। কিন্তু ভবিষ্যতে পরিস্থিতি বদলালে তেলের বাজার আবারও অস্থির হয়ে উঠতে পারে।












