কুকুরের শরীরে পিসু ও টিক—দুই ধরনের পরজীবীই অস্বস্তি তৈরি করে। কিন্তু এদের জীবনচক্র, আক্রমণের ধরন এবং প্রতিরোধের কৌশল এক নয়। শুধু কুকুরের শরীরে ওষুধ প্রয়োগ করলেই সব সময় সমস্যা পুরোপুরি দূর হয় না। বিশেষ করে পিসুর ক্ষেত্রে ঘর ও আশপাশের পরিবেশও পরিষ্কার রাখা জরুরি। অন্যদিকে টিকের প্রধান ঝুঁকি হলো বিভিন্ন সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে দেওয়া।
পোষ্য কুকুরের সুস্থতার পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে মানুষের স্বাস্থ্যও এসব পরজীবীর কারণে ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই পিসু ও টিকের পার্থক্য জানা এবং নিয়মিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
পিসু কোথায় থাকে, কীভাবে ক্ষতি করে
পিসু কুকুরের শরীরে পাওয়া সবচেয়ে সাধারণ বাহ্যিক পরজীবীগুলোর একটি। এটি ক্ষুদ্র আকারের পোকা, যা প্রাণীর রক্ত খেয়ে বেঁচে থাকে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সব পিসু কুকুরের শরীরে থাকে না।
পূর্ণবয়স্ক পিসু কুকুরের শরীরে থাকতে পারে, কিন্তু পিসুর ডিম, লার্ভা ও পিউপা ঘরের কার্পেট, বিছানা, আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন জায়গায় লুকিয়ে থাকতে পারে। ফলে শুধু কুকুরকে চিকিৎসা করলেই পিসুর উপদ্রব পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসবে না। ঘর ও প্রয়োজনে উঠানও পরিষ্কার ও চিকিৎসার আওতায় আনতে হয়।
পিসুর কামড়ে কুকুরের শরীরে প্রচণ্ড চুলকানি ও অস্বস্তি হতে পারে। অতিরিক্ত চুলকানোর কারণে লোম পড়ে যেতে পারে এবং ত্বকে সংক্রমণ দেখা দিতে পারে। পিসুর প্রতি অ্যালার্জি থাকলে ত্বকের সমস্যা আরও তীব্র হতে পারে। এ ছাড়া পিসু ফিতাকৃমি ছড়াতে পারে। প্রচুর পিসু একসঙ্গে আক্রমণ করলে বিশেষ করে কুকুরছানার রক্তস্বল্পতাও হতে পারে।
পিসু উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশে বেশি সক্রিয় হলেও শীতকালেও সমস্যা পুরোপুরি বন্ধ হয় না। ঘরের ভেতরে অনুকূল পরিবেশ থাকলে সারা বছরই পিসু টিকে থাকতে পারে।

পিসু নিয়ন্ত্রণে কী করবেন
পশুচিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কুকুরের জন্য উপযুক্ত পিসু প্রতিরোধক ব্যবহার করা যেতে পারে। পাশাপাশি নিয়মিত কুকুরের বিছানা গরম পানিতে ধুতে হবে এবং কার্পেট, আসবাবপত্র ও ঘরের বিভিন্ন জায়গা ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে।
নিয়মিত ভ্যাকুয়াম করাও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে কার্পেটে লুকিয়ে থাকা পিসুর বিভিন্ন পর্যায় নষ্ট বা ছড়িয়ে পড়া ব্যাহত হতে পারে। বাড়ির উঠানেও বিশেষ করে ছায়াযুক্ত স্থান, জমে থাকা পাতা ও অন্যান্য সম্ভাব্য আবাসস্থলের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
পিসুর উপদ্রব পুরোপুরি দূর হতে সময় লাগতে পারে। তাই একবার ব্যবস্থা নেওয়ার পরপরই সমস্যা শেষ না হলে নির্ধারিত ব্যবস্থাগুলো নিয়ম মেনে পুনরাবৃত্তি করা প্রয়োজন।
টিক পোকা নয়, আরাকনিড
টিককে অনেক সময় পোকা বলা হলেও এটি আসলে আরাকনিড বা মাকড়সার আত্মীয়। সাধারণত লম্বা ঘাস, ঝোপঝাড় ও বনাঞ্চলের মতো জায়গায় টিক অপেক্ষা করে থাকে। কোনো প্রাণী বা মানুষ কাছ দিয়ে গেলে সেটির শরীরে আটকে গিয়ে রক্ত খায়।
পিসুর সঙ্গে টিকের বড় পার্থক্য হলো, টিক সাধারণত ঘরের ভেতরে পিসুর মতো স্থায়ী আবাস গড়ে তোলে না। টিকের প্রধান উদ্বেগ হলো এটি কুকুরের শরীরে বিভিন্ন রোগজীবাণু ছড়িয়ে দিতে পারে।
টিকের মাধ্যমে যেসব রোগ হতে পারে
টিকের মাধ্যমে কুকুরের শরীরে বিভিন্ন রোগ ছড়াতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে লাইম রোগ, অ্যানাপ্লাজমোসিস, এরলিকিওসিস এবং রকি মাউন্টেন স্পটেড ফিভার।
লাইম রোগে জ্বর, খোঁড়ানো ও জয়েন্টে ব্যথার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে কিডনিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অ্যানাপ্লাজমোসিসে জ্বর, দুর্বলতা এবং খাবারের প্রতি অনীহা দেখা দিতে পারে।
তবে এসব রোগের ঝুঁকি টিকের প্রজাতি, অঞ্চল এবং অন্যান্য বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। তাই কোনো টিক কুকুরের শরীরে পাওয়া গেলে দ্রুত সরিয়ে ফেলা গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে লাইম রোগের মতো কিছু সংক্রমণের ক্ষেত্রে টিককে দীর্ঘ সময় শরীরে লেগে থাকতে হয়। তাই বাইরে থেকে ফিরে কুকুরের শরীর ভালোভাবে পরীক্ষা করা এবং টিক পাওয়া গেলে দ্রুত অপসারণ করা ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
টিক থেকে কুকুরকে কীভাবে রক্ষা করবেন
টিক প্রতিরোধে সারা বছর ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কুকুরের জন্য কলার, ত্বকে প্রয়োগের ওষুধ কিংবা খাওয়ার ওষুধ—বিভিন্ন ধরনের প্রতিরোধক পাওয়া যায়। কোনটি উপযুক্ত হবে, তা পশুচিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করা ভালো।
ঘাস বা বনাঞ্চলে ঘোরাঘুরির পর কুকুরের শরীর ভালোভাবে পরীক্ষা করা উচিত। বিশেষ করে কান, ঘাড়, পায়ের ফাঁক ও শরীরের এমন জায়গাগুলো দেখতে হবে যেখানে টিক সহজে লুকিয়ে থাকতে পারে।
টিক পাওয়া গেলে টুইজার বা উপযুক্ত টিক অপসারণের সরঞ্জাম দিয়ে ত্বকের কাছাকাছি ধরে ধীরে ও স্থিরভাবে টেনে সরাতে হয়। একই সঙ্গে বাড়ির উঠান নিয়মিত পরিষ্কার রাখা, ঘাস ছাঁটা, জমে থাকা পাতা সরানো এবং ঝোপঝাড় নিয়ন্ত্রণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।
যেসব এলাকায় লাইম রোগের ঝুঁকি বেশি, সেখানে কুকুরের জন্য লাইম রোগের টিকা প্রয়োজন কি না, তা পশুচিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে।
পিসু ও টিকের মূল পার্থক্য
পিসু সাধারণত কুকুরের শরীরের পাশাপাশি ঘর ও উঠানেও থাকতে পারে। এর প্রধান সমস্যা হলো চুলকানি, ত্বকের সমস্যা, ফিতাকৃমি এবং বেশি সংক্রমণে রক্তস্বল্পতা। তাই পিসু নিয়ন্ত্রণে কুকুরের পাশাপাশি পরিবেশের দিকেও নজর দিতে হয়।
অন্যদিকে টিকের প্রধান আবাস সাধারণত ঘাস, ঝোপঝাড় ও বনাঞ্চল। টিকের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো রোগজীবাণু সংক্রমণ। তাই কুকুরকে প্রতিরোধক দেওয়ার পাশাপাশি বাইরে থেকে ফেরার পর নিয়মিত টিক পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।
পিসু ঘরের ভেতরেও সারা বছর সক্রিয় থাকতে পারে। টিকের সক্রিয়তা পরিবেশ ও তাপমাত্রার ওপর নির্ভর করলেও অনেক এলাকায় বছরের বিভিন্ন সময়ই এর ঝুঁকি থাকে।
প্রতিরোধই সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা
পিসু ও টিকের ক্ষেত্রে নিয়মিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাজারে কলার, ত্বকে প্রয়োগের ওষুধ এবং খাওয়ার ওষুধসহ বিভিন্ন ধরনের প্রতিরোধক রয়েছে। কিছু পণ্য একই সঙ্গে পিসু ও টিক নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করা যায়।
তবে সব কুকুরের জন্য একই পণ্য বা একই ধরনের ব্যবস্থা উপযুক্ত নাও হতে পারে। কুকুরের বয়স, জীবনযাপন, কোথায় বেশি সময় কাটায়, বসবাসের এলাকার পরজীবীর ঝুঁকি এবং তার স্বাস্থ্যগত ইতিহাস বিবেচনায় নিয়ে পশুচিকিৎসকের পরামর্শে প্রতিরোধ পরিকল্পনা করা সবচেয়ে নিরাপদ।
নিয়মিত প্রতিরোধক ব্যবহার, ঘর পরিষ্কার রাখা, উঠান পরিচ্ছন্ন রাখা এবং বাইরে থেকে ফেরার পর কুকুরের শরীর পরীক্ষা করার অভ্যাস পিসু ও টিকের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কুকুরের শরীরে পিসু বা টিক দেখা দেওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার অপেক্ষা না করে নিয়মিত প্রতিরোধমূলক পরিকল্পনা অনুসরণ করা। এতে পোষ্য কুকুরকে অস্বস্তি ও সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখা সহজ হয়।












