ব্রিটেনে মুসলিমদের ধর্মীয় অনুশীলন, রক্ষণশীল সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, রাজনৈতিক সংগঠনে অংশগ্রহণ, গাজা নিয়ে সক্রিয়তা, শরিয়াহ সম্পর্কে মতামত এবং সহিংসতার সমর্থন—এসবকে একসঙ্গে মিলিয়ে বৃহত্তর আদর্শিক হুমকি হিসেবে দেখার সমালোচনা করেছেন মুসলিম কাউন্সিল অব ব্রিটেনের সহকারী মহাসচিব ড. নাওমি গ্রিন।
দ্য ইকোনমিস্টের একটি সাম্প্রতিক লেখায় ‘ইসলামিজম’ শব্দটিকে এমন একটি ধারণা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, যার মাধ্যমে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে সামগ্রিকভাবে হুমকি হিসেবে না দেখেও চরমপন্থা নিয়ে আলোচনা করা যায়। তবে গ্রিনের মতে, ওই আলোচনাতেই ‘ইসলামিজম’ শব্দটি এত বিস্তৃতভাবে ব্যবহার করা হয়েছে যে সাধারণ মুসলিমদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও সন্দেহের আওতায় পড়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘ইসলামিজম’ এখন এত ঢিলেঢালাভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে যে শব্দটি একদিকে সহিংস কর্তৃত্ববাদী আন্দোলন বোঝাতে পারে, অন্যদিকে সরকারকে দাবি জানানো, প্রতিবাদ করা কিংবা নির্বাচনে অংশ নেওয়া সাধারণ মুসলিমদের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হতে পারে।
গ্রিনের যুক্তি, মুসলিমদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে ‘এন্ট্রিজম’ বা কোনো প্রতিষ্ঠানে ঢুকে সেটিকে ভেতর থেকে দুর্বল করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখার আগে তার পক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রয়োজন। শুধু জনজীবনে অংশগ্রহণ করা বা রাজনৈতিক সংগঠনে যুক্ত হওয়া এ ধরনের কর্মকাণ্ডের প্রমাণ নয়।
তিনি আরও বলেন, মুসলিমরা কোনো একক রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ নন। ইসলাম একজন মুসলিমের দারিদ্র্য, বর্ণবাদ, যুদ্ধ কিংবা বৈষম্য সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করতে পারে। কিন্তু কারও ধর্মীয় অনুশীলন থেকে তিনি কোন ধরনের সরকার বা রাজনৈতিক ব্যবস্থা পছন্দ করেন, তা নির্ধারণ করা যায় না।
শরিয়াহ নিয়েও একই ধরনের ভুল ধারণা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। অনেক মুসলিমের কাছে শরিয়াহ মূলত ব্যক্তিগত ধর্মীয় ও নৈতিক জীবনযাপনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই শরিয়াহ সম্পর্কে কোনো মুসলিমের বিশ্বাসকে সরাসরি রাজনৈতিক চরমপন্থার সঙ্গে যুক্ত করা যথাযথ নয়।
গ্রিনের মতে, ব্রিটেনের মুসলিমদের দীর্ঘদিন ধরে সমাজে একীভূত হওয়া এবং নাগরিক জীবনে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। কিন্তু যখন মুসলিমরা সংগঠিতভাবে নিজেদের দাবি তুলে ধরেন, মুসলিম রাজনীতিবিদদের নির্বাচিত করেন কিংবা সরকারের নীতির সমালোচনা করেন, তখন সেই রাজনৈতিক অংশগ্রহণকেই সন্দেহের চোখে দেখা হয়।
কোনো এলাকায় মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেশি হওয়াকেও তিনি কোনো অভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রমাণ হিসেবে দেখার বিরোধিতা করেন। তার মতে, এসব এলাকার জনসংখ্যার কাঠামো গড়ে উঠতে অভিবাসন, পারিবারিক ও সামাজিক যোগাযোগ, আবাসন, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য এবং বৈষম্যের মতো নানা বিষয় ভূমিকা রাখে।
চিঠিতে ব্রিটেনে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান বৈরিতার দিকটিও তুলে ধরা হয়েছে। গ্রিনের দাবি, মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্য ও হুমকি থেকে শুরু করে মসজিদে হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং গুরুতর শারীরিক সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে। মুসলিমদের হত্যার পরিকল্পনা করা উগ্র ডানপন্থী ও নব্য-নাৎসি গোষ্ঠীর কিছু ষড়যন্ত্রও ব্যর্থ করে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
উত্তর আয়ারল্যান্ডে সাম্প্রতিক বর্ণবাদী ও ইসলামবিদ্বেষী জনতার সহিংসতা এবং গ্লাসগোতে ছুরিকাঘাতের ঘটনাকেও তিনি ব্রিটেনজুড়ে মুসলিমদের ওপর বিস্তৃত বৈরিতা ও সহিংসতার বৃহত্তর ধারার অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তবে গ্রিন একই সঙ্গে স্পষ্ট করেছেন, চরমপন্থা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান থাকা প্রয়োজন। কিন্তু রক্ষণশীল বিশ্বাস, কুসংস্কার, জবরদস্তি এবং সহিংসতাকে একই ঘটনার বিভিন্ন মাত্রা হিসেবে দেখলে বাস্তব পার্থক্যগুলো আড়াল হয়ে যায়।
তার মতে, ‘ইসলামিজম’ শব্দটির অস্পষ্ট ও অতিরিক্ত বিস্তৃত ব্যবহার প্রত্যাখ্যান করার অর্থ চরমপন্থার অস্তিত্ব অস্বীকার করা নয়। বরং এর অর্থ হলো—সাধারণ মুসলিমদের ধর্মীয় বিশ্বাস, নাগরিক অধিকার ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে নিজেরাই চরমপন্থার প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা না করা।
ড. নাওমি গ্রিন
সহকারী মহাসচিব, মুসলিম কাউন্সিল অব ব্রিটেন
বেলফাস্ট











